‘হয় কম খেতে হবে, নয়তো বাচ্চাদের কম লিখতে বলতে হবে’

ফাইল ছবি

রাজধানীর মিরপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে স্কুল ছুটির পর দুই মেয়েকে নিতে স্কুলের গেটের সামনে এসেছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, দুই মাস আগেও দুই মেয়ের লেখাপড়ার জন্য এক রিম সাদা কাগজ কিনেছিলেন ৩২০ টাকায়। গত সপ্তাহে কাগজ শেষ হলে আবার কাগজ কিনতে লাইব্রেরিতে গিয়ে শোনেন, এই কাগজ এখন ৫০০ টাকা। পরে তা যাচাই করতে কয়েকটি দোকানে গেলে একই দাম চান অন্য বিক্রেতারা।

আজিজুর রহমান বলেন, ‘কই যাব বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে, তাই বলে কাগজের দামটাও বাড়বে? এটা মেনে নেওয়া যায় না। পড়াশোনার যে খরচ বাড়বে সে অনুপাতে বেতন তো বাড়বে না। এখন কীভাবে বাড়তি খরচ চালাব, সেটিই চিন্তার বিষয়।’

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও নীলক্ষেত এলাকা ঘুরে বিক্রেতা ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দেড় মাসে শুধু কাগজ নয়, প্রতিটি শিক্ষা উপকরণের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষেরা তাঁদের আয়ের সঙ্গে এই বর্ধিত মূল্যের সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুর বাবর রোডের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগে তিনি বইয়ের দোকানে গিয়ে সবকিছুর দাম শুনে চমকে গেছেন। ক্যাসিও সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর কিনেছিলেন বড় ছেলের জন্য। এবার ছোট ছেলের জন্যও সেটি কিনতে গিয়ে শোনেন, ১ হাজার ২০০ টাকার ক্যালকুলেটর ১ হাজার ৪০০ টাকা। বাঁধাই করা ৪০ টাকার কাগজের খাতা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা; জ্যামিতি বক্স যেটির দাম ছিল ৬০ টাকা, সেটি এখন ১৫০ টাকা; যে কলমের ডজন ছিল ৪০ টাকা, সেটি এখন ৫০ টাকা; পেনসিল ও রংপেনসিলের দাম গড়ে ৫ টাকা বেড়েছে। আমিনুল বলেন, ‘আমাদের তো বাঁধা বেতন। এর মধ্যে সংসারের খরচ আবার বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ। সেই খরচ বেড়ে গেলে সংসারে টান পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এখন হয় কম খেতে হবে, নয়তো বাচ্চাদের কম লিখতে বলতে হবে। যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে।’

তাজমহল রোডের ইসলামিয়া লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী সামসুর রউফ বলেন, ‘সব ধরনের পড়াশোনার উপকরণের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাগজের দাম। আগে এক রিম কাগজের দাম ছিল ৩২০ টাকা, সেটি এখন ৫০০ টাকা। এক দিস্তা আগে বিক্রি করেছি ১৮-২০ টাকা। এখন ২৮ থেকে ৩০ টাকা।’ তিনি আরও বলেন, দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যেসব মানুষ আগে দুই দিস্তা কাগজ কিনতেন, তাঁরা এখন এক দিস্তায় কাজ চালাচ্ছেন। কম দামের কাগজ খুঁজছেন। আর তাতে তাঁদের ব্যবসাও খারাপ যাচ্ছে।

কথা হলো পেনসিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফেবার ক্যাসটেলের বিক্রয় নির্বাহী জাহিদুল ইসলামের সঙ্গেও। তিনি গত এক মাস আগেও যে দামে লেখার পেনসিল ও রংপেনসিল বিক্রয় করেছেন, সেগুলোর প্রতিটির ১০ শতাংশ দাম বাড়াতে হয়েছে। তাঁর মতে, সবকিছুর দামের সঙ্গে এসব পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।

কাগজের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ফটোকপির দোকানেও। ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বলেন, তিনি কয়েক দিন আগে ৫০ পাতা ফটোকপি করেছেন ১০০ টাকায়। কিছুদিন আগেও তিনি একই ফটোকপি ৫০ টাকায় করিয়েছেন।

নাজমুল হোসেন আরও বলেন, ‘আমার নোট দুই বন্ধুকে দেব। এক বন্ধু কয়েক দিন আগে নিয়ে গেছে। সেই একই নোট ফটোকপি করতে এখন ৪০ থেকে ৫০ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। এভাবে চললে গ্রুপ করে ফটোকপি করে পড়তে হবে। তা না হলে আমাদের পড়াশোনার খরচ মেটানো কষ্টকর হয়ে যাবে।’

নীলক্ষেতের অপূর্ব ফটোস্ট্যাট অ্যান্ড বাইন্ডিংয়ের বিক্রয়কর্মী সাদ্দাম হোসেন বলেন, আগের দাম এখন আর নেই। খুচরা ফটোকপি পাতাপ্রতি ২ টাকা। আর যদি ৫ হাজার পৃষ্ঠার ওপরে হয়, তাহলে ১ টাকা ৬০ পয়সা।

সাদ্দামের ভাষ্য, কাগজের দাম বাড়ার কারণে তাঁরাও বাধ্য হয়ে দাম বাড়িয়েছেন। তবে বিদ্যুৎ না থাকলে কেউ যদি বিশেষভাবে ফটোকপি করান, তাহলে প্রতি পৃষ্ঠার জন্য তিন টাকা নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, করোনার মধ্যে এমনিতে শিক্ষার অবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যের বা নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি যেভাবে আলোচনায় আসে, শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ার বিষয় সেভাবে আলোচনায় আসে না। তাঁর আশঙ্কা, শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়লে চলমান শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হতে পারে। মানুষের খরচের বোঝা আরও ভারী হয়ে যাবে। নিম্নবিত্ত মানুষেরা পড়াশোনা চালাতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এমনকি পড়াশোনা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারেন অনেকে।

সেলিম রায়হান মনে করেন, পড়াশোনার উপকরণের খরচ বাড়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলার আগেই এটি যাতে না বাড়ে, সে দিকে সরকারের মনোযোগ দিতে হবে। এ ছাড়া এসব শিক্ষা সহায়ক পণ্যের ভ্যাট বা ট্যাক্স কমিয়েও যদি দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে।