প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা কেমন হলো: ‘ডিজিটাল নকল’ ও ‘কেন্দ্র কন্ট্র্যাক্টের’ অভিযোগ

বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন শত শত চাকরিপ্রার্থী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মিরপুর, ঢাকা, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

সব শঙ্কা ও উদ্বেগের মধ্যেই ৯ জানুয়ারি সারা দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫’-এর লিখিত পরীক্ষা। ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি প্রার্থীর অংশগ্রহণে ৬১টি জেলায় এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজনের দিক থেকে এটি দেশের বৃহত্তম নিয়োগ পরীক্ষা। যেখানে সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল, সেখানে প্রায় সমপরিমাণ পরীক্ষার্থী এই নিয়োগ–যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের স্বচ্ছতা ও মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মাঠপর্যায় থেকে ‘ডিজিটাল নকল’ ও ‘কেন্দ্র কন্ট্র্যাক্ট’-এর ব্যাপক অভিযোগের পর আজ রোববার রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) সামনে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন শত শত চাকরিপ্রার্থী।

নজরদারির ঘাটতি

১০ লাখ প্রার্থীর এই নিয়োগ পরীক্ষাটি ছিল মূলত ১০ লাখ পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই। দেশের বৃহত্তম এই নিয়োগ পরীক্ষার জন্য সরকার ও অধিদপ্তরের যে ধরনের প্রস্তুতি ও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন ছিল, মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে দাবি করেছেন সাধারণ পরীক্ষার্থীরা। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনের নজরদারিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। আইন অনুযায়ী প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রের চারপাশে ১৪৪ ধারা জারি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ জেলাতেই এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায়নি। এর ফলে কেন্দ্রগুলোতে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অনেক কেন্দ্রে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ এবং কেন্দ্র সচিবদের শিথিলতার সুযোগে জালিয়াতি চক্র তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।

আরও পড়ুন

নীলফামারীতে লাঞ্ছিত পরীক্ষার্থী ও পুলিশের নীরবতা

নিয়োগ পরীক্ষা সামনে রেখে যে কেন্দ্র কন্ট্র্যাক্টের শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, ৯ জানুয়ারির পরীক্ষায় তা দেখা গেছে নীলফামারী জেলায়। শহরের নতুন বাজার দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বহিরাগতরা অবৈধভাবে কেন্দ্রে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়ার সময় সাধারণ পরীক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। অভিযোগ উঠেছে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় দুর্বৃত্তরা সাধারণ পরীক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বেশ কয়েকজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, হামলা চলাকালে পুলিশ সদস্যরা কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই ঘটনা কেবল নীলফামারীতে নয়, দেশের লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে চাকরীপ্রত্যাশীদের বিক্ষোভ। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মিরপুর, ঢাকা, ১১ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: প্রথম আ

আলোচনায় ‘ডিজিটাল নকল’

চাকরিপ্রার্থীরা এবারের পরীক্ষার অনিয়মকে ‘ডিজিটাল নকল’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাঁদের দাবি, কেন্দ্রের ভেতরে অতি সূক্ষ্ম ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ করে একদল অসাধু পরীক্ষার্থী বাইরে প্রশ্ন সরবরাহ করেছেন। পরে বাইরে থেকে কোচিং সেন্টারের শিক্ষক এবং গণিত-ইংরেজি বিষয়ের পারদর্শী শিক্ষকেরা সেই সমাধান তৈরি করে আবার কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রার্থী আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের কানের ভেতর থেকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্লু টুথ ডিভাইস বা ইয়ারফোন বের করার একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘খুব অল্পসংখ্যক পরীক্ষার্থী ধরা পড়লেও অধিকাংশ জালিয়াতি সবার নজরে আসেনি। স্থানীয় প্রশাসন ও অধিদপ্তরের একদল অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের ডিজিটাল নকল সম্ভব নয়।’ ডিজিটাল মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেক পরীক্ষার্থীর কান থেকে ইয়ারফোন বের করা হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্ন, যেখানে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সেখানে নিয়োগ পরীক্ষায় এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা কীভাবে ঘটে।

আরও পড়ুন

দেশজুড়ে সক্রিয় ছিল প্রতারক চক্র

পরীক্ষা ঘিরে দেশজুড়ে সক্রিয় ছিল প্রতারক চক্র। জালিয়াতি চক্রের দাপট এতটাই প্রবল ছিল যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সারা দেশে অন্তত ৫০ জন প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রংপুরের একটি রেস্তোরাঁ থেকে ডিভাইসসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজশাহীতে প্রশ্নপত্র সরবরাহের নামে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে ব্যাংকের স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক এবং স্ট্যাম্প হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের পাশের বাসা থেকে ডিভাইসসহ ১০ জনকে আটক করা হয়, যাঁদের মধ্যে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতাও রয়েছেন। নওগাঁর দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে আটক করে জেলা ডিবি পুলিশ, যাঁরা ছয়-সাত লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন সরবরাহের চুক্তিতে লিপ্ত ছিলেন।

আরও পড়ুন

বিক্ষোভ ও অধিদপ্তরের বক্তব্য

১০ লাখ প্রার্থীর এই বিশাল নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অধিদপ্তর ব্যর্থ হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে আজ বেলা ১১টা থেকে মিরপুরে অধিদপ্তরের প্রধান ফটক অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন চাকরিপ্রার্থীরা। বেলা দেড়টা পর্যন্ত অধিদপ্তরের সামনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের দাবি, পরীক্ষা শুরুর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মাথায় ডিজিটাল উপায়ে প্রশ্নপত্র বাইরে চলে গেছে, তাই এই পরীক্ষা বাতিল করতে হবে।

এত অভিযোগ ও ধরপাকড়ের পরও প্রশ্নপত্র ফাঁসের দাবি নাকচ করে দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পরীক্ষায় ৭৬ শতাংশ উপস্থিতি ছিল, যা সন্তোষজনক। বেশ কয়েকটি জেলায় জালিয়াত চক্র সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও প্রশাসনের কড়াকড়িতে তাদের পরিকল্পনা অনেকটা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁরা মূলত প্রতারণা করছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, ১০ লাখ প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়া একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

আবু নূর মো. শামসুজ্জামান আরও বলেন, ‘কেউ যদি তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দেন, আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখব। নিয়োগের ফলাফল সম্পূর্ণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে হবে, তাই কোনো স্তরেই মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না।’ শিগগিরই মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দেশবাসীকে অধিদপ্তরের অবস্থান জানানো হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

সাধারণ মানুষ ও পরীক্ষার্থীরা মনে করেন, এই নিয়োগ পরীক্ষাটি সরকারের আরও গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত ছিল। দেশের বৃহত্তম এই নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা আরও প্রকট হবে। ১০ লাখ মেধাবী তরুণের স্বপ্ন যেন জালিয়াতির কাছে হেরে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে আরও সজাগ ও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন: মীর মাহমুদুল হাসান (প্রতিনিধি, নীলফামরী), জহির রায়হান (প্রতিনিধি, রংপুর), ওমর ফারুক (প্রতিনিধি, নওগাঁ), শফিকুল ইসলাম (প্রতিনিধি, রাজশাহী)

আরও পড়ুন