ঋণ পেতে আইএমএফকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ

আইএমএফ থেকে ৪৫০ কোটি, এডিবি থেকে ১০০ কোটি, বিশ্বব্যাংক থেকে ৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ চাওয়া হবে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

আইএমএফ

বাংলাদেশ অবশেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ঋণ চেয়েছে। এ জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু করতে গত রোববার আইএমএফকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে ঋণের অঙ্ক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ৩ বছরের জন্য চায় ৪৫০ কোটি ডলার।

আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, গত ১৩ বছরে দেশে টেকসই সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থাই ছিল। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ভালো প্রবৃদ্ধির হারও অর্জিত হয়েছে ২০০৯-২০১৯ সময়ে। ১০ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে। বেড়েছে গড় আয়ু; সাক্ষরতার হার, মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদন ও ক্যালরি গ্রহণ। কিন্তু কোভিড-১৯–এর কারণে ২০২০ সাল শুরুর আগে থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব মোকাবিলায় ঠিক সময়ে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন করে সেগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত করেছে বাংলাদেশ। কোভিডে বাংলাদেশের মানুষের কম আক্রান্ত হওয়া, মৃত্যুর হার কম থাকা এবং ভ্যাকসিন দেওয়ার উচ্চ হারের কারণে ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকেই অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর কারণে রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে এবং কৃষি, উৎপাদনশীল খাত ও সেবা খাত কার্যকরভাবেই ফিরে এসেছে। তবে এখন সময় একটু খারাপ (ক্রিটিক্যাল টাইম) বলে জরুরিভিত্তিতে লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা ও বাজেট–সহায়তা বাবদ বাংলাদেশের অর্থের দরকার।

অভূতপূর্ব পণ্যমূল্য, নাটকীয় আমদানি

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেশের অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে বলে চিঠিতে আইএমএফকে জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে অভূতপূর্ব হারে বেড়ে গেছে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের দাম। ব্যাহত হয়েছে সরবরাহব্যবস্থাও। কোভিডের ক্ষতি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার পেতে নতুন বিপদ হিসেবে আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার ও ভোজ্যতেলের দাম এখনো অস্থির। ফলে কেবল নয়টি পণ্যেই অর্থাৎ পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা, চাল, গম, ভুট্টা, সার, পাম তেল ও সয়াবিন তেল আমদানিতে বাড়তি গুনতে হয়েছে ৭৬০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৯৪ দশমিক ৭০ টাকা দরে হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় তা দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। এ হিসাব ২০২১ সালের মে মাসের তুলনায় বর্তমান সময়ের।

অর্থনীতির এ খারাপ সময়ে চিঠি পাঠানোটা যৌক্তিক ও সময়োপযোগী হয়েছে। এখন দরকার আলোচনাটা শুরু করা। আইএমএফের একটি মিশন যাতে দ্রুত আসে, এ ব্যাপারেও সরকারকে কাজ করতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই

আইএমএফকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামালেরও দাম বেড়েছে অনেক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবহনসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে ব্যাপক হারে। আমদানিতে নাটকীয় উত্থান হয় দেশে। ২০২১-২২ অর্থবছরের (জুলাই-মে) ১১ মাসে আমদানি বাড়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ শতাংশ। যদিও একই সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয় ৩৪ শতাংশ। আর এ অবস্থায় বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দেয় দেশে। এ বছরের মে মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৮২৩ কোটি ডলারের।

প্রবাসী আয় নেতিবাচক

যদিও চলতি হিসাবের ঘাটতি পূরণে রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) এত দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে কোভিডের প্রভাব কাটিয়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার দেরিতে হওয়ায় চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেয় ১ হাজার ৭২৩ কোটি ডলার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ২৭৮ কোটি ডলার। চলমান লেনদেনের ভারসাম্য ও আমদানি করা মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপণ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়েছে বলে আইএমএফকে জানানো হয় চিঠিতে।

আরও পড়ুন

অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশকে বিশ্বের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক দুটি সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২–এর মধ্যে ১৬৭। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ হারাবে জিডিপির ২ শতাংশ, আর শেষ দিকে হারাবে জিডিপির ৯ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ১০০ বছরের ডেলটা পরিকল্পনা এবং ৫ বছর মেয়াদি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ অর্থ লাগবে।

আইএমএফের কাছে পাঠানো চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে সংস্থাটির সাবেক কর্মকর্তা এবং গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থনীতির এ খারাপ সময়ে চিঠি পাঠানোটা যৌক্তিক ও সময়োপযোগী হয়েছে। এখন দরকার আলোচনাটা শুরু করা। আইএমএফের একটি মিশন যাতে দ্রুত আসে, এ ব্যাপারেও সরকারকে কাজ করতে হবে। অর্থমন্ত্রী মাঝখানে বলেছিলেন, এ মুহূর্তে বিদেশি ঋণের প্রয়োজন নেই। এ বক্তব্য তিনি কেন দিয়েছিলেন তা আমার বোধগম্য নয়।’

দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইএমএফ থেকে ঋণ নিতে পারলে অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হবে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ঋণ নিতে গেলে কিছু শর্ত থাকবে, যেগুলো পূরণ করাও চাই। আইএমএফের স্টাফ মিশন সম্প্রতি কিছু ইঙ্গিত দিয়েও গেছে। সরকার আপাতত যেটা করতে পারে, সেটি হচ্ছে ব্যাংক খাতে সুদের হারের সীমা তুলে দেওয়া। আইএমএফও মনে হয় এ কথা বলে গেছে।

আরও যাদের কাছে চাওয়া

শুধু আইএমএফ নয়; বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকার কাছ থেকেও বাজেট সহায়তা নেওয়ার আলোচনা চলছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ (ইআরডি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এডিবির সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের বাজেট–সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার—এই দুই খাতে অর্থ খরচ করতে হবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের জন্য দুই মাস আগেই এডিবির কাছে সহায়তা চেয়েছে সরকার। তবে কিছু শর্ত নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অর্থ প্রদান সহজ করা, প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করা, অর্থ খরচে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে কর দেওয়ার ব্যবস্থা সহজ করা; আয়কর ও শুল্ক নিয়ে নতুন দুটি আইন চালু এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে সহায়তা দেওয়া।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৭০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। জাইকার কাছেও বাজেট সহায়তা চেয়ে অনুরোধ করার ব্যাপারে কাজ চলছে। এ নিয়ে সফররত জাইকার সভাপতি আকিহিকো তানাকার সঙ্গে গত সোমবার বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী।