প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পিএসসি কি এবার সফল হবে
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়ায় গতি আনতে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘অটোমেশন’ বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। আবেদনপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এখন একটি আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির এই বাহ্যিক পরিবর্তনের আড়ালে প্রতিষ্ঠানটির মৌলিক সংকটগুলো এখনো কাটেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতার অভাব থাকায় ৫০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পিএসসি এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রকৃত স্বকীয়তা ফিরে পায়নি। নথিপত্র ও বাজেটের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর অতি–নির্ভরশীলতা পিএসসিকে কার্যত একটি ‘অধীনস্থ দপ্তরের’ মতো অবস্থানে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
অটোমেশনের ছোঁয়া ও ‘ইউনিক আইডি’র অপেক্ষা
নিয়োগের প্রক্রিয়ায় মানবিক হস্তক্ষেপ কমাতে ও জালিয়াতি রোধে পিএসসি এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় তৈরি করা হচ্ছে একটি সমন্বিত সফটওয়্যার। এই সংস্কারের অন্যতম আকর্ষণ হলো চাকরিপ্রার্থীদের জন্য ‘ইউনিক আইডি’ (Unique ID) বা একক পরিচয়ের ব্যবস্থা। পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থীদের জন্য ইউনিক আইডি চালুর প্রাথমিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনাও হয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় বাজেট প্রাপ্তি সাপেক্ষে এই কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউনিক আইডি মূলত প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য বরাদ্দকৃত একটি স্থায়ী ডিজিটাল প্রোফাইল। বর্তমানে একজন প্রার্থীকে প্রতিবার আবেদনের সময় নতুন করে সব তথ্য দিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইউনিক আইডি চালু হলে প্রার্থীর নাম, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আগের বিসিএসগুলোয় তাঁর অর্জিত ফলাফল এই আইডির বিপরীতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্রে গোপন বারকোড যুক্ত করা হয়েছে, যদি কোনো কারণে প্রশ্নপত্র কোনো কেন্দ্র বা কক্ষ থেকে বাইরে যায়, তাহলে তা সহজেই শনাক্ত করা যাবে। এমনকি মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডও এখন সফটওয়্যারের মাধ্যমে লটারির ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে।
সাংবিধানিক মর্যাদা বনাম আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতা
পিএসসি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালেও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। সংবিধানের ১৪০ ও ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি মনোনয়নের মূল দায়িত্ব কমিশনের। কিন্তু বাস্তবে সামান্য একটি প্রবিধান সংশোধন বা পরীক্ষার ফি কমানোর মতো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের জন্যও কমিশনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় মাসের পর মাস বসে থাকতে হয়।
পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের মতো নিজস্ব বিধি প্রণয়নের স্বাধীনতা পিএসসির নেই। ২০১১ সালের পর রাজনৈতিক প্রভাবে কমিশন কার্যত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তরের মতো কাজ করছে। প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা পাওয়া গেলে এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস সম্পন্ন করা সহজেই সম্ভব হবে।’ বর্তমানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আর্থিক বরাদ্দের জন্যও পিএসসিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হতে হয়, যা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
অধ্যাদেশ ও ঝুলে থাকা আর্থিক স্বাধীনতা
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগে উপদেষ্টা পরিষদে ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’–এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল পিএসসিকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, যাতে বাজেটের টাকা ব্যয়ের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি নিতে না হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ায় এবং বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করায় ওই অধ্যাদেশ এখন আর কার্যকর নেই। বর্তমান পটভূমিতে পিএসসির আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় সংসদে নতুন করে ‘বিল’ উত্থাপন ও পাস করতে হবে। এই নতুন আইনিপ্রক্রিয়ার কারণে পিএসসির প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়টি আবারও দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে। ফলে কমিশনকে এখনো প্রতি পদক্ষেপে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নন–ক্যাডার নিয়োগে অনিশ্চয়তা ও শূন্য পদের সংকট
পিএসসির আধুনিকায়নের উদ্যোগের মধ্যেও নন–ক্যাডার নিয়োগ নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা আছে। ৪৫তম বিসিএসসহ বিভিন্ন বিসিএসের নন–ক্যাডার প্রার্থীরা পদসংখ্যা বাড়ানোর দাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করছেন। পিএসসির ভাষ্যমতে, ২০২৩ সালের নতুন নিয়োগ বিধিমালার কারণে তারা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত পদের বাইরে অন্য কোনো পদে সুপারিশ করতে আইনি জটিলতা রয়েছে। অথচ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে এখনো লাখ লাখ পদ শূন্য পড়ে আছে।
চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এই বিশালসংখ্যক শূন্য পদ থাকার পরও যোগ্য প্রার্থীরা নিয়োগ পাচ্ছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নিয়োগপ্রত্যাশী বলেন, ‘সফটওয়্যার বা বারকোড দিয়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতা হয়তো বাড়বে, কিন্তু যদি শূন্য পদের বিপরীতে যথাযথ চাহিদাপত্রই না আসে, তবে এই অটোমেশন আমাদের বেকারত্ব ঘোচাতে পারবে না। পিএসসিকে কেবল পরীক্ষা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শূন্য পদের চাহিদা আদায়ে আরও বেশি উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।’ পাশাপাশি রিপিট ক্যাডার সমস্যার কারণেও অনেক সময় মেধাবী প্রার্থীদের সুযোগ কমে যাচ্ছে, যা নিরসনে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক মনে করেন, পিএসসিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজস্ব স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, পিএসসিকে কেবল নামমাত্র স্বাধীন থাকলে চলবে না; বরং নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য এর পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান কমিশনের উচিত মানসম্মত প্রশ্ন প্রণয়ন ও নিয়োগের প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা। বিশেষ করে প্রার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা যাচাইয়ে ‘সাইকোমেট্রিক টেস্ট’ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হৃদ্যন্ত্র ও শরীরের সহনশীলতা পরিমাপের জন্য ‘ডিওবি (ডবুটামিন স্ট্রেচ) টেস্টিং’–এর মতো আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পিএসসি ঘোষিত ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও এই বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন পদ্ধতিগুলো দেশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।