বাংলা ১ম পত্র: বর্ণনামূলক প্রশ্ন
সহপাঠ: ১৯৭১
প্রশ্ন
ক. সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘১৯৭১’ উপন্যাসে প্রতিফলিত নীলগঞ্জের জনজীবনের পরিচয় দাও।
উত্তর–ক
পাকিস্তানি মিলিটারিদের পশুসুলভ আচরণ সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ। ‘১৯৭১’ উপন্যাসে নীলগঞ্জ নামক এক গন্ডগ্রামে মিলিটারি প্রবেশের পর নানা রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে থাকে। এর আগে এই গ্রামের লোকজন মিলিটারি সম্পর্কে যা জানত, সবই অন্য মানুষের কাছ থেকে শোনা গল্পের মতো। পাকিস্তানি মিলিটারিরা মুসলমান হওয়ায় তাদের সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক কথা গ্রামবাসী বিশ্বাস করত, যেমন তারা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করে না, কালিমা জিজ্ঞাসা করে, মুসলমান মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার মতো সম্ভাবনাই নেই ইত্যাদি। জয়নাল মিয়ার সঙ্গে কথা বলে তাই সফদরউল্লাহ আশ্বস্ত হয় যে গ্রামে মিলিটারি এলেও তার পরিবারের নারী সদস্যদের অন্য কোথাও স্থানান্তর করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার বিশ্বাস ভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। মিলিটারি সুবাদারের হাতে তার স্ত্রী ও শ্যালিকা নির্যাতনের শিকার হলে তা তার মনে ব্যাপক আঘাত হানে। ফলে তিনি মিলিটারিদের প্রতি চরম ঘৃণা বোধ করে এবং দা হাতে নিয়ে নির্যাতনকারী মিলিটারিকে হত্যা করতে
বেরিয়ে যায়।
উত্তর–খ
বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হিসেবে যিনি নিজের অবস্থানকে সুউচ্চে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁর নাম হুমায়ূন আহমেদ। এই গুণী কথাসাহিত্যিক ছিলেন কালির সামান্য আঁচড়েই মানুষ ও জনজীবনের আলেখ্য তুলে ধরতে সিদ্ধহস্ত। ‘১৯৭১’ শীর্ষক উপন্যাসও এর ব্যতিক্রম নয়। এ উপন্যাসে তিনি সুনিপুণ হাতে নীলগঞ্জ গ্রামের জনজীবনের পরিচয় তুলে ধরেছেন। লেখকের বর্ণনা মতে, জঙ্গলা মাঠের পেছনে নীলগঞ্জ গ্রাম। দরিদ্র, শ্রীহীন ৩০–৪০টি ঘরের একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ।
বিস্তীর্ণ জলাভূমি গ্রামটিকে কাস্তের মতো দুই দিকে ঘিরে আছে। এখানকার লোকজন প্রধানত কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। এখানকার জমি যথেষ্ট পরিমাণে উর্বর নয় কিংবা তারা ভালো চাষি নয়। তবে শীতকালে তারা প্রচুর রবিশস্য ফলায়। বর্ষার আগে চাষ করে তরমুজ ও বাঙ্গি। গ্রামের অধিকাংশ ঘরেই খড়ের ছাউনি। সম্প্রতি কয়েকটি টিনের ঘর হয়েছে। অতীতে চন্দ্রকান্ত সেন প্রচুর ধনসম্পদ করলেও তার বর্তমান উত্তরসূরি নীলু সেনের অবস্থা যেন ব্যাঙের আধুলির অধিকারী। বর্তমানে গ্রামে সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী ব্যক্তি হলো জয়নাল মিয়া। টাকাপয়সা বেশ থাকলেও লোকটি মেরুদণ্ডহীন। গ্রামে বিদেশি বা বাইরের লোক আছে দুজন।
একজন নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব এবং দ্বিতীয়জন হলো নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আজিজ মাস্টার। ইমাম সাহেব মসজিদেই থাকে এবং আজিজ মাস্টার থাকে জয়নাল মিয়ার বাড়িতে। দুজনের খাবারদাবারের ব্যবস্থা হয় প্রধানত জয়নাল মিয়ার বাড়ি থেকে। ইমাম সাহেবের খাবার অবশ্য গ্রামের আরও কয়েক বাড়ি থেকেও আসে। নীলগঞ্জের যে দিকটায় জলাভূমি, একদল কৈবর্ত থাকে সেদিকে। মাছ ধরার সিজনে জলমহালে মাছ ধরতে যায়। নীলগঞ্জের কেউ তাদের ঘাঁটায় না। এমনকি তারা খুনখারাবি করলেও নীলগঞ্জের মাতব্বররা কিছুই না জানার ভান করে।
কৈবর্তপাড়ার চিত্রা বুড়ি সন্তান হারিয়ে বিচারের আশায় এখানে–সেখানে ঘুরলেও কোনো প্রতিকার পায় না। গ্রামের একমাত্র ভিক্ষুক সে। তাদের বাইরে একজন পাগলও আছে এ গ্রামে—মতি মিয়ার শ্যালক নিজাম। ছোটাছুটি করা এবং বনের ভেতরে বসে থাকা ছাড়া সে কোনো উপদ্রব করে না। সবশেষে বলা যায় যে নীলগঞ্জের জনজীবন বাংলার আর দশটা সাধারণ গ্রামের জনজীবনের মতোই। সহজ, স্বাভাবিক ও কৃত্রিমতাবর্জিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত এ গ্রামের লোকজন।
মোস্তাফিজুর রহমান, শিক্ষক
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা