বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল
বিসিএস পরীক্ষায় একই পদে বারবার একই প্রার্থীর সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া এবং এর ফলে মূল্যবান ক্যাডার পদ খালি থেকে যাওয়ার সমস্যা কাটাতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে আসন্ন ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে রিপিট ক্যাডারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
বিসিএস পরীক্ষার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ‘রিপিট ক্যাডার’ বলতে মূলত এমন প্রার্থীদের বোঝায়, যাঁরা আগের কোনো বিসিএসে কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারে (যেমন—প্রশাসন, পুলিশ কিংবা শিক্ষা) সুপারিশপ্রাপ্ত বা চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী বিসিএসে পুনরায় একই ক্যাডারে আবার নতুন করে সুপারিশ পান। ফলে ওই প্রার্থী নতুন করে আর একই পদের বিপরীতে চাকরিতে যোগ দেন না। এতে সরকারি সিভিল সার্ভিসের মূল্যবান ক্যাডার পদটি খালি থেকে যায়। এর চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হন অন্য সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। এই দীর্ঘসূত্রতা ও অসংগতির কারণে প্রতিবছর শত শত যোগ্য ও মেধাবী চাকরিপ্রার্থী ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আলোচনায় ‘রিপিট ক্যাডার’, ৪৪তম বিসিএসের উদাহরণ
বিসিএস নিয়োগ পরীক্ষায় রিপিট ক্যাডারের এই অসংগতি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। তবে ৪৩তম বিসিএসের ফলাফল এবং বিশেষ করে ৪৪তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর এটি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
পিএসসির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৪তম বিসিএসের ১ হাজার ৭১০টি শূন্য পদের বিপরীতে যখন ১ হাজার ৭১০ জনের নাম সুপারিশ করা হয়, তখন দেখা যায়, মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জনই ছিলেন রিপিট ক্যাডার। অর্থাৎ, তাঁরা আগে থেকেই সরকারি কোনো না কোনো ক্যাডারে নিয়োজিত ছিলেন এবং অনেকে একই ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন। একটি বিসিএসে একসঙ্গে প্রায় ৪০০ জন রিপিট ক্যাডার আসার ঘটনা পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়—উভয়কেই বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। এ ঘটনার পরই রিপিট ক্যাডারের পদগুলোতে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে মেধাক্রম অনুযায়ী নতুনদের নিয়োগের তীব্র দাবি ওঠে।
বাস্তব হিসাব দেখে ৫০তম বিসিএসের ফলাফল
রিপিট ক্যাডার রোধে ইতিপূর্বে বিসিএস বিধি সংশোধন করা হলেও পুরো সংকট এখনো মেটেনি। অনেক সময় দুই বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা তথ্য গোপন করে পুনরায় একই ক্যাডারের পদ দখল করে রাখায় এই জটিলতা থেকে যায়। এ কারণে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিচ্ছে কমিশন।
ইতিমধ্যে ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে এবং সুপারিশপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ১ নভেম্বর তারিখে নতুন চাকরিতে যোগদানের দিন নির্ধারিত রয়েছে। প্রার্থীরা ক্যাডার পদে যোগ দেওয়ার পরই কেবল জানা যাবে, ঠিক কতজন বাস্তবে যোগ দিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে কতটি পদ ফাঁকা রইল। পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ১ নভেম্বরের পর এই যোগদানের সুনির্দিষ্ট হিসাব তদারকি করা হবে। ফাঁকা থাকা পদের প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তুত করা হবে, যাতে নতুনদের যথাযথভাবে শূন্য পদে পদায়ন করা যায়।
কমিশনের এই বাস্তবভিত্তিক কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। বিসিএস পরীক্ষার্থী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রিপিট ক্যাডারের কারণে আমাদের মতো সাধারণ প্রার্থীরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। একজন ব্যক্তি তথ্য গোপন করে বারবার পরীক্ষা দিয়ে একই পদ দখল করে রাখছেন, অথচ শেষ পর্যন্ত পদটি খালিই পড়ে থাকছে। ৪৫তম বিসিএসে যোগদানের সঠিক হিসাব দেখে পিএসসি যদি ৫০তম বিসিএসে প্রার্থীর সুপারিশ চূড়ান্ত করে, তবে শূন্য পদের সমস্যা অনেক কমে আসবে।’
এ ব্যাপারে পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম মতিউর রহমান প্রথম আলোকে জানান, রিপিট ক্যাডার সমস্যার কারণে প্রতিবছর অসংখ্য যোগ্য প্রার্থী তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর এই অসংগতি দূর করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ১ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের যোগদানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করে ৫০তম বিসিএসের ফলাফলে সেটি যুক্ত করা হবে, যাতে কোনো পদ শূন্য না থাকে এবং যোগ্য প্রার্থীরা তাঁদের অধিকার পান।
৪৪তম বিসিএসে রিপিট ক্যাডার জটিলতা তৈরি হওয়ার পর পিএসসি নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় কমিশন। পিএসসির পাঠানো প্রস্তাবিত শর্তে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুতকালে বা সরকারের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানোর সময় যদি কমিশনের কাছে তথ্য থাকে যে কোনো প্রার্থী একই ক্যাডার পদ বা সমপদে পুনরায় মনোনীত হচ্ছেন এবং তিনি সেখানে যোগদানে অনিচ্ছুক, তবে কমিশন তাঁকে পুনরায় সুপারিশ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে। একই সঙ্গে ওই শূন্য পদগুলোতে পরবর্তী মেধাক্রম থেকে প্রার্থীদের নির্বাচন করে ‘সম্পূরক ফলাফল’ প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে।