৪৭তম বিসিএস মৌখিক পরীক্ষা: শেষ সময়ের প্রস্তুতি ও ভাইভা বোর্ডের রণকৌশল
৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) বর্তমানে চলমান। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই পর্যায়ে এসে সফল হওয়া মানেই ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নপূরণ। শেষ সময়ের প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়া এবং ভাইভা বোর্ডে নিজেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপনের কৌশল জানাচ্ছেন ৩৫তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ও ক্যারিয়ারবিষয়ক পরামর্শক রবিউল আলম লুইপা।
আপনার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল পাওয়ার সময় এখন। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে যে বিষয়গুলো আপনার নজরে রাখা জরুরি—
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) মৌখিক পরীক্ষার নোটিশে যে সব সনদ বা নথিপত্র উপস্থাপনের কথা বলেছে, সেগুলো একাধিক সেটে গুছিয়ে রাখুন। এটি প্রস্তুতির প্রথম ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে কোনো কারণে একটি কাগজ ভুলবশত বাদ পড়লে ঘাবড়াবেন না; বোর্ড সাধারণত প্রার্থীদের নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য সদয় সময় প্রদান করে থাকে।
ভাইভা বোর্ডের আচরণ ও পরিচ্ছন্নতা
কথায় আছে, ‘আগে দর্শনধারী, তারপর গুণবিচারী।’ রানী এলিজাবেথ বলেছিলেন, ‘A Good face is the best letter of recommendation.’ ভাইভা বোর্ডে আপনার প্রবেশ, ড্রেসআপ এবং গেটআপ বোর্ড সদস্যদের ওপর একটি স্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করুন যেন আপনাকে দেখেই তাঁরা আশ্বস্ত হন। বাসায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার চর্চা বা মডেল ভাইভা দেওয়ার সময় নিজের শারীরিক ভঙ্গি ও আচরণের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিন।
ভাষাগত সচেতনতা ও সঠিক সম্বোধন
মৌখিক পরীক্ষায় সম্বোধন এবং ভাষার ব্যবহার আপনার ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। আপনি যদি ‘May I come in?’ বলে প্রবেশ করেন, তবে পরের কথাগুলো ইংরেজিতে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সম্বোধনের ক্ষেত্রে সচেতন হোন—যেমন ভিসিকে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’, রাষ্ট্রপতিকে ‘মহামান্য’, প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাননীয়’ এবং সচিব বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘মহোদয়’ বলে সম্বোধন করা বাঞ্ছনীয়। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামের শুরুতে ‘জনাব’ বলা আপনার ভাইভার জন্য একটি ইতিবাচক টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।
পছন্দের প্রথম তিনটি ক্যাডার
আপনার আবেদনের তালিকায় থাকা ক্যাডার চয়েসের খুঁটিনাটি ভালো করে ঝালাই করে নিন। সাধারণত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়। এসব ক্যাডারের গঠনতন্ত্র (Hierarchy), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নাম এবং ক্যাডার সংশ্লিষ্ট সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখুন।
সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইট থেকে হালনাগাদ তথ্য
প্রতিদিনের সংবাদপত্র নিয়মিত পড়ুন এবং বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত তথ্যগুলো নিজের আয়ত্তে রাখুন। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি কিংবা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক খবরের মতো বিষয়গুলো প্রায়ই জানতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া নতুন গঠিত সরকারের মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়, সচিব, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নারী কর্মকর্তাদের (ডিসি বা এসপি) দায়িত্ব পালনের হালনাগাদ তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিন।
গাইডবই নির্ভর উত্তর এড়িয়ে চলুন
‘কেন সিভিল সার্ভিসে আসতে চান?’ কিংবা ‘অমুক ক্যাডার কেন প্রথম পছন্দ?’—এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর গাইডবই থেকে মুখস্থ বলবেন না। বোর্ড সদস্যরা বছরের পর বছর একই উত্তর শুনতে অভ্যস্ত। এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের অভিজ্ঞতা এবং স্বপ্নের মিশেলে এমনভাবে সাজান যা অন্যদের চেয়ে আলাদা ও চমৎকার হয়। বোর্ডে সব সময় সৎ ও সত্যবাদী থাকার চেষ্টা করুন; কৃত্রিমতা সহজেই ধরা পড়ে যায়।
সিচুয়েশনাল ও সাইকোলজিক্যাল প্রস্তুতি
৪০তম বিসিএস থেকে দেখা যাচ্ছে যে গতানুগতিক তথ্যের পাশাপাশি সিচুয়েশনাল বা মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন বেশি করা হচ্ছে। যেমন— ‘চাকরি পেলে আপনি ঘুষ খাবেন না, তা কীভাবে প্রমাণ করবেন?’ অথবা ‘একজন জেলা প্রশাসক হিসেবে মাদকবিরোধী অনুষ্ঠানে আপনি কী বক্তব্য দেবেন?’ এ জাতীয় প্রশ্নের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন। তাড়াহুড়ো না করে কিছুটা সময় নিয়ে গুছিয়ে বলা শুরু করুন।
ভাইভা পরীক্ষার দিন: পিএসসিতে যা হয়
বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা দেশের বিভিন্ন বিভাগে অনুষ্ঠিত হলেও মৌখিক পরীক্ষার জন্য পিএসসির প্রধান কার্যালয়ে (আগারগাঁও) উপস্থিত হতে হয়। পরীক্ষার দিন সকাল ৯টার মধ্যে নির্ধারিত সাক্ষাৎকারপত্র ও প্রয়োজনীয় সব নথিপত্রসহ উপস্থিত থাকা জরুরি।
প্রবেশ ও লটারি: সকাল সাড়ে ৯টায় প্রার্থীদের সুশৃঙ্খলভাবে পিএসসির নিচতলার ওয়েটিং রুমে নেওয়া হয়। সেখানে লটারির মাধ্যমে প্রতিটি রেঞ্জের প্রার্থীদের জন্য আলাদা আলাদা ভাইভা বোর্ড নির্ধারণ করা হয়। ফলে কোনো প্রার্থী বা বোর্ড মেম্বার আগে থেকে জানেন না কে কার অধীনে পরীক্ষা দেবেন, যা পিএসসির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
নিরাপত্তা: পিএসসিতে প্রবেশের আগেই অভ্যর্থনা কক্ষে প্রার্থীদের মোবাইল ফোন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যাগ জমা রেখে যেতে হয়।
বোর্ড গঠন: সাধারণত পিএসসির চেয়ারম্যান এবং সদস্যরা একেকটি বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিদিন আনুমানিক ১২ থেকে ১৩টি বোর্ড গঠন করা হয় এবং প্রতি বোর্ডে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সবশেষে মনে রাখবেন, ভাইভা বোর্ড আপনার জ্ঞান যাচাইয়ের চেয়েও বেশি আপনার আত্মবিশ্বাস ও বুদ্ধিমত্তা যাচাই করে। শান্ত থাকুন এবং নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করুন।