১৩৫৯৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ: প্রস্তাবিত এমসিকিউ পরীক্ষায় সংস্কার প্রয়োজন

ছবি: এআই/প্রথম আলো

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহকারী সুপার পদে মোট আবেদন করেছেন ৮৬ হাজার ৪৪৫ জন। ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় নিয়োগ হবে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার ও সহকারী সুপার।

আমাদের দেশের বাস্তবতায় দীর্ঘ লিখিত অথবা এককথায় বা একবাক্যে উত্তর লেখার মতো পরীক্ষা আয়োজন কষ্টসাধ্য, সময়সাপেক্ষ ও জনবলসাপেক্ষ হয় এবং অধিক নম্বরযুক্ত দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণে স্বজনপ্রীতির ঝুঁকি থাকে—এটি সত্য। আবার সময় সংক্ষিপ্ততা ও দক্ষ জনবলসংকটে কর্তৃপক্ষ এমসিকিউ পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে—সেটিও বাস্তবতা। তবে এমন যুক্তিতে এ দুরাবস্থা দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া মোটেও উচিত নয়। যত দ্রুত সম্ভব, কাটিয়ে উঠতে হবে এই দুর্বলতা। তার আগে অর্থাৎ, আসন্ন নিয়োগে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপাতত মন্দের ভালো হিসেবে কিছু যুক্তিসংগত সংস্কার জরুরি। যেমন—

আরও পড়ুন

১.

প্রার্থীর বিভিন্নমুখী আবশ্যকীয় যোগ্যতা আরও অধিক মাত্রায় যাচাইয়ের জন্য বর্তমান এমসিকিউ পরীক্ষার ব্যাপ্তি বাড়ানো। বর্তমানে ১ ঘণ্টায় ৮০টি প্রশ্নের পরিবর্তে ২ ঘণ্টায় ১৬০টি প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। পরে সহজেই সেটিকে ৮০ নম্বরে কনভার্ট করা সম্ভব। অধিক যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থীরা অবশ্যই এতে একমত হবেন। মেশিন রিডেবল হওয়ার কারণে এতে তেমন অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় হবে না। সাধারণ শিক্ষক নিয়োগের ১৯তম নিবন্ধনে যদি ২০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা হয়, তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগে কেন মাত্র ৮০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা হতে হবে?

আরও পড়ুন

২.

লটারি–নির্ভর ফলাফল হ্রাস করার জন্য নেগেটিভ মার্ক বাড়ানো। বর্তমানে ভুল উত্তরে কর্তন হবে মাত্র ০.২৫ নম্বর। এতে অনুমাননির্ভর ফলাফল অনেক বাড়বে। একজন প্রার্থী কিছুই না জেনে লটারি করে ৪টি প্রশ্নের উত্তরে গোল্লা ভরাট করলে যদি ১টি উত্তর শুদ্ধ হয় এবং ৩টি উত্তর ভুল হয়, তবও তাঁর ০.২৫ নম্বর থাকবে। আর যদি ২টি উত্তর শুদ্ধ এবং ২টি উত্তর ভুল হয়, তবে তাঁর ১.৫০ নম্বর থাকবে। যদি ৩টি উত্তর শুদ্ধ হয় এবং ১টি উত্তর ভুল হয়, তাহলে তাঁর ২.৭৫ নম্বর থাকবে। কেউ যদি ৪০টি প্রশ্নের নিশ্চিত শুদ্ধ উত্তর দিতে পারেন, তো পাবেন ৪০ নম্বর এবং বাকি ৪০টি প্রশ্নের যদি অনুমান করে বা লটারি করে উত্তর দেন, তো ৫০ শতাংশ উত্তর শুদ্ধ হলেও পাবেন ২০-৫=১৫ নম্বর। অর্থাৎ, মাত্র ৪০ নম্বরের শুদ্ধ উত্তর জেনে একজন প্রার্থী পেয়ে যেতে পারেন কমবেশি ৫৫ নম্বর! প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে এমন অনুমাননির্ভর পরীক্ষার ফলাফল মোটেও কাম্য নয়। কেননা, তাঁরা তো কাঁচা জ্ঞানের অধিকারী শিক্ষার্থী নন; বরং পাকা জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অধিকারী শিক্ষক। তাই প্রতিটি শুদ্ধ উত্তর দিলে যেমনি ১.০০ নম্বর পাবেন, তেমনি প্রতিটি ভুল উত্তর দিলে ১.০০ নম্বর কাটা যাওয়া উচিত। তাতে কারও প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিশ্চিত না হয়ে কেবল অনুমান করে কোনো গোল্লা ভরাট করার সম্ভাবনা থাকবে না। এর ফলে অনুমান বা লটারি–নির্ভর ভালো ফলাফল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না। নিশ্চিত অধিক যোগ্য আত্মবিশ্বাসী প্রার্থীরা প্রকৃত ফলাফলে ভালো করবেন এবং অযোগ্যদের তুলনায় অবশ্যই এগিয়ে থাকবেন। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সিদ্ধান্তহীনতা না থাকা অর্থাৎ, পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী থাকা অত্যাবশ্যক।

আরও পড়ুন

মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের টিকে থাকার ও ভালো করার চ্যালেঞ্জ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। তড়িঘড়ি করে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচন করতে গিয়ে যদি তুলনামূলক কম মেধাবীরা, কম যোগ্যরা, কম দক্ষরা, কম বুদ্ধিমানরা বা কম চৌকসরা নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কমবেশি ব্যর্থ হন, তো এ দুর্বলতার কারণেই এনটিআরসিএর নিকট থেকে নিয়োগক্ষমতা আবার জনপ্রতিনিধিরা নিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তেমনটি হওয়ার সুযোগ না দিয়ে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে সার্বিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বর্তমানে ও ভবিষ্যতে সর্বাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচন নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।

*লেখক: মো. রহমত উল্লাহ্, সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিষয়ক লেখক