আমরা আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি না তো?
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের পথচলা। ইতিমধ্যে সরকারের বেশ কিছু কর্মকাণ্ড জনগণের নিকট প্রশংসিত হয়েছে এবং দেশের জনগণও ভালো কিছুর স্বপ্ন দেখতে চলেছে, যা অত্যন্ত আশাজাগানিয়া।
কোনো জাতির শিক্ষা ও চিকিৎসা খাত ধ্বংস হলে সেই জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে, যার ফলে মেধাহীন প্রজন্ম ও অসুস্থ জনশক্তি তৈরি হয়। বিগত সরকারের আমলে দেশে এ রকমই একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাব হিসেবে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখার ২৪ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হবে। একই মানের শিক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। যোগ্য, দক্ষ ও মানবিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ক্রমান্বয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনস্বার্থ–সংশ্লিষ্ট খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতকে ঢেলে সাজানো হবে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্রীড়া উন্নয়ন ও জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনৈতিক আকাশ–সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা হবে।’
এককথায়, আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্তরে চাহিদাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় জ্ঞান-গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় দরকার প্রয়োজনভিত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা। জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা নাগরিকদের তথ্যনির্ভর, বিশ্লেষণধর্মী ও যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা ও মানবিক গুণাবলি গড়ে তোলে। আবার প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বর্তমান সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামীর বাংলাদেশ হবে পরিবর্তিত বাংলাদেশ।
বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন সফল ও যোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হওয়ায় দেশের সর্বস্তরের শিক্ষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো যত দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যাবে, তত দ্রুতই জনগণ বর্তমান সরকারের সফলতা উপলব্ধি করতে পারবে।
ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছেন।
বিভিন্ন সময়ে এ দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুকৌশলে দলীয়করণ করা হয়েছে। গভর্নিং বডি কিংবা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদে সরকারদলীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অধিষ্ঠিত হয়ে একধরনের দখলদারত্ব কায়েম করেছেন। ফলে শিক্ষা খাতে ঘটেছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির মহোৎসব।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করতে পারেনি, তবে শিক্ষা খাত সংস্কারে কিছু কিছু যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে একটি ছিল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে স্নাতক এবং কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন দেশের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদেরা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানপ্রধান এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়াও চালু হয়েছিল, যা শিক্ষাক্ষেত্রে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আমাদের শিক্ষকসমাজের যথেষ্ট আস্থা থাকার পরও লক্ষ করছি যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় যেন সেই রাজনৈতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার আলোচনা চলছে। আপাতদৃষ্টিতে এ আলোচনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করার উদ্যোগ বলে মনে হচ্ছে।
হঠাৎ কেন যেন মনে হলো, আমরা আবার সেই পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি না তো?
*লেখক: এম আরিফুজ্জামান, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক