পাঠ্যবইয়ে বড় পরিবর্তন আসছে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকাসহ নতুন কী কী যুক্ত হচ্ছে
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শুরু আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়েও বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও রাখা হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে।
ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই। এখন এসব বইয়ের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এ মাসেই সেগুলো চূড়ান্ত হওয়ার কথা। বইগুলো প্রণয়নে ইলাস্ট্রেশন বা চিত্র-অলংকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ওই সময় ২০২২ সালের শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম চালু করা হয়, যা এখনো চলছে। তবে শিক্ষাক্রম বাতিল করলেও তারা নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
ইতিহাস বিষয়ে যেসব পরিবর্তন
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী যুক্ত করা হচ্ছে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্স বিষয়ক লেখা। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি যুক্ত করা হচ্ছে।
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণির একই বিষয়ের বইয়ে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের বিষয়ে লেখা রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শীর্ষক একটি নতুন প্রবন্ধ যুক্ত করা হচ্ছে। তৃতীয় ভাষা শেখার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। মাধ্যমিকের আইসিটি বইয়েও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা যুক্ত করা হবে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করাতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, কোন শ্রেণিতে কতটা বিস্তারিতভাবে এসব বিষয় থাকবে, তা শ্রেণিভেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ে তুলনামূলক কম বর্ণনা থাকবে। নবম শ্রেণির বইয়ে বিষয়গুলো তুলনামূলক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ওই সময় ২০২২ সালের শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম চালু করা হয়, যা এখনো চলছে। তবে শিক্ষাক্রম বাতিল করলেও তারা নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৮ সালে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিমার্জন করা হবে। তার আগে ২০২৭ সালের বিদ্যমান বইগুলো পরিমার্জনের পাশাপাশি চারটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে।
গত রোববার এনসিটিবিতে গিয়ে দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নতুন চারটি বইয়ের বিষয়বস্তু যাচাইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ করা হচ্ছে।
নতুন চার বইয়ে ৭১০ ছবি
আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। দুটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বইগুলো বাধ্যতামূলক হবে। তবে এসব বিষয়ের বার্ষিক পরীক্ষা হবে না; ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। নতুন বইয়ের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। এসব বই ছাপার জন্য বর্তমানে দরপত্রের কাজ চলছে। একই সঙ্গে বই প্রণয়নের কাজও চলছে।
গত রোববার এনসিটিবিতে গিয়ে দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নতুন চারটি বইয়ের বিষয়বস্তু যাচাইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন বইয়ের একটি ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এ বইয়ের অন্যতম লক্ষ্য। কয়েকটি অধ্যায়ে বইটির বিষয়বস্তু সাজানো হয়েছে। অধ্যায়গুলো হলো কারিগরি শিক্ষা পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, যারা বানায় তারাই পৃথিবী বদলায়, সমস্যা ও সমাধান করি, ছোট উদ্যোগ বড় সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পেশা ও দক্ষতা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপন এবং শব্দকোষ।
ষষ্ঠ শ্রেণির আরেকটি নতুন বই ‘আনন্দময় শিক্ষা’। এতে মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বইটিও কয়েকটি অধ্যায়ে সাজানো। বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে আমি ও আমরা, আমার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঙ্গে খেলি, নতুন কিছু করি, পরিষ্কার থাকি পরিচ্ছন্ন রাখি, উদ্যাপনের দিনগুলো এবং আনন্দে থাকি, আনন্দে রাখি।
চতুর্থ শ্রেণির নতুন বইয়ের একটি ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। এতে সংস্কৃতির ধারণা, ব্যক্তিজীবনে সংস্কৃতির প্রভাব, জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
একই শ্রেণির আরেকটি নতুন বই ‘খেলাধুলা’। এতে আটটি খেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খেলাগুলো হলো ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা বলছেন, নতুন চারটি বইয়ে ইলাস্ট্রেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চারটি বইয়ে মোট ৭১০টি ছবি থাকবে। এর মধ্যে ‘খেলাধুলা’ বইয়েই তিন শতাধিক ছবি থাকবে।
বই তৈরির সঙ্গে যুক্ত চারজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারে, সে জন্য বইগুলোতে ছবির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত বই ছাপার কাজ আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বই ছাপিয়ে পাঠাতে পারব বলে আমরা আশা করছি।অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের, এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক)
প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপা হবে
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপা হবে। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। এবার পাঠ্যবই ছাপায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই চার রঙে ছাপা হচ্ছে। বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ হতে হবে। দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে বই ছাপার কাজ দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠান। আর এখন পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পাচ্ছে ৭৬টি প্রতিষ্ঠান।
এনসিটিবির সূত্র বলছে, ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিকের ছাপা শেষ হওয়া প্রায় ২১ শতাংশ বইয়ের প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ শতাংশের বেশি বই সরবরাহ করা হয়েছে। এনসিটিবির লক্ষ্য, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মূল ছাপার কাজ শেষ করে বই মাঠপর্যায়ে পাঠানো। অবশ্য নতুন চারটি বই এই সময়ে ছাপা শেষ না–ও হতে পারে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বই ছাপার কাজ আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বই ছাপিয়ে পাঠাতে পারব বলে আমরা আশা করছি।’