ওএমএসের পণ্য নেওয়ার জন্য এই এলাকায় ভোর থেকে লাইনে অপেক্ষা করছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথমবারের মতো এসেছেন। ভোর পৌনে ৬টা থেকে লোক আসতে শুরু করেন এখানে। তবে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা লোকমান হোসেন জানান, ফজরের নামাজের পর থেকেই এখানে লোক জড়ো হতে থাকে। ট্রাক আসে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে। আর সেই ভিড় চলতে থাকে বিকেল চার-পাঁচটা পর্যন্ত।

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে এই প্রতিনিধি সেখানে যান। দুজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মন্তব্য লিখতে কাগজ–কলম বের করলে আশপাশ থেকে ১০-১২ জন তাঁকে ঘিরে ধরেন। তাঁরা ভেবেছেন, এখানে ওএমএসের পণ্য বিক্রির জন্য সিরিয়াল নেওয়া হয়। তবে ভুল ভাঙলে হতাশ হয়ে দূরে সরে দাঁড়ান।

সকাল সোয়া ৯টা নাগাদ প্রায় দেড় শতাধিক লোক জড়ো হন। তাঁদের অনেকে নিজ উদ্যোগে হাতে সিরিয়াল নম্বর লিখে লাইন করে দাঁড়ান। আবার অনেকে লাইন না করে এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকেন।

স্থানীয় বাসিন্দা গৃহকর্মী শাহানা আক্তার সিরিয়াল লেখার জন্য সঙ্গে করে কলম নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল মঙ্গলবার এখানে এসেছিলাম। তবে ট্রাক না আসায় ফিরে গেছি। আজ আবার ফজরের নামাজের পরে এখানে এসেছি। তখন তিনজন ছিল। এখানে কোনো সিরিয়াল মানা হয় না। তাই নিজেরাই হাতে নম্বর লিখে লাইন করে দাঁড়িয়েছি। এখন পর্যন্ত (সকাল সোয়া আটটা) ৩৬ জনের নাম লিখেছি। তবে এলোমেলো দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রাক আসলে এরা দৌড়ে লাইনের আগে দাঁড়িয়ে যাবে। এসব নিয়ে মারামারি পর্যন্ত হয় মাঝেমধ্যে।’

সকাল সাড়ে নয়টায় ওএমএসের অন্য এলাকার একটি ট্রাক রাস্তা অতিক্রম করে। এই এলাকার ট্রাক ভেবে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ। তবে হুড়মুড়িয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায় আরও ১০ মিনিট পর, যখন এই এলাকার ট্রাকটি আসে।

মুহূর্তেই নিজেদের করা পূর্বের সব সিরিয়াল ভেঙে হুড়মুড়িয়ে ছোটেন ট্রাকের পেছনে। যে যেভাবে পারেন, লাইনে দাঁড়িয়ে যান। সঙ্গে চলতে থাকে ধাক্কাধাক্কি। এর পাঁচ মিনিট পর পণ্য বিক্রি শুরু হলেও ক্রেতাদের ধাক্কাধাক্কি চলে প্রায় আধা ঘণ্টা যাবৎ। এরপর কিছুটা শান্ত হয়।

মূলত নিম্ন আয়ের মানুষই এই এলাকায় আসেন পণ্য কিনতে। জানতে চাইলে পূর্ব শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি মো. মন্টু মিয়া বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে বাজার থেকে সব পণ্য কিনে খাওয়ার মতো অবস্থা নেই। সে জন্য কম দামে এখান থেকে চাল ও আটা নিতে এসেছি। কাজ বন্ধ রেখে তো আসা যায় না। আজ সকালের দিকে কাজ ছিল না, তাই এসেছি।’

চা–দোকানি জেয়াসমিন বেগম বলেন, ‘বাসায় একফোঁটা চাউল নাই। দোকান ফেলে এখানে এসেছি। চাল নিতে পারলে বাসায় দুপুরে রান্না হবে।’ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মচারী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি এক মাস হয় এখান থেকে চাল ও আটা নিচ্ছি। এই এলাকায় আমি থাকি। তিন–চার মাস আগেও এমন ভিড় দেখিনি। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় আমার মতো আরও অনেকেই এখন ওএমএসের পণ্য কিনতে আসছেন।’

গৃহকর্মী শিউলি বেগম বলেন, ‘যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, এতে মানুষের বাঁচার কোনো কায়দা নেই। যে আটা ৩৫ টাকায় কিনেছি, তা এখন ৬৫ টাকা। মনে অনেক কষ্ট নিয়ে এখানে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি।’

তবে ট্রাক আসার পর হুড়াহুড়ির মধ্যে লাইনে দাঁড়াতে না পেরে ফিরে গেছেন কেউ কেউ। আবার অন্য এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণেও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে কয়েকজনকে।

পণ্য নিতে আসা ফাহিমা বেগম বলেন, ‘আমার পরিবারে সাত সদস্য। স্বামীর একার রোজগারে সংসার চলে। এখন খুব কষ্টে আছি। এ জন্য বাধ্য হয়ে আজই প্রথম আটা-চাল কিনতে এখানে আসি। সকাল সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু ট্রাক আসলে সবার ঠেলাঠেলির মধ্যে লাইনের মধ্যে আর থাকতে পারিনি। এভাবে আজকে আর পণ্য নেওয়া সম্ভব হবে না। অন্য একদিন আসতে হবে।’

শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা আসমা বেগমের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজ জেলা নেত্রকোনার স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া। তাই তিনি পণ্য পাননি। প্রথম আলোর প্রতিবেদকের কাছে তিনি বলেন, ‘আমরা তো ঢাকায় থাকি, গ্রামে থাকি না। এ জন্য কি কম দামের পণ্য কিনতে পারব না? আমরা কি এ দেশের নাগরিক না?’

ট্রাকে করে ওএমএসের পণ্য বিক্রি চলবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। শেওড়াপাড়া এলাকার ওএমএসের পণ্য বিক্রির দোকানের (ট্রাক) কর্মী মেহেদী হাসান বলেন, বিকেলে শেষ সময় পর্যন্ত মানুষের ভিড় থাকে। আর আগেই পণ্য শেষ হলে খালি হাতে ফেরেন অনেকে।