ডিসেম্বরে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার পরিকল্পনা: কী বলছেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দুই পাবলিক পরীক্ষা প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার সম্ভাব্যতা যাচাইসহ একগুচ্ছ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে দেশের ‘পরীক্ষার মৌসুম’ হিসেবে পরিচিত ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হলে তা শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই ইতিবাচক হবে। তবে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দুই বছর (নবম-দশম) এবং এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দুই বছর (একাদশ-দ্বাদশ) পড়াশোনার সময় যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ শিখনঘাটতি এড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।
উদ্দেশ্য ভালো। পরিকল্পনা করে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ইতিবাচক হবে।অধ্যাপক মনজুর আহমদ
সভায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে এই দুই পরীক্ষায় বিষয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এসএসসি এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা। প্রতিবছর এই দুই পরীক্ষায় সারা দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় কেবল ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩১০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪, যা আগের বছর ছিল ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন; পুনর্নিরীক্ষণের পর এ সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।
বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে যে বছর দশম শ্রেণির ক্লাস শেষ করে, তার পরের বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। এইচএসসির ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির শুরুতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। তবে করোনা পরিস্থিতির পর থেকে এই সূচি আর বজায় রাখা যাচ্ছে না; বরং আরও পিছিয়েছে। যেমন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে আগামী ২১ এপ্রিল, আর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে জুন মাসে।
এ পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে এই দুই পরীক্ষায় বিষয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাবর্ষ জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ডিসেম্বরে শেষ হয়। এ প্রেক্ষাপটে ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয় ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক এক চেয়ারম্যানের সঙ্গে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সাবেক চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছরের কোর্সের সময় যদি সমন্বয় করা যায়, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। বরং বাংলাদেশে ডিসেম্বরই পরীক্ষার মৌসুম; সারা দেশের বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষাও এ সময়েই অনুষ্ঠিত হয়। ফলে সময় সমন্বয় করা গেলে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও ডিসেম্বরে নেওয়া সম্ভব এবং তা ভালো ফল দেবে। তবে এসএসসির ক্ষেত্রে নবম-দশম এবং এইচএসসির ক্ষেত্রে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিখনঘাটতি না থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত দুটি পরামর্শক কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করেছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল। এ ক্ষেত্রে জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মকালীন ছুটি রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক মনজুর আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, উদ্দেশ্য ভালো। পরিকল্পনা করে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া গেলে তা ইতিবাচক হবে। বর্তমানে বেশ কিছু সময় অপচয় হয়; তা কমিয়ে বছরের শেষে পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ করা গেলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী বছরের শুরুতেই শিক্ষার পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে। তবে হুটহাট করে নয়, পরিকল্পিতভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তনের সুপারিশের প্রসঙ্গ তুলে মনজুর আহমদ বলেন, দুই থেকে তিন বছরের পরিকল্পনা করে এ ধরনের পরিবর্তন করা উচিত, যাতে বছরের উপযোগী সময়টি পড়াশোনার জন্য সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করা যায়। তাঁর মতে, বর্তমান শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী এখন বছরের শেষে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলে তা ভালো হবে।
অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিটি মাধ্যমিকে সব বিষয়ের পরিবর্তে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক দক্ষতাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন দক্ষতাভিত্তিক ও প্রয়োগমুখী হবে।
এ ছাড়া মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি), গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা তৈরিকে ভিত্তিমূলক দক্ষতা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখায় বিভাজন না করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন শিক্ষাক্রমের আলোকে পড়ানো এবং একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শাখায় বিভাজন করারও সুপারিশ করেছে এই কমিটি। আর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সর্বজনীন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এখন নতুন সরকার ভবিষ্যতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় বিষয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।