তিন বিসিএসের জাঁতাকলে চাকরিপ্রার্থীরা: ৪৫ ও ৪৯তম–এর গেজেট না হওয়ায় ফাঁকা থাকবে ৪৭-এর আসনও

৪৫তম ও ৪৯তম বিসিএসে গেজেট না হওয়ায় আড়াই হাজার তরুণের কর্মজীবন ও স্বপ্ন অজানা অনিশ্চয়তার বৃত্তে বন্দী হয়ে আছেছবি: প্রথম আলো

প্রিলিমিনারি, লিখিত আর ভাইভা—বিসিএসের এই তিন কঠিন ধাপ পার করা যেকোনো তরুণের জন্য এক স্বপ্নের যাত্রা। দীর্ঘ লড়াই শেষে পিএসসির চূড়ান্ত তালিকায় যখন নিজের নামটি আসে, তখন মনে হয় সব অপেক্ষার অবসান ঘটল। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৪৫তম সাধারণ ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর দীর্ঘ সাত মাস পেরিয়ে গেছে। অথচ এখনো গেজেট বা প্রজ্ঞাপন আলোর মুখ দেখেনি। ফলে আড়াই হাজার তরুণের কর্মজীবন ও স্বপ্ন অজানা অনিশ্চয়তার বৃত্তে বন্দী হয়ে আছে।

আজ সোমবার এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে কথা বলেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। তবে তাঁর বক্তব্যে চাকরিপ্রার্থীদের মনে থাকা মূল প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর মেলেনি। গেজেট প্রকাশের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা চলতি জুলাইয়ের মধ্যে এটি সম্ভব কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো আভাস তিনি দিতে পারেননি। ফলে নিয়োগের এই প্রলম্বিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের আর্থিক ও মানসিক সংকট তীব্র হচ্ছে। আর এই দীর্ঘসূত্রিতার একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে সদ্য ঘোষিত ৪৭তম বিসিএসের ওপর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪৫ ও ৪৯তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক প্রার্থীই তাঁদের চাকরি নিশ্চিত না হওয়ায় পরবর্তী ৪৭তম বিসিএসের প্রক্রিয়াতেও অংশ নিয়েছিলেন। মেধার স্বাক্ষর রেখে তাঁরা নতুন এই বিসিএসেও চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, আগের বিসিএস দুটির গেজেট যথাসময়ে প্রকাশিত হলে তাঁরা সহজেই নিশ্চিত চাকরি বেছে নিতেন এবং ৪৭তম বিসিএসের পদগুলো ছেড়ে দিতেন। কিন্তু বর্তমান ধোঁয়াশার কারণে তাঁরা কোনো ঝুঁকি নিতে পারছেন না। ফলে দুটি জায়গায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ৪৭তম বিসিএসের পদ ছাড়তে পারছেন না। চাকরিপ্রার্থীদের আশঙ্কা, এই সমন্বয়হীনতার কারণে ৪৭তম বিসিএসের প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি মূল্যবান প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদ স্থায়ীভাবে ফাঁকা যেতে পারে, যা দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

বিসিএস পরীক্ষা শেষ করে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রথম আলো ফাইল ছবি

বাধ্যবাধকতা বনাম প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস—

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, একটি নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য নিয়োগ নিশ্চিত করতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও রি-ভেরিফিকেশনের মতো কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার স্বার্থে ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনে যুক্ত করতে এই যাচাই-বাছাইগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে তড়িঘড়ি করার সুযোগ না থাকায় একধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তবে এই অচলাবস্থার মাঝেই কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। তিনি জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে তীব্র জনবলসংকট চলছে। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেও খুব দ্রুত নতুন কর্মকর্তা প্রয়োজন। এই সংকট মেটাতে এবং শূন্য পদগুলো পূরণ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, প্রার্থীরা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করতে পারেন, সরকার সেই লক্ষ্যে সব প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

ক্যারিয়ারের শুরুতে তরুণদের মানবিক ও আর্থিক সংকট—

প্রশাসনিক এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাঠপর্যায়ের তরুণেরা এখন এক চরম মানবিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ৪৫তম সাধারণ বিসিএসের ১ হাজার ৮০৭ জন এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকের জন্য নেওয়া ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ৬৬৮ জন প্রার্থীর জীবন এখন পুরোপুরি থমকে আছে। পিএসসির চূড়ান্ত তালিকায় নাম আসার পর স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল তাঁদের পরিবারে। সেই খুশিতে অনেকেই তাঁদের আগের খণ্ডকালীন চাকরি বা টিউশনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন মাসের পর মাস গেজেটের অপেক্ষায় থেকে জমানো টাকা শেষ হয়ে গেছে। ফলে বন্ধুদের আড্ডায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ক্যাডার’ পরিচয়ের সম্মান মিললেও বাস্তব জীবনে তাঁদের চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, তাঁদের ক্যারিয়ারের এই অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং ৪৭তম বিসিএসের শত শত মূল্যবান পদ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে সরকার যেন আর দেরি না করে। সব ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে শিগগিরই গেজেট প্রকাশ করা হোক—এটিই এখন তাঁদের প্রধান দাবি।

আরও পড়ুন