পরিবেশ সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক চাকরির সুযোগ বাড়ছে, দরকার বিশেষায়িত দক্ষতা
যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিকদের সুযোগ নিয়ে কথা বলেছেন পরিবেশ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোছাব্বের হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক সরকার।
মোছাব্বের হোসেনের সাংবাদিকতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কাজের জন্য তিনি থমসন ফাউন্ডেশনের ‘সাউথ এশিয়ান ইনকোয়ারার ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। পরিবেশ ও জলবায়ু সাংবাদিকতায় তিনি হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) স্বীকৃতিও অর্জন করেছেন। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতায় ‘ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাওয়ার্ড’এবং ‘প্রজ্ঞা টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। প্রথম আলোতেও কাজ করছেন। সেরা কর্মীর স্বীকৃতিও পেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় পরিবেশবিজ্ঞান ও ন্যাচারাল রিসোর্স জার্নালিজম নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
প্রশ্ন: তিস্তার পাড় থেকে আপনার পরিবেশ সাংবাদিকতার যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল? প্রথম আলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে আপনার সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গিতে কী পরিবর্তন এসেছে?
মোছাব্বের হোসেন: আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা তিস্তা নদীর কাছাকাছি। ছোটবেলায় খুব কাছ থেকে নদীভাঙন দেখেছি। কয়েক মিনিটের মধ্যে মানুষের জমি ও ঘর নদীতে চলে যেতে দেখেছি। একটি পরিবার যখন সবকিছু হারিয়ে অন্য জায়গায় চলে যায়, সেই দৃশ্য আমাকে খুব নাড়া দিত।
সাংবাদিকতায় এসে তিস্তা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই পরিবেশবিষয়ক রিপোর্টিংয়ের প্রতি আমার আগ্রহ আরও বাড়ে। পরে প্রথম আলোতে প্রায় এক দশক কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, পরিবেশের গল্প শুধু নদী, বন বা প্রকৃতির গল্প নয়। এর সঙ্গে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, অভিবাসন ও নীতিনির্ধারণও জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় পড়াশোনা করতে এসে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখানে আমি দেখেছি, পরিবেশ সাংবাদিকতায় বিজ্ঞান, ডেটা, পাবলিক রেকর্ড, গবেষণা ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। এখন আমি শুধু একটি সমস্যা কী, সেটিই দেখি না; কেন হচ্ছে, কারা দায়ী, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সম্ভাব্য সমাধান কী—এসব বিষয়ও খুঁজে দেখি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে পরিবেশ ও জলবায়ু সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা আপনি কীভাবে দেখেন? এই সাংবাদিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে কী করা দরকার?
মোছাব্বের হোসেন: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। তাই পরিবেশ সাংবাদিকতা এখানে কোনো ছোট বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে অনেক ভালো পরিবেশ প্রতিবেদন হচ্ছে। তবে আরও গভীর অনুসন্ধান দরকার। শুধু বন্যা হয়েছে, নদী ভেঙেছে বা তাপমাত্রা বেড়েছে—এতটুকু বললে হবে না। কেন হচ্ছে, কোন নীতি কাজ করছে না, অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সমাধান কী হতে পারে—এসব প্রশ্নও করতে হবে।
সাংবাদিকদের বিজ্ঞান বোঝা, ডেটা বিশ্লেষণ, পাবলিক ডকুমেন্ট ব্যবহার, গবেষণাপত্র পড়া ও অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রতিবেদনের কেন্দ্রে আনতে হবে।
প্রশ্ন: পরিবেশ, জলবায়ু ও বিজ্ঞান সাংবাদিকতায় আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার কেমন? বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিকদের জন্য কী ধরনের সুযোগ আছে?
মোছাব্বের হোসেন: আন্তর্জাতিকভাবে পরিবেশ, জলবায়ু ও বিজ্ঞান সাংবাদিকতায় সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন বিশ্বজুড়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি অলাভজনক নিউজরুম, বিশেষায়িত পরিবেশ ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ফেলোশিপ, রিপোর্টিং গ্র্যান্ট, প্রশিক্ষণ এবং বিশেষ প্রকল্পে কাজের সুযোগও রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। শুধু সাধারণ রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেই যথেষ্ট নয়; একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা তৈরি করা জরুরি।
কেউ পানি, নদী বা জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে বিশেষায়িত হতে পারেন। কেউ জ্বালানি, বন, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য, কৃষি বা জলবায়ু অর্থনীতি নিয়ে কাজ করতে পারেন।
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি বড় সুবিধা হলো, আমাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবের অনেক শক্তিশালী গল্প রয়েছে। এসব স্থানীয় গল্পকে যদি বিজ্ঞান, তথ্য-উপাত্ত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক চাকরি বা ফেলোশিপের জন্য একজন তরুণ সাংবাদিক কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন?
মোছাব্বের হোসেন: প্রথম বিষয় হলো একটি শক্তিশালী পোর্টফোলিও তৈরি করা। সাংবাদিককে দেখাতে হবে তিনি কী ধরনের কাজ করেছেন এবং কোন বিষয়ে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইংরেজিতে লেখা ও যোগাযোগের দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে হলে নিজের রিপোর্টিং আইডিয়া, অভিজ্ঞতা ও কাজের গুরুত্ব পরিষ্কারভাবে বোঝাতে জানতে হবে।
তৃতীয়ত, ডেটা সাংবাদিকতা, পাবলিক রেকর্ড, অনুসন্ধানী কৌশল ও বিজ্ঞানভিত্তিক রিপোর্টিং শেখা দরকার।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা নেটওয়ার্ক, সম্মেলন ও ফেলোশিপের সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার। আমি মনে করি, সুযোগ পাওয়ার জন্য শুধু অপেক্ষা করা উচিত নয়। নিয়মিত আবেদন করতে হবে, নিজের কাজ উন্নত করতে হবে এবং প্রত্যাখ্যাত হলেও আবার চেষ্টা করতে হবে।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, ফেলোশিপ ও পেশাগত নেটওয়ার্কে কাজ করে আপনি কী শিখেছেন?
মোছাব্বের হোসেন: প্রথম আলো আমার সাংবাদিকতার ভিত্তি তৈরি করেছে। সেখানে কাজ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং, সোর্স তৈরি, মানুষের গল্প শোনা ও জনস্বার্থের বিষয় অনুসন্ধান করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
রয়টার্সের জন্য কাজ করার সময় শিখেছি, একটি স্থানীয় ঘটনাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক করে উপস্থাপন করতে হয়।
ইনসাইড ক্লাইমেট নিউজে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে আরও অনেক কিছু শিখিয়েছে। সেখানে দলগত কাজের ওপর অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। মন্টানায় দাবানল, খনি, পানি ও অন্যান্য পরিবেশগত বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে আমি আরও গভীরভাবে বুঝেছি, একটি ভালো পরিবেশ প্রতিবেদনে বিজ্ঞান ও মানুষের গল্প—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ ও পেশাগত নেটওয়ার্ক আমাকে এটাও শিখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের জীবনেই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রশ্ন: তরুণ সাংবাদিকদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী? নিজের ভবিষ্যৎ কাজকে কোথায় নিয়ে যেতে চান?
মোছাব্বের হোসেন: আমি পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলব—বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, বিজ্ঞান বোঝার ক্ষমতা, ডেটা ও অনুসন্ধানী দক্ষতা, ইংরেজিতে যোগাযোগ ও পেশাগত নেটওয়ার্ক।
আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—কৌতূহল। একজন পরিবেশ সাংবাদিককে সব সময় প্রশ্ন করতে হবে। একটি নদী কেন শুকিয়ে যাচ্ছে? একটি এলাকায় কেন বারবার দাবানল হচ্ছে? একটি প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্য কে দিচ্ছে? জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী মানুষগুলো কেন অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
নিজের ক্ষেত্রে আমি বিজ্ঞান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মানুষের গল্পকে আরও শক্তভাবে একসঙ্গে আনতে চাই। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ ও সমাধানমুখী সাংবাদিকতায় আরও কাজ করতে চাই।
তিস্তার পাড়ে পরিবেশগত পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছি। এখন যুক্তরাষ্ট্রে এসে একই বৈশ্বিক সমস্যাকে অন্য একটি প্রেক্ষাপটে দেখছি। এই দুই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমি এমন সাংবাদিকতা করতে চাই, যা শুধু সমস্যা তুলে ধরবে না; বরং সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করবে, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন তুলবে এবং সম্ভাব্য সমাধানের দিকগুলোও সামনে আনবে।