দুই মাসে ক্যাডার হওয়া কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়

লেখক

৪৮তম বিসিএসের সার্কুলার আসে আমার ইন্টার্নশিপ শুরু হওয়ার পরপরই। তখনো মন থেকে নতুন ডাক্তার হওয়ার আনন্দের রেশ কাটেনি। ক্যারিয়ার প্ল্যান নিয়ে আগে তেমন ভাবিনি বিধায় বিসিএসের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়নি। তত দিনে সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি দেশে ক্যারিয়ার করতে চাইলে ডাক্তারদের জন্য বিসিএস কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাতে সময় মাত্র দেড় মাস। একদিকে হাসপাতালে প্রতিদিন ৬-১২ ঘণ্টা ডিউটি, অন্যদিকে পাহাড়সমান সিলেবাস।

প্রস্তুতি ভালোভাবে নিলে প্রথমবারেই হবে—এই বিশ্বাস নিয়ে পড়া শুরু করি। সবার আগে নিজের শক্তিশালী ও দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে গড়ে ওঠা বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও গাণিতিক দক্ষতা ছিল আমার প্রধান পুঁজি, যা যা পড়তে হবে ফোনে পিডিএফ করে রেখে দিতাম। ডিউটির মধ্যে সুযোগ বুঝে চোখ বুলিয়ে নিতাম। এতে পুরোনো জ্ঞান নতুন করে ঝালাই হয়ে যেত। এমবিবিএসের সময় এই বিষয়গুলো টিউশন করানোও কিছুটা সুবিধা দিয়েছে।

অন্যদিকে আমার দুর্বলতা ছিল বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি। তাই এখানে বেশি সময় দিয়েছি। এই বিষয়ের যেহেতু কোনো সীমা নেই তাই অনেক না পড়ে বাছাই করে পরীক্ষায় আসার মতো টপিকগুলো বারবার পড়া উচিত।

৫১তম বিশেষ বিসিএসে নবীন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অতি অল্প সময়ে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ শেয়ার করেছেন ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে কর্মরত ডা. শাহজিয়া শাহরিন আনিকা।

আমি জেনারেল অংশে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম। ডাক্তার হিসেবে মেডিক্যাল অংশে কমবেশি সবাই ভালো করে। আমার মনে হয় লিখিত নম্বরে মূল পার্থক্য তৈরি করে দেয় জেনারেল পার্ট। আমি গণিত ও মানসিক দক্ষতার প্রস্তুতি খুব ভালোভাবে নিয়েছিলাম। ফলে মূল পরীক্ষায় এ বিষয়ে ১০০ শতাংশ সঠিক উত্তর করতে পেরেছি, যা আমাকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া স্বল্প সময়ে প্রস্তুতির জন্য একটা টপিক একেকবার বিভিন্ন বই থেকে না পড়ে একই জায়গা থেকে পড়ার অভ্যাস করা উচিত। এতে ভিজ্যুয়াল মেমোরি তৈরি হয় এবং পড়া মনে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করা বা বিভিন্নজনের হরেক রকম পরামর্শ গ্রহণ হিতে বিপরীত হতে পারে। অনেকেই জানতে চায় কোচিং করা জরুরি কিনা। যদি আগে থেকে কারও পড়া গোছানো থাকে তাহলে কোচিংয়ের দরকার নেই। তবে প্রথম প্রস্তুতি হলে বা পড়া গোছানোর সময় না থাকলে কোচিং বা মেন্টর উপকারী হতে পারে। এককথায় অন্যদের অন্ধভাবে অনুকরণ না করে নিজের প্রয়োজন বুঝে সেই অনুযায়ী প্ল্যানিং করলে এসব বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব।

মেডিক্যাল পার্টে যেসব প্রশ্ন আসে, তার বেশির ভাগ আমরা এমবিবিএসেই পড়ে আসি। এই অংশের ভালো নম্বর অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশ্নের মারপ্যাঁচ বুঝে ইতোমধ্যে জানা টপিক থেকে আসা প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক উত্তর করতে পারার ওপর। পড়ার পাশাপাশি আমি প্রচুর মডেল টেস্ট দিয়েছি। তবে মডেল টেস্ট যেন আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি তৈরি করার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। কম নম্বর পাওয়া, মেরিট পজিশনে পিছিয়ে থাকা, প্রস্তুতি সন্তোষজনক না হওয়া—এসব কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা যাবে না। প্রতিযোগিতা করতে হবে নিজের সঙ্গে। আগের দিনের চেয়ে পরদিন দুই নম্বর বেশি পাওয়া মানে ভালো অগ্রগতি। নিয়মিত পরীক্ষা সময় ব্যবস্থাপনায় এবং নার্ভাসনেস কাটাতেও দারুণ সাহায্য করে। আমি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ অবস্থায় লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ সত্ত্বেও বিচলিত না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল মডেল টেস্ট।

প্রস্তুতি যতই ভালো বা খারাপ হোক, ক্যাডার হওয়ার নির্ধারক পরীক্ষার হলের ১২০ মিনিটের কার্যক্রম। প্রথমে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত প্রশ্নগুলো দাগিয়ে ফেলতে হবে। গণিত শুরুতে উত্তর না করাই ভালো। কোনো অঙ্ক না মিললে তার পেছনে বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না। কারণ, প্রশ্নেও ভুল থাকতে পারে। শেষে যথেষ্ট সময় থাকতেই গুণে দেখতে হবে কাটমার্ক আসার মতো উত্তর করা হয়েছে কি না। মোটামুটি ১১০+ আমার সেফ জোন বলে মনে হয়। ৫০-৫০ সম্ভাবনার প্রশ্নের উত্তর করার ক্ষেত্রে রিস্ক বেনিফিট রেশিও চিন্তা করতে হবে। একদমই না জানা প্রশ্ন স্কিপ করতে হবে। আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে প্রিলিমিনারি (লিখিত) পরীক্ষার নম্বর ভাইভার সঙ্গে যোগ হবে, যার লিখিত ভালো হবে, ক্যাডার হওয়ার দৌড়ে সে-ই এগিয়ে থাকবে। তাই কোনো রকমে প্রিলি পাস করা লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।

আরও পড়ুন
ছবি: লেখকের পাঠানো

লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কিছুদিন পর ভাইভার প্রস্তুতি শুরু করেছিলাম। প্রথমেই ক্যাডার সার্ভিসে কর্মরত সিনিয়রদের কাছ থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা জেনে নিয়েছিলাম। একজন মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কী কী চিকিৎসা দিতে হবে এবং কোনো ধরনের সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সে সম্পর্কিত প্রশ্নই ভাইভায় বেশি করা হয়। ইন্টার্নদের যে প্লেসমেন্ট শেষ হয়েছে বা বর্তমানে চলছে, সেই বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে। যাঁরা এফসিপিএস বা অন্যান্য ট্রেনিং পোস্টে থাকেন, তাঁদের নিজ বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া খুব স্বাভাবিক। কিছু মেডিকোলিগ্যাল বিষয় ফরেনসিক মেডিসিন থেকে জেনে নেওয়া আবশ্যক। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সাম্প্রতিক বিষয়াবলি সম্পর্কে বেসিক ধারণা নিয়ে যেতে হবে। কিছু না জানলে ভুল বা অনুমাননির্ভর উত্তর না দিয়ে স্যরি বলা বুদ্ধিমানের কাজ। হাসিমুখে স্মার্টলি নিজেকে প্রেজেন্ট করতে পারলে সাধারণত ভালো নম্বরই আসে। ভাইভায় জ্ঞানের চেয়ে ব্যক্তিত্ব, উপস্থাপন, আদবকায়দা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

স্পেশাল বিসিএস ডাক্তারদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে যারা সদ্য এমবিবিএস পাস করেছে বা ইন্টার্নশিপ করছে, যথাযথ উপায়ে পরিশ্রম করলে তাঁদের ক্যাডার হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের থেকে বেশি। দেড়-দুই মাসে ক্যাডার হওয়া কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে পাঁচ হাজার পদের মধ্যে একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার পদ হতে পারে আপনার। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ভবিষ্যৎ অফিসারদের জন্য শুভকামনা।

লেখক: ডা. শাহজিয়া শাহরিন আনিকা, এমবিবিএস (শসোমেক), বিসিএস (স্বাস্থ্য), সহকারী সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

আরও পড়ুন