শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, গণতন্ত্র রক্ষা ও জনকল্যাণে অবদান রাখার আহ্বান শিক্ষা উপদেষ্টার

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সমাবর্তনে বক্তব্য রাখছেন শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার
ছবি: প্রথম আলো

শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র রক্ষা ও জনকল্যাণে অবদান রাখার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার)। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ডিগ্রি যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি শিক্ষা দায়িত্ব এনে দেয়। সে জন্য শিক্ষার্থীদের সততা ও সচেতনতার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার ফলে পাওয়া সুযোগ প্রয়োগ করে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানান তিনি।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) ২৬তম সমাবর্তনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন সি আর আবরার। আজ বুধবার বেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ৩ হাজার ৩২২ শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ৬৪৬ জন স্নাতক ও ৬৭৬ জন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের ‘নেতৃত্ব কেবল করপোরেট অফিস বা বোর্ডরুমে সীমাবদ্ধ নয়’ উল্লেখ করে সি আর আবরার বলেন, নৈতিক সংকটের সময়েও নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়।

সি আর আবরার বলেন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, এর বাস্তব মানবিক মূল্য রয়েছে। তার মতে, গণতন্ত্র নিজে নিজে টিকে থাকে না। নাগরিকদের সচেতনতা, সম্পৃক্ততা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমেই গণতন্ত্র রক্ষা পায়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান দেওয়ার জায়গা নয় উল্লেখ করে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, এটি বিবেক, প্রশ্ন করার ক্ষমতা ও ন্যায়-অন্যায়ের বোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্র।

সি আর আবরারের বক্তব্যে উঠে আসে দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদানও। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান দেশের একটি বড় অংশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এনএসইউ প্রমাণ করেছে যে বেসরকারি উচ্চশিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, জনস্বার্থেও কাজ করতে পারে। তবে একই সঙ্গে শিক্ষার ব্যয় ও সুযোগের বৈষম্য নিয়েও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার বাড়ানো জরুরি।

স্নাতকদের উদ্দেশে বক্তারা বলেন, তাঁরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করছেন, তখন তাঁদের হাতে রয়েছে সুযোগ, দৃশ্যমানতা ও সুবিধা। এ সুযোগ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই প্রকৃত নেতৃত্বের মানদণ্ড।

ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, সুযোগ বাড়ানো এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার মাধ্যমেই শিক্ষার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ওই নির্দলীয় আন্দোলন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে সাহসী ভূমিকা রাখেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হন।

সমাবর্তনে শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কনভোকেশন মার্শাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মামুন মোল্লা। অনুষ্ঠানে ডিগ্রিপ্রার্থীদের উপস্থাপন করেন এনএসইউর স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক মো. রিজওয়ানুল ইসলাম, স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন এবং স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক দীপক কুমার মিত্র।

সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে ইউজিসির চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে তাঁদের বাবা-মা, তোমাদের শিক্ষকেরা এবং পুরো দেশ।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যেই ভালো ও মন্দের পার্থক্য করার সক্ষমতা থাকে। কিন্তু তোমরা আলোকিত, শিক্ষিত মানুষ—এই পার্থক্য আরও গভীরভাবে, আরও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারো।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা স্মরণ করে এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘যখন বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী শিক্ষার্থীরা হলের ফটক ভেঙে বেরিয়ে এসে দুর্দান্ত সব স্লোগান দিয়েছিল। শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে এসেছিল। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। এ জন্য আমরা তোমাদের সবাইকে অভিনন্দন জানাই তোমাদের ত্যাগ ও অবদানের জন্য।’

অনুষ্ঠানে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘শিক্ষা ও সমাজের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দূর করতে না পারলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য মোকাবিলায় ব্যর্থ হতে পারে। সে জন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লব; ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার কোলাবরেশন ও ট্রান্সন্যাশনাল উচ্চশিক্ষার মতো উদীয়মান বিষয়গুলো আরও জটিল সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।’ সে জন্য শিক্ষার্থীদের স্থানীয় প্রেক্ষাপট উপযোগী পাঠক্রম, গবেষণা, প্রকাশনা ও সহযোগিতায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এনএসইউর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ‘ভবিষ্যৎ এখন আপনাদের হাতে। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, সততা ও সহমর্মিতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে এবং কখনোই নিজের শিকড় ভুলে না যেতে। আশা বুকে ধারণ করুন, মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুন। সদয় হোন, সাহসী হোন এবং মাটিতে পা রেখে চলুন। আমি আপনাদের দীর্ঘ, অর্থবহ ও পরিপূর্ণ জীবনের কামনা করি।’

সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘আজ আপনারা কেবল একটি ডিগ্রি অর্জন করেননি। আজ আমরা আপনাদের হাতে তুলে দিচ্ছি একটি দায়িত্ব এবং আগামী দিনে আমাদের দেশকে গড়ে তোলার সুযোগ। দেশের উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও বিস্তারের দায়িত্ব আপনাদের হাতেই। আজ এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে আপনারা দেশের দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। আপনারাই আগামী দিনে এই জাতির রূপান্তরের নেতৃত্ব দেবেন।’

সমাবর্তনে শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের উন্নতিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীতা উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘আপনাদের শিক্ষা যেন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হয়। আমরা চাই আপনারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করবেন।’

এনএসইউর ২৬তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) সদস্য এম এ কাশেম, বেনজীর আহমেদ, মো. শাহজাহান, ইয়াছমিন কামাল, রেহানা রহমান, দুলুমা আহমেদ, সহ–উপাচার্য নেছার উদ্দিন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ আবদুর রব খান।

আরও পড়ুন

সমাবর্তনে স্নাতক পর্যায়ে চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল পেয়েছেন মাহিরা ইসলাম আসফি ও স্নাতকোত্তরে মেহরুব মোবিন ভূঁইয়া। এ ছাড়া স্নাতক পর্যায়ে ভাইস চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল পেয়েছেন জেমিমা শারমিন লামিয়া, হুমায়রা আনজুম অর্চি, রাশিক ইরাম চৌধুরী ও তাসনিম জাহান।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উপাচার্যের স্বর্ণপদক পেয়েছেন তাসবির রায়হান, নুসরাত জাহান লিপী, তাবাসসুম হায়দারি ও তাসমিম আবু সালেহ। স্বর্ণপদক পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠানে অনুভূতি তুলে ধরেন মাহিরা ইসলাম আসফি।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রথম দিনের দ্বিতীয় অংশে সনদ গ্রহণ করেন ডিগ্রিপ্রার্থী শিক্ষার্থীরা। এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় দুই দিনব্যাপী সমাবর্তনের প্রথম দিনের কার্যক্রম।