এসএসসির পর ১০ ঘণ্টা মোবাইল নয়, বরং সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা কাজ করুন

কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে পছন্দের বই খোঁজায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরাছবি: প্রথম আলো

এসএসসির ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। সামনে নতুন কলেজ। নতুন বই। সঙ্গে একরাশ নতুন স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন।

বাসায় আড্ডা দিচ্ছেন? হাত চলে যাচ্ছে মোবাইলে। পড়া শেষ? একটু বিশ্রামের নামে মোবাইল। ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল। সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কাজ স্ক্রল করা। মাঝে মাঝে মনে হয়, স্মার্টফোনের চার্জ এক শ থেকে শূন্যে নামানোই যেন এখনকার প্রধান কাজ।

তবে এই হাসিমজাক রূপ নিচ্ছে আসল দুশ্চিন্তায়। বাংলাদেশে কিশোরদের স্মার্টফোন আসক্তি নিয়ে কাজ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁদের ২০২৫ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত ‘বাংলা ডিজিটাল অ্যাডিকশন স্কেল’ গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে। দেখা যায়, প্রায় ৫৩ শতাংশ কিশোর নিয়মিত স্মার্টফোন ব্যবহার করে। বয়স ও শ্রেণি যত বাড়ে, ডিজিটাল আসক্তি তত বাড়ে। এই আসক্তির ক্ষতিকর দিক অনেক। বিষণ্নতা ও উদ্বেগ বাড়ে। বিশেষ করে অনিদ্রার সঙ্গে এর বড় সম্পর্ক রয়েছে। স্মার্টফোনের আলো যত জ্বলছে, কিশোরদের রাতের ঘুম তত উবে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—স্ক্রিনের পেছনে হারিয়ে যাওয়া এই সময়ের কিছুটা কি দরকারি কাজে লাগানো যায়?

এখানে পড়াশোনা ছেড়ে চাকরিতে নামার কথা বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে কাজ শেখার কথা। কেউ পরিবারের ব্যবসায় দিনে দু-এক ঘণ্টা সাহায্য করতে পারে। কেউ ছোটদের পড়াতে পারে। কেউ টুকটাক কারিগরি দক্ষতা দিয়ে কাজ শুরু করতে পারে। আবার কেউ যুক্ত হতে পারে স্বেচ্ছাসেবী কাজে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এই চর্চা খুব একটা নেই। এসএসসির পর একমাত্র লক্ষ্য থাকে নামীদামি কলেজ। তারপর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। কাজের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় একেবারে লেখাপড়ার শেষে। প্রথম চাকরির ইন্টারভিউতে তখন প্রশ্ন আসে, ‘কাজের কোনো অভিজ্ঞতা আছে?’ প্রার্থীকে আমতা–আমতা করে বলতে হয়, ‘না স্যার, আমি ফ্রেশার!’

বিদেশের তরুণেরা যা করছে—

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে চিত্রটি পুরোপুরি আলাদা। পড়াশোনার পাশাপাশি সীমিত সময় কাজ করা সেখানে অতি পরিচিত একটি সংস্কৃতি।

বিখ্যাত সাময়িকী ফোর্বস-এ ২০২৬ সালের ২৬ মে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরদের কাজের নানা ধরন তুলে ধরা হয়। তারা বাগান করা, পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া কিংবা স্থানীয় ছোট ব্যবসার ডিজিটাল প্রচারে সহায়তা করে। এসব কাজের মূল উদ্দেশ্য বড় অঙ্কের টাকা আয় করা নয়। বরং কিশোরদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সঠিক যোগাযোগ ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করাই এর আসল লক্ষ্য।

পড়াশোনার পাশাপাশি এই কাজের সংস্কৃতি কতটা জনপ্রিয়, তা ওই সিডির একটি গবেষণায় স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ওই শিক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংস্থাভুক্ত দেশগুলোতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের গড়ে ১৯ শতাংশ তরুণ পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে। নেদারল্যান্ডসে এই হার ৫১ শতাংশের বেশি।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান-এর ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনেও একটি জরুরি বিষয় উঠে এসেছে। বলা হয়েছে নির্দিষ্ট কোনো বেতনভুক্ত চাকরি না পেলেও ক্ষতি নেই। স্বেচ্ছাসেবা বা নিজের উদ্যোগে তৈরি ছোট প্রজেক্টও জীবনবৃত্তান্তকে ভারী করে। অর্থাৎ কাজ মানে কেবল টাকা নয়, কাজ মানে অমূল্য অভিজ্ঞতা।

আরও পড়ুন
মুঠোফোন
ছবি: প্রতীকী

ছোট কাজে বড় শিক্ষা

ধরুন, দুই বন্ধু মিলে টি-শার্ট বিক্রির একটি পেজ খুলল। কেউ পুরোনো বই কিনে বেচে দিল। কেউ ঘরে তৈরি খাবার পরিচিতদের কাছে বিক্রি করল। কিংবা সহজ কোনো বিষয়ে টিউশনি শুরু করল।

মাস শেষে আয় হয়তো সামান্য। হয়তো বন্ধুকে নিয়ে এক কাপ চা খাওয়ার টাকা! কিন্তু দিন শেষে শেখার জায়গাটা বিশাল।

ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা। খরচের হিসাব রাখা। দাম ঠিক করা। মেজাজ ঠিক রেখে সময়মতো কাজ বুঝিয়ে দেওয়া। ভুল হলে পরিস্থিতি সামলানো। এসব দক্ষতা বাজারের দামি বই পড়ে পুরোপুরি শেখা অসম্ভব। ব্যবসার প্রথম লাভ তাই টাকা নয়। প্রথম লাভ হলো—নিজের দক্ষতার ওপর আস্থা।

আরও পড়ুন

পড়াশোনাই আগে, কাজ তার পাশে

তবে এখানে একটি জরুরি শর্ত আছে। কাজ যেন কখনো পড়াশোনার ক্ষতি না করে। অতিরিক্ত কাজের চাপ হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে। তাই ‘সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা কাজ’ কোনো আইনি নিয়ম নয়। এটি কেবল একটি বাস্তবমুখী চিন্তার খোরাক।

ফেসবুক বা ভিডিও গেমসে যে সময়টা গলে যাচ্ছে, তার সামান্য অংশ কি নিজের দক্ষতা তৈরিতে দেওয়া যায় না? এসএসসির পর কাউকে সংসার চালাতে হয় না। কিন্তু কাজ তো শেখা যায়। বাজার বুঝতে চেষ্টা করা যায়। ছোট উদ্যোগে নিজের ঝুলিতে নতুন দক্ষতা যোগ করা যায়।

কারণ, আজ থেকে কয়েক বছর পর ইন্টারভিউ বোর্ডে একটি প্রশ্ন আসবেই—‘আপনার কাজের কি কোনো অভিজ্ঞতা আছে?’

তখন আর মাথা নিচু করে বলতে হবে না, ‘না স্যার, আমি ফ্রেশার!’

বরং মুখে হালকা হাসি রেখে অনায়াসে বলা যাবে—‘স্যার, বড় পদে চাকরি করিনি। তবে কাজ কীভাবে সামলাতে হয়, সেই অভিজ্ঞতা আমার ভালোই আছে!’

আরও পড়ুন