বিশ্ব অর্থনীতির এ রকম এক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে আছে বাংলাদেশও। জ্বালানি, খাদ্যশস্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। কমেছে প্রবাসী আয়। চলতি আয়েই ঘাটতি ১ হাজার ৮৬৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম হওয়ায় দেখা দিয়েছে ডলারের সংকট। ফলে কমছে টাকার মূল্যমান। এতে চাপ পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। এসবের প্রভাবেই বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। এ রকম এক পরিস্থিতিতেই সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভুল সময়ের সিদ্ধান্ত

করোনার প্রকোপের আগে চীন রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন করেছিল। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চীন অবমূল্যায়ন করেছিল ৩৩ শতাংশ। চীনের সেই সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোও একই পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছিল। তখন তাকে বলা হয়েছিল মুদ্রাযুদ্ধ। ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ। তখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার মূল্যমান ধরে রাখে। রপ্তানিকারকের পক্ষ থেকে টাকার অবমূল্যায়নের দাবি উঠলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার মান ধরে রাখার নীতিতেই অটল ছিল। অথচ অর্থনীতি ছিল যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক অবস্থায়। সেই টাকা ঠিকই অবমূল্যায়ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাধ্য হলো কঠিন এক সময়ে। গত সাত মাসে টাকার দর কমেছে ডলারপ্রতি ৮ টাকা ৯০ পয়সা। তারপরও সংকট মিটছে না। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, আগে থেকেই অল্প অল্প করে অবমূল্যায়ন করা হলে এখনকার সংকট এত বড় হতো না।

২০১৪ সালে বিশ্বে তেলের দাম ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন। জ্বালানি তেলের দর নেমেছিল প্রতি ব্যারেল ৫০ ডলারের কম। ২০২০ সাল পর্যন্ত তেলের দর কমই ছিল। কোভিড-১৯ সংক্রমণ কমে গেলে ২০২১ সালে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার শুরু হলে তেলের দর বাড়তে থাকে। তবে মূল সংকট শুরু হয় গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর। গত মার্চ থেকে জ্বালানি তেল, ধাতব পণ্য, খাদ্যশস্য ও সারের দাম বাড়লে বিপাকে পড়ে প্রায় সব দেশ। একপর্যায়ে তেলের দর প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে উঠে যায়। তখন অবশ্য সরকার বলেছিল, এই দর আপাতত বাড়ানো হবে না।

শেষ পর্যন্ত সরকার এমন এক সময় বাড়াল, যখন মন্দার আশঙ্কায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। গত শুক্রবারের দর ছিল গত ফেব্রুয়ারির পরে সর্বনিম্ন, প্রায় ৯৫ ডলার। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর তাদের ‘গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, জ্বালানি, কৃষি ও ধাতব পণ্যের দামের বিস্ফোরণের অধ্যায় আপাতত শেষ। মন্দার পদধ্বনির কারণেই দর কমতে থাকবে। ঠিক সে সময়ে একবারেই ৫১ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সব মহলকেই বিস্মিত করেছে। সাধারণ মানুষ হয়েছে আতঙ্কিত। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা কেউ কেউ স্বীকার করলেও যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তাকে কেউই সহনীয় বলছেন না। উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারাও। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সরকারকে এই পথে যেতে হলো।

নগদ অর্থের সংকটে সরকার

সরকার পড়ে আছে মূলত নগদ অর্থের সংকটে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় মুদ্রার আয়ও বাড়েনি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাত এখন বিশ্বে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অর্থাৎ দেশে জিডিপি বেড়েছে, কিন্তু সরকারের আয় বাড়ছে না। মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কিন্তু মানুষের কর দেওয়া বাড়ছে না। ফলে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, মঞ্জুরি ও ভর্তুকি দিয়েই তা প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাকি থাকা কিছু অর্থ ব্যয় হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্পে। এর মধ্যে কোনো এক খাতে ব্যয় হঠাৎ বেড়ে গেলেই মহাসংকটে পড়ে যায় সরকার। এখন যেমন পড়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে ভর্তুকি খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে রাখা আছে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর মাত্র শুরু। কিন্তু এখনই সরকার ভর্তুকি ব্যয় নিজের কাঁধে নিতে নারাজ। ফলে জ্বালানি তেলের লোকসানের বোঝা প্রায় পুরোটাই বহন করতে হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষকেই। এমনকি কম রাজস্ব আদায়ের কারণে জ্বালানি তেল আমদানি থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে ৩২ শতাংশ হারে কর পায়, সেখানেও কোনো ছাড় দিচ্ছে না। যদিও ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কম দামে তেল এনে বেশি দামে বিক্রি করে ৪৩ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেলের এতটা মূল্যবৃদ্ধি বা এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ রোগের উপসর্গ মাত্র, এটা রোগ নয়। রোগ হচ্ছে সরকার প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে, কিন্তু রাজস্ব বাড়াতে পারেনি। সরকার মূলত টাকার অভাবে পড়ে গেছে। একে বলা যায় একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশের দরিদ্র সরকার, যার খরচ করার মতো টাকা নেই।

এর প্রধান কারণ রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা। সুতরাং যে উচ্চ আয়ের কথা বলা হয়েছে, তা হয় অলীক ছিল অথবা করব্যবস্থায় দক্ষতা দেখাতে পারেনি। কারণ, এ সময়ে যেসব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান প্রভূত পরিমাণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় লাভবান হয়েছে, তাদের কাছ থেকে কর আদায় তো করলই না, উপরন্তু তাদের কালোটাকা বা পাচারকৃত টাকা সাদা করার সুবিধা দিয়েছে।

সস্তা অর্থের দিন শেষ

বিশ্বের সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্থা ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস) জানিয়েছে, কয়েক বছর ধরেই অর্থ পাওয়া অনেক সহজ ও সস্তা হয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় দেশই সুদের হার কমিয়ে দিয়েছিল। করোনার সময়েও সস্তায় প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সেই অর্থ সরবরাহই এখন কমাতে চাইছে সবাই। এ কারণে এখন পর্যন্ত ৭৫টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতিকেই সবাই ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশই এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছেন, তিনি সুদহারে পরিবর্তন আনবেন না। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের চাপে ঋণের সুদ যে ৯ শতাংশ করা হয়েছিল, সেটাই থাকছে। যদিও দেখা গেছে, কম সুদে পাওয়া অর্থের বড় অংশই খেলাপি হয়ে আছে। ফলে সরকারকে নতুন নতুন সুবিধা দিতে হচ্ছে।

সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহারকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ছাড়া কিছু রাজস্বনীতিও গ্রহণ করা হয়। যেমন করহার বাড়ানো, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সরকারের বাজেট কমানো। সরকার এ পথেই হাঁটছে। এই পথ কতটা কার্যকর হবে সেটাই বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন। কেননা, জ্বালানি তেলের দর যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তাতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে বলেই সবার আশঙ্কা। এতে সরকারের ব্যয় কিছু কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাবে অনেক বেশি। এর আগে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ শতাংশ হয়েছিল।

বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে মনোযোগ দিয়েছে বেশি। কিন্তু কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে উদ্যোগী হয়নি। আর্থিক খাত প্রভাবশালীদের দখলে, সেখানে কোনো সংস্কার হয়নি। টাকা পাচারও কমেনি। বিদেশি বিনিয়োগ অনুল্লেখযোগ্য।

রপ্তানি এক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রানীতি তৈরি করতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও তা প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। জ্বালানি খাতে বাড়াতে পারেনি সক্ষমতা। স্বস্তির সময়ে এসব কাঠামোগত সমস্যা ততটা প্রকটভাবে অনুভব করা যায়নি।

কিন্তু সংকটের কালে সবই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গত দেড় যুগে সরকার আসলে তেমন কোনো সংস্কারই করেনি। এরই প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এ অবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সংকট কাটবে না।