প্রশ্ন কঠিন, পদত্যাগে বাধ্য হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তা; আপনি পারবেন?

দক্ষিণ কোরিয়ার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ‘সুনেউং’ পরীক্ষার্থীরাছবি: ফ্রিপিক ডটকম

দক্ষিণ কোরিয়ার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ‘সুনেউং’। এ পরীক্ষার পদ্ধতি খুবই কঠিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। দেশটির অন্যতম কঠিন কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় টানা আট ঘণ্টা। এ পরীক্ষার জন্য মাসের পর মাস প্রস্তুতি নেয় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এ পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্ন দেখলে যেকোনো শিক্ষার্থীর মাথা ঘোরাবে। এ পরীক্ষার প্রশ্ন এতটাই কঠিন ছিল যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এক কর্মকর্তা। এ–সংক্রান্ত খবর প্রকাশের শিরোনামে মার্কিন সিএনএন ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, ‘পরীক্ষার প্রশ্ন এত কঠিন যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তা, আপনি পারবেন তো?’

দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির এ পরীক্ষা অনেক কঠিন। পরিসংখ্যান বলছে, ইংরেজি অংশে মাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন। ২০১৮ সালের পর পাসের হার এবারের মতো এতটা নিচে আর নামেনি।

প্রশ্ন ৩৪: শূন্যস্থান পূরণ করুন

কান্ট আইনের শাসনকে খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি মনে করতেন, এটা শুধু নিরাপত্তা বা শান্তিই দেয় না, স্বাধীনতাও বাঁচিয়ে রাখে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সমাজ ধীরে ধীরে আরও যুক্তিনির্ভর হচ্ছে। সমাজকে টিকিয়ে রাখতে দরকার কঠোর আইন। একমাত্র আইনই পারে মানুষকে মিলেমিশে এক রাখতে। তবে কান্ট কিন্তু মানুষকে খুব ভালো মনে করতেন না। এদিক থেকে তাঁর সঙ্গে টমাস হবসের মিল আছে। হবস ভাবতেন, মানুষের স্বভাবই হলো মারামারি করা। তাই শান্তি রাখতে হলে শক্ত আইন দরকার। মানুষের দয়ার ওপর ভরসা করা বোকামি। একদল ‘শয়তান’কেও যদি আইনের শাসনে রাখা যায়, তারাও শান্তিতে থাকতে পারে। আসল কথা হলো, যুক্তিবাদী মানুষ যে রাজনৈতিক নীতিগুলো নিজের ইচ্ছায় বেছে নিত, আইন হলো তারই রূপ। এখন কথা হলো, আইন যদি মানুষকে এমন কিছু করতে মানা করে, যা তারা এমনিতেও করত না, তবে সেই আইনকে __________চলে না।

ক. স্বাধীনতার লাগাম টানা হচ্ছে বলে মনে করা

খ. বিচারব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা

গ. স্বাধীনতার পথে বাধা হিসেবে গণ্য করা

ঘ. খারাপ স্বভাব দমনে কার্যকর ভাবা

ঙ. আদর্শ আইনের কাঠামোর অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া

এটা যদি কঠিন মনে হয়, তবে পরের প্রশ্নটা একবার দেখুন।

আরও পড়ুন
ওয়েবসাইটের মন্তব্যের ঘরে ‘জং’ নামের একজন লিখেছেন, ‘রাগে গা জ্বলছে। শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে আপনারা আর কত খেলবেন?’
পরীক্ষা কক্ষে যাচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা
ছবি: এএফপি

প্রশ্ন ৩৬: নিচের অংশগুলো সাজিয়ে লিখুন।

আমরা ঘড়ি বলতে সাধারণত দেয়ালঘড়ি বা হাতঘড়ি বুঝি। কিন্তু ঘড়ি আসলে একটা যন্ত্রের ভেতর চলা প্রক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এ প্রক্রিয়ার মূল কথা হলো ‘পুনরাবৃত্তি’ বা বারবার একই কাজ করা।

A. আসলে কোনো কিছু বারবার না ঘটলে সেটা দিয়ে ঘড়ি বানানো অসম্ভব। যেমন দাগ কাটা মোমবাতি। এখানেও কিন্তু মোমের অণুগুলো বারবার পুড়ছে। অর্থাৎ এটাও একটা পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়া, যদিও প্রথমে তা মনে হয় না।

B. কার্বন ডেটিং বা পুরোনো জিনিসের বয়স বের করার পদ্ধতিটাও দীর্ঘমেয়াদি ঘড়ির মতো। মনে হতে পারে সময়টা মসৃণভাবে যাচ্ছে, আসলে কিন্তু তা নয়। এখানেও কার্বন-১৪ পরমাণুর ক্ষয় বারবার ঘটে।

C. আসলে যে প্রক্রিয়ায় বারবার একই ঘটনা ঘটে, তাকেই ঘড়ি বলা যায়। যেমন জলঘড়িতে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়া কিংবা কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের কাঁপুনি।

ক) (A) – (C) – (B)

খ) (B) – (A) – (C)

গ) (B) – (C) – (A)

ঘ) (C) – (A) – (B)

ঙ) (C) – (B) – (A)

সঠিক উত্তর: ৩৪ (গ), ৩৬(ঘ)

২০২৫ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীদের ‘সুনেউং’ পরীক্ষায় এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল। প্রশ্ন দেখে হতচকিয়ে যায় শিক্ষার্থীরা। শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। এরপর জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। দেশটির গণমাধ্যম কেবিএস এ খবর জানিয়ে বলেছে, পরীক্ষা নেওয়া সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছে। তারা মেনে নিয়েছে, ইংরেজি অংশের প্রশ্ন একটু বেশিই কঠিন ছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগের জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।’ ভবিষ্যতে স্কুলের পড়ার সঙ্গে মিল রেখে প্রশ্ন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।

আরও পড়ুন

কিন্তু এরপরও ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা তা মানছেন না। তাঁরা বলছেন, শুধু ক্ষমা চাইলেই তো ক্ষতি পোষাবে না। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে হলে এ পরীক্ষায় ভালো করা চাই-ই চাই। ভালো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির একমাত্র চাবিকাঠি এটাই।

এ পরীক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতার অন্ধকার দিকও আছে। এতে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ে। বড়লোকদের সন্তানেরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবৈধ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যবসাও।

সুনেউংয়ের ওয়েবসাইটে ‘চই’ নামের একজন লিখেছেন, ‘কর্তা তো ভুল স্বীকার করে সরে গেলেন। কিন্তু আমরা যারা ভুক্তভোগী, আমাদের কী হবে? এর কোনো বিহিত হবে না?’ আরেকজন লিখেছেন, ‘আগামী বছর কী করবেন, তা জেনে আমাদের কী লাভ? এবারের ক্ষতি কীভাবে পোষাব।’ ওয়েবসাইটের মন্তব্যের ঘরে ‘জং’ নামের একজন লিখেছেন, ‘রাগে গা জ্বলছে। শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে আপনারা আর কত খেলবেন?’

আরও পড়ুন

‘ঘাতক প্রশ্ন’ বা কিলার কোয়েশ্চেনস

সুনেউং পরীক্ষাটি এর কঠিন প্রশ্ন আর কিশোর-কিশোরীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপের জন্য পরিচিত। বাচ্চারা কথা ফোটার আগেই যেন এই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায় শিশুকালেই।

স্কুলে ওঠার পর তো কথাই নেই। ক্লাস শেষ করেই ছোটো কোচিং সেন্টারে, যাকে বলা হয় ‘হাগওয়ন’। সেখানে পড়াশোনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। পরিবারের লক্ষ্য একটাই—সন্তান যেন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায় আর ভালো চাকরি পায়।

এ পরীক্ষার দিনে পুরো দেশ ব্যতিব্যস্ত থাকে। কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে বিমান চলাচলও, যাতে শব্দের কারণে পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ না ভাঙে। শেয়ারবাজারের লেনদেন শুরু হয় এক ঘণ্টা দেরিতে। আর পরীক্ষার্থীরা যাতে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, তার জন্য রাস্তায় রাস্তায় থাকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন।

এ পরীক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতার অন্ধকার দিকও আছে। এতে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ে। বড়লোকদের সন্তানেরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবৈধ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যবসাও। এ বছর এ জন্য ১২৬ জনকে আটক করেছে কোরিয়ান পুলিশ।

আরও পড়ুন

শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের কারণে ২০২০ সালের তথ্যমতে, ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।

এমনকি সন্তান না নেওয়ার পেছনেও এই পরীক্ষার ভূমিকা আছে। পড়াশোনার বিশাল খরচ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর আবাসনসংকটের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক দম্পতি এখন আর সন্তানও নিতে চাইছেন না।

সরকার চেষ্টা করছে কোচিং বাণিজ্য কমাতে। ২০২৩ সালে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সিলেবাসের বাইরের কঠিন সব ‘কিলার কোয়েশ্চেন’ বাদ দেওয়া হবে। কারণ, এতে কোচিং করা ধনী শিক্ষার্থীরা সুবিধা পায়।

কিন্তু এবারের প্রশ্ন অনেক কঠিন হয়েছে।