মেধার পাশাপাশি সততা ও নৈতিকতার সন্ধানে পিএসসি: এক বছরে বিসিএস শেষ করার প্রতিশ্রুতি

পিএসসির এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে অতিথিরাছবি: পিএসসির সৌজন্য

সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা নাকি সততা—কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই কি একজন দক্ষ প্রশাসক হওয়া সম্ভব? বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) এক বিশেষ আলোচনা সভায় উঠে এল এমন সব মৌলিক প্রশ্ন। আজ সোমবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে কমিশনের এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে দেশের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা সিভিল সার্ভিসের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে পিএসসির সদস্য এবং ইউএনডিপি ও সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জট থেকে সুশাসনে ফেরার ইঙ্গিত

অনুষ্ঠানের শুরুতে পিএসসি সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস ‘জট থেকে সুশাসনে ফেরা’ শীর্ষক এক বছরের সংস্কার কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, পিএসসি এখন আর পুরোনো স্থবিরতা ও জটের মধ্যে নেই। ৫০তম বিসিএস থেকে ‘এক বছরে এক বিসিএস’ চক্র চালুর মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গতি আনা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৪৪ থেকে ৪৯তম বিসিএস পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ৭২৮ প্রার্থীকে ক্যাডার পদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতা রাখছেন পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম
ছবি: পিএসসির সৌজন্য

ড. সায়মা ফেরদৌস তাঁর উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে প্রশ্নপত্র মুদ্রণ, উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় ও খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন খরচ ৬০ শতাংশ এবং মুদ্রণ খরচ ৮০ শতাংশ কমানো হয়েছে। আগে যেখানে উত্তরপত্র মূল্যায়নে এক বছরের বেশি সময় লাগত, এখন তা মাত্র তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া বুয়েটের সহায়তায় প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য ‘ইউনিক আইডি’ও বিশেষ সফটওয়্যার তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, যা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তথ্যের ভুল ও জালিয়াতি রোধ করবে। ৪৭তম বিসিএস থেকে ভাইভা নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করার সিদ্ধান্তের কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যাতে মৌখিক পরীক্ষার চেয়ে প্রার্থীর লিখিত মেধার প্রতিফলন বেশি গুরুত্ব পায়।

মেধা ও সততার সমন্বয়ে জোর

প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর শুরু হয় ‘সিভিল সার্ভিস নিয়োগে মেধা ও জন–আস্থা শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। আলোচনার শুরুতেই ইউএনডিপি বাংলাদেশের ডেপুটি আবাসিক প্রতিনিধি সোনালী দায়রত্নে এক অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনেন। তিনি নিজের দেশ শ্রীলঙ্কার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে সিভিল প্রশাসনে মেধাবীদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সততার অভাবে সিভিল প্রশাসনে দুর্নীতি মহামারির আকারে ছড়িয়েছিল। এমনকি একসময় খোদ প্রধানমন্ত্রীও সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতেন। ফলে দেশটি ২০২৩ সালে ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েছিল। তাঁর মতে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের মূল ভারকেন্দ্র হওয়া উচিত সততা। শুধু মেধা দিয়ে জাতীয় সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

সোনালী দায়রত্নের আলোচনার সূত্র ধরে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, দেশের মেধাবীদের প্রথম পছন্দ বিসিএস। তবে কেবল ‘গ্র্যাজুয়েট’ তৈরি করলেই হবে না, নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু করতে হবে। তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার তাগিদ দেন, যেখানে কেবল বিসিএস প্রার্থী নয়, বরং দার্শনিক বা চিন্তাবিদ হওয়ার সুযোগও থাকবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বিসিএস নিয়ে প্রচলিত উন্মাদনাকে এক সামাজিক ‘ব্যাধি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ফলে তার সৃজনশীল বিকাশের সময়টি বিসিএস গিলে খাচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক বা বড় বেসরকারি পদে থেকেও অনেকে বিসিএস দিচ্ছেন শুধু বিশেষ কিছু পদের প্রতি মোহ থেকে। এই দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়া রোধে তিনি নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আধুনিক ও সৃজনশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পিএসসি সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস ‘জট থেকে সুশাসনে ফেরা’র বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন
ছবি: পিএসসির সৌজন্য

আলোচনায় অংশ নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী আমলাতন্ত্রের এক রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি সরাসরি বলেন, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের অনেকের মধ্যেই দক্ষতার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং পরিচালনা করার মতো পেশাদার দক্ষতা কর্মকর্তাদের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বাস্তবতা বদলাতে তিনি সৎ, মেধাবী ও সৃজনশীল চাকরিপ্রার্থীদের সিভিল সার্ভিসে আসার পথ আরও প্রশস্ত করার আহ্বান জানান। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সরকারি চাকরির শূন্য পদ পূরণে সব মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং নন-ক্যাডার থেকে সর্বোচ্চ নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। প্যানেল আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন পিএসসি সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) ড. আনোয়ারুল ইসলাম।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পিএসসির প্রতিশ্রুতি

প্যানেল আলোচক ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন–বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার পিএসসিকে কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে না এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। পিএসসির বাজেটের অর্থ একবারে ছাড় করার ব্যবস্থা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার একটি বৈষম্যহীন সমাজ চায়, যেখানে দুর্নীতির কোনো স্থান থাকবে না।

আরও পড়ুন

প্যানেল আলোচনা শেষে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তরে উঠে আসে মাঠপর্যায়ের নানা সংকটের কথা। ইউজিসি সদস্য তানজীমউদ্দিন খান প্রস্তাব করেন, সততা ও যৌক্তিক চিন্তার চর্চা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শুরু করা উচিত এবং এ কাজে পিএসসিকে সম্পৃক্ত করা যায় কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। এ ছাড়া নন-ক্যাডার নিয়োগে ধীরগতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশ ভেরিফিকেশনে মেধাবীদের বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক। উদাহরণ হিসেবে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েও রাজশাহী পুঠিয়ার এক প্রার্থীর নিয়োগ না হওয়ার প্রসঙ্গটি আসে। জবাবে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রথা দ্রুত সম্পন্ন করতে সরকার সচেষ্ট এবং নন-ক্যাডার থেকে সর্বোচ্চ নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পিএসসির এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে
ছবি: পিএসসির সৌজন্য

আলোচনায় অংশ নিয়ে পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম বলেন, কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার সময় মানুষের মধ্যে যে অনাস্থা ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে তাঁরা সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে প্রিলিমিনারি থেকে চূড়ান্ত ফল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এক বছরে একটি বিসিএস শেষ করার লক্ষ্যে অবিচল। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে কমিশনের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা দরকার।’

অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন পিএসসি সচিব সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন