শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ৯ জানুয়ারি: প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ‘কেন্দ্র কন্টাক্ট’ নিয়ে শঙ্কা চাকরিপ্রার্থীদের
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫’–এর নিয়োগ পরীক্ষা ৯ জানুয়ারি (শুক্রবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি চাকরিপ্রার্থীর অংশগ্রহণে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ‘কেন্দ্র কন্টাক্ট’-এর মতো অনিয়মের গুঞ্জনে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) জানিয়েছে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার যেকোনো মূল্যে অনিয়ম রুখতে সচেষ্ট রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
৯ জানুয়ারি সকাল নয়, পরীক্ষা হবে বিকেলে
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সরকার ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে ২ জানুয়ারির পরীক্ষা পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি সকাল ১০টায় নির্ধারণ করা হয়। তবে রোববার (৪ জানুয়ারি) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৯ জানুয়ারি পরীক্ষা সকালে নয়, বরং বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ওই দিন বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত দেশের সব জেলায় একযোগে এই লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। মূলত পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের স্বার্থে পরীক্ষার সময় পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ‘কেন্দ্র কন্টাক্ট’ নিয়ে শঙ্কা
নিয়োগ পরীক্ষা সামনে রেখে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ‘কেন্দ্র কন্টাক্ট’ প্রথা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রগুলোতে কক্ষ পরিদর্শকদের প্রলোভন দেখিয়ে অসাধু উপায়ে উত্তর বলে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যা কেন্দ্র কন্টাক্ট হিসেবে পরিচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চাকরিপ্রার্থী প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে অধিদপ্তর ‘হিসাব সহকারী’ পদের মতো একটি তুলনামূলক ছোট পরীক্ষা গ্রহণেও প্রশাসনিক অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদের বিপরীতে যেখানে ১০ লাখের বেশি প্রার্থী অংশ নেবেন, সেখানে কেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা ও কক্ষের শৃঙ্খলা কতটুকু বজায় থাকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক প্রার্থী প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কা প্রকাশ করে উদ্বেগ জানাচ্ছেন।
জেলায় জেলায় প্রস্তুতি
সারা দেশে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। ফরিদপুর জেলার ১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবেন ১৩ হাজার ৮৭০ জন প্রার্থী। জালিয়াতি রুখতে জেলাটিতে অভিনব এক পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। ফরিদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহিউদ্দীন জানান, কোন কক্ষে কোন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা হবে না। পরীক্ষা শুরুর মাত্র আধঘণ্টা আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে পরিদর্শকদের কক্ষ বণ্টন করা হবে।
ময়মনসিংহ জেলায়ও শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ৫৯টি কেন্দ্রে ৪২ হাজার ৯১০ জন চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেবেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) লুৎফুন নাহার জানান, কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে ইতিমধ্যে সভা শেষ হয়েছে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট ও পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। কুড়িগ্রামের ৩৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবেন ২৪ হাজার ২৭৪ জন। জেলা সদরের পাশাপাশি নাগেশ্বরী ও উলিপুর উপজেলার কেন্দ্রেও কড়া নজরদারি থাকবে। প্রতিটি কেন্দ্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তদারক করবেন। রংপুরের ২১টি কেন্দ্রেও ৩২ হাজার ১২৮ জন প্রার্থীর জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।
অধিদপ্তরের বক্তব্য
পরীক্ষা নিয়ে এই শঙ্কার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এ প্রসঙ্গে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দশ লাখ প্রার্থীর নিয়োগ পরীক্ষা নির্বিঘ্নে নেওয়া সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জ। হিসাব সহকারী পরীক্ষায় আমাদের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা এবার সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। ইতিমধ্যে ৬১ জন জেলা প্রশাসককে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রতিটি জেলায় পৌঁছেছে। ট্রেজারিতে কড়া পাহারায় সংরক্ষিত আছে।’ জালিয়াতি রুখতে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবেও তদারকি বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্দেশনা
প্রবেশের সময়: পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই বেলা দুইটার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। বেলা ২টা ৩০ মিনিটে কেন্দ্রের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর আর কোনো প্রার্থীকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
কান উন্মুক্ত রাখা: ব্লুটুথ ডিভাইস রোধে পরীক্ষা চলাকালে পরীক্ষার্থীদের উভয় কান উন্মুক্ত রাখতে হবে। পরিদর্শকেরা প্রয়োজনে টর্চলাইট দিয়ে কান পরীক্ষা করবেন।
নিষিদ্ধ সামগ্রী: কেন্দ্রে মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, স্মার্ট ওয়াচ, যেকোনো ধরনের ঘড়ি, পার্স বা কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব সামগ্রী পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র: রঙিন প্রিন্ট করা প্রবেশপত্র এবং মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে আনা বাধ্যতামূলক। ওএমআর শিট পূরণে অবশ্যই কালো কালির বলপয়েন্ট কলম ব্যবহার করতে হবে।
সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রতিটি কেন্দ্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। কোনো অসাধু চক্র যাতে প্রলোভন দেখিয়ে প্রার্থীদের সঙ্গে জালিয়াতি করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।