৪৮তম বিসিএস: জাইল্যা দেশের কী ক্ষতি করল! মেধায় টিকেও ছেলে চাকরি পাবে না...

ছবি: এআই/প্রথম আলো

মাঘের হাড়কাঁপানো শীতে প্রকৃতি যখন স্থবির হয়ে আসে, ফরিদপুরের নগরকান্দার নারায়ণ মল্লিক তখন কোমরসমান কনকনে ঠান্ডা পানিতে জাল ফেলতেন। কোনো দিন মাছ জুটত, কোনো দিন জুটত না। যেদিন মাছ মিলত না, সেদিন তিন ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে রাত কাটত তাঁর। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এ মানুষটির একটাই স্বপ্ন ছিল—ছেলেরা মানুষের মতো মানুষ হবে। বড় ছেলে উজ্জ্বল মল্লিক বাবার সেই কষ্টকে অন্তরে ধারণ করে সব প্রতিকূলতা জয় করেছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মেধার স্বাক্ষর রেখে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে। এমবিবিএস শেষ করে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে (স্বাস্থ্য) পিএসসি কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্তও হলেন।

নারায়ণ মল্লিকের মনে হয়েছিল, এবার বুঝি তাঁর সুদিন ফিরল। কিন্তু সেই আনন্দ আজ বিষাদে পরিণত হয়েছে। মেধার লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েও উজ্জ্বল মল্লিক এখন পুলিশ ভেরিফিকেশনের ‘অদৃশ্য’ জালে আটকা পড়েছেন। চূড়ান্ত গেজেটে তাঁর নাম আসেনি।

নারায়ণ মল্লিক ধরা গলায় প্রথম আলোক বলেন, ‘আধপেটা থাকা আমাদের নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো কষ্টই গায়ে লাগেনি এই ভেবে যে আমার সুদিন আসছে। ছেলে বিসিএসে পাস করল। এখন শুনি পুলিশ নাকি আমাদের নামে মন্দ রিপোর্ট দিয়েছে। আমি সরকার বাহাদুরকে বলব, কৃপা করে এই গরিব জাইল্যার (জেলে) কথা শুনুন। জাইল্যা দেশের কী ক্ষতি করল! মেধায় টিকেও ছেলে চাকরি পাবে না?’

উজ্জ্বল মল্লিকের মতো ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন পাভেল ইসলাম। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা পাভেলের বাবা কামরুল ইসলাম পেশায় কৃষক। পাঁচ সন্তানকে পড়াশোনা করাতে গিয়ে কয়েক বিঘা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। পাভেল প্রথমে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হয়েছিলেন। অসহায় মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে পরবর্তী সময়ে তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। পড়াশোনার খরচ চালাতে পাভেলকে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। পড়াশোনার ফাঁকে একাধিক টিউশনি করিয়েছেন। পুলিশ ভেরিফিকেশনের ধুয়া তুলে নিয়োগ বঞ্চিত পাভেল ইসলামের প্রশ্ন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে শত শত মানুষ শহীদ হলেন একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আশায়। কথা ছিল প্রকৃত মেধাবীরা মূল্যায়িত হবে। কিন্তু অবস্থার কি কোনো বদল হয়েছে? পরিবারের কোনো সদস্য রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকার পরও কেন এই “জুলুমের” শিকার হতে হলো আমাকে।’

আরও পড়ুন

এক মেডিকেল কলেজের ১৫ জন নিয়োগবঞ্চিত—

বিস্ময়কর চিত্র ফুটে উঠেছে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে। ৪৮ বিসিএসে বাদ পড়া ২১ জনের মধ্যে ১৫ জনই এই কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁদেরই একজন সিরাজাম মুনিরা। বাবার বদলির চাকরির কারণে সারা জীবন এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরেছেন মুনিরা। কোনো দিন কোনো রাজনৈতিক সভা-সেমিনারে অংশ নেননি শুধু এই ভয়ে, পাছে কেউ কোনো ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে দেয়। কিন্তু সেই সতর্কতা কোনো কাজে আসেনি। বিসিএস প্রস্তুতির কারণে নিজের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের একাডেমিক কার্যক্রমেও পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। বিসিএসে চূড়ান্ত নিয়োগ না পাওয়ায় অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপ নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন

গেজেটবঞ্চিত ২১ চিকিৎসক—

৪৮তম বিশেষ বিসিএসে গেজেটবঞ্চিত ২১ জন চিকিৎসকের তালিকায় রয়েছেন ডা. শুভ্র দেবনাথ নীলু, ডা. ইলহামুর রেজা চৌধুরী, ডা. মুশফিকুর রহমান ভূঁইয়া, ডা. আলভি ফারাজী, ডা. মো. রাইসুল করিম নিশান, ডা. মেহেদী হাসান, ডা. মো. সাব্বির আহম্মেদ তুষার, ডা. মো. সুমন আহম্মেদ, ডা. সৌরভ সরকার দীপ্র, ডা. অনিন্দ্য কুশল পাল, ডা. মো. পাভেল ইসলাম, ডা. সিরাজাম মুনিরা, ডা. উজ্জ্বল মল্লিক, ডা. অনুপম ভট্টাচার্য্য, ডা. নাহিদুর রহমান, ডা. ইমতিয়াজ উদ্দিন মানিক, ডা. আহমেদ মুনতাকিম চৌধুরী, ডা. সাদি বিন শামস, ডা. নাজমুল হক, ডা. এ এইচ এম সাখারব ও ডা. সাবিহা আফরিন। চাকারিপ্রার্থীদের ভাষ্য, তাঁদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীর পারিবারিক বা আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মেধাভিত্তিক সমাজের পরিপন্থী। সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকের সুযোগের সমতার কথা বলা থাকলেও ভেরিফিকেশনের এই প্রক্রিয়া সেই অধিকারকে লঙ্ঘন করছে। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া সংবিধান, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কেবল মেধা ও যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আরও পড়ুন

এদিকে নিয়োগবঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা ২৫ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের আবেদন জমা দিয়েছেন। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মানসুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বঞ্চিত প্রার্থীরা তাঁদের অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন এবং সচিবের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন। তাঁদের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিষয়ে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করার আশ্বাস দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের এই আশ্বাসেও উজ্জ্বল, পাভেল কিংবা মুনিরাদের মনের অনিশ্চয়তা কাটেনি।

আরও পড়ুন

নারায়ণ মল্লিক কিংবা কামরুল ইসলামের মতো প্রান্তিক মানুষদের শঙ্কা, রাষ্ট্র তাঁদের সন্তানদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করবে কি? জুলাইয়ের স্পিরিট আর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের অঙ্গীকার কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি ২০২৬) ৪৮তম বিসিএসের (বিশেষ) প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষা-২০২৫-এর মাধ্যমে ৩ হাজার ২৬৩ জন প্রার্থীকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের প্রবেশ পদে জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ অনুসারে টাকা ২২০০০-৫৩০৬০/- বেতনক্রমে কয়েকটিতে নিয়োগ প্রদান করা হলো। পিএসসির সুপারিশের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ প্রজ্ঞাপন জারি করল। সুপারিশের অনেকেই প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ পড়েছেন।