মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের সুপারিশ

  • কয়েকটি বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা (বাংলা-ইংরেজি-গণিত, সমাজপাঠ-বিজ্ঞান)

  • শাখা বিভাজন একাদশ শ্রেণিতে করার সুপারিশ

  • অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা বাদ রাখা

  • সেপ্টেম্বর–জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ

  • স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও মাধ্যমিক শিক্ষা টাস্কফোর্স গঠন

  • মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভিন্ন অধিদপ্তর অনতিবিলম্বে কার্যকর

কমিটি বলেছে, পাবলিক পরীক্ষা মূল দক্ষতার বিষয়গুলোতে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানে) সীমিত থাকবে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন দক্ষতাভিত্তিক ও প্রয়োগমুখী হবেপ্রথম আলো ফাইল ছবি

মাধ্যমিকে সব বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিয়ে মূল দক্ষতা সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত কয়েকটি বিষয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সুপারিশ দিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিটি। তারা বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞান বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা সীমিত রাখতে বলেছে। আর অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি ইত্যাদি) বাতিল করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাদ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন শিক্ষাক্রমের আলোকে পড়িয়ে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখায় বিভাজন করারও সুপারিশ করেছে। এ রকম ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন রকমের সুপারিশ করেছে কমিটি।

আরও পড়ুন

আজ মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত এ কমিটি সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। গত অক্টোবরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদকে প্রধান করে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিখন-শেখানো কার্যক্রমের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও মাধ্যমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

কমিটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি কর্মশালা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এ ছাড়া অষ্টম ও নবম শ্রেণি সমাপ্ত করা ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষাও নিয়েছে। প্রতিবেদনে সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করেছে কমিটি।

অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ফাইল ছবি প্রথম আলো

অধ্যাপক মনজুর আহমদ আজ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি কিছু বলেননি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কমিটির প্রতিবেদনে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বর্তমান পাঠ্যবিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি), গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা তৈরিকে ভিত্তিমূলক দক্ষতা হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে কমিটি। কমিটি বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা তৈরির উপায় হবে শ্রেণিকক্ষে এবং শিক্ষার্থীদের নিজের কাজে কম্পিউটার ব্যবহার ও চর্চার সুযোগ করে দেওয়া।

দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবিভাজিত শিক্ষাক্রমের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিটি বলেছে, নবম শ্রেণি থেকে বিদ্যালয় শিক্ষাকে বিভিন্ন ধারায় (বিজ্ঞান-মানবিক-ব্যবসায় শিক্ষা) বিভাজিত করার সিদ্ধান্ত সুবিবেচিত হয়নি। এই বিভাজন একাদশ শ্রেণি থেকে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাদ দেওয়া নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে বিভাগ (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখা) বিভাজন তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার নতুন শিক্ষাক্রমের এ বিষয়সহ অনেক কিছু বাদ দিয়ে আবারও মাধ্যমিকে বিভাজন চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের অনেক বিষয় ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে এখন পর্যন্ত নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন হচ্ছে, যা কমিটি ভিন্নমত দিল।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমকে বছরব্যাপী একটি নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করতে বলেছে কমিটি।

কমিটি বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানত জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মের ছুটি হতে পারে।

মূল্যায়ন যেভাবে

কমিটি বলেছে, পাবলিক পরীক্ষা মূল দক্ষতার বিষয়গুলোতে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানে) সীমিত থাকবে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন দক্ষতাভিত্তিক ও প্রয়োগমুখী হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কম্পিউটার দক্ষতার জন্য পরীক্ষার চেয়ে চর্চা ও অভিজ্ঞতার সুযোগ বেশি প্রয়োজন। আর বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রধানত হবে পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্য বিষয়ভিত্তিক। অন্যদিকে পাবলিক পরীক্ষা হবে মূলত শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য। বিদ্যালয় মূল্যায়ন অনুসারে বার্ষিক রিপোর্ট কার্ড দেওয়া যেতে পারে। এতে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম বিষয়ে অংশগ্রহণের মূল্যায়ন প্রতিফলিত হবে। পাবলিক পরীক্ষার ফল অনুযায়ী আলাদা বিষয়ভিত্তিক গ্রেডিং দেওয়া যাবে।

অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট জেএসসি পরীক্ষা আগেই বাতিল করা হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া বছরে শিক্ষাবিদদের মতামতকে উপেক্ষা করে হঠাৎই বৃত্তি পরীক্ষা চালু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্ধারিতসংখ্যক শিক্ষার্থী এ পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। এটি একদিকে যেমন শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ে। কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতাও বাড়ে।

কমিটি বলেছে, অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকা উচিত এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের প্রয়োজন নেই।

শিক্ষাবর্ষ সেপ্টেম্বর–জুন

কমিটি বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রধানত জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মের ছুটি হতে পারে।

বর্তমানে দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় জানুয়ারিতে এবং শেষ হয় ডিসেম্বর।

সামগ্রিক বিদ্যালয় শিক্ষা উন্নয়নে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয় শিক্ষাকে সর্বজনীন করার সুপারিশ করেছে কমিটি। এই সুপারিশ দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পৃথক শিক্ষা অধিকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিদ্যালয় শিক্ষাকে আদালতে বলবৎযোগ্য অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করেছে কমিটি।

দীর্ঘ মেয়াদে জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন করে তার হাতে মাধ্যমিক শিক্ষাকে ছেড়ে দেওয়া, স্থায়ী শিক্ষা কমিশন ও মাধ্যমিক শিক্ষা টাস্কফোর্স গঠন, মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভিন্ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে কার্যকর করা ইত্যাদি সুপারিশ করেছে কমিটি।

আরও পড়ুন

মাধ্যমিক শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য পাইলট প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করে কমিটি বলেছে, মধ্যমেয়াদি অন্তত ১০টি জেলায় এই পাইলট শুরু করা যেতে পারে, যা পরে দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়ন করা যায়। এ ছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে (সংসদ সদস্য বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি) কমিটিতে না রেখে  প্রকৃত অভিভাবক এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের প্রাধান্য দেওয়াসহ আরও অনেকগুলো সুপারিশ করেছে কমিটি।

কমিটি বলেছে, বর্তমান প্রতিবেদনের সুপারিশ শিক্ষা সংস্কারের শেষ কথা নয়। আসল কথা, শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়ন অবহেলিত হয়ে এসেছে। এই অবহেলার অবসান ঘটাতে হবে। সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার সূচনা হতে হবে।

আরও পড়ুন