মাউশি ভেঙে দুটি অধিদপ্তর: কাদের স্বার্থে এই পরিবর্তন
বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসন যেন এক অনন্ত পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে, কখনো একীভূত, কখনো বিভাজিত। এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ভেঙে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং ‘কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর’ নামে দুটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের। উদ্দেশ্য, ‘শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা’। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কার স্বার্থে এই বিভাজন? শিক্ষা প্রশাসনের প্রকৃত অভিভাবকই–বা কে?
বাংলার শিক্ষা প্রশাসনের শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় ঔপনিবেশিক যুগে। ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্যার চার্লস উডের বিখ্যাত উডস ডেসপাচ অনুযায়ী ভারতে শিক্ষা পরিচালনার জন্য প্রদেশভিত্তিক ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন (ডিপিআই) প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৮৫৫ সালে বাংলায় প্রথম ডিপিআই (DPI) অফিস স্থাপিত হয়, যা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরই তত্ত্বাবধান করত। পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালে কারিগরি শিক্ষা পৃথক হয়ে ডিরেক্টরেট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন (ডিটিই) গঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা আলাদা হয়, আর ১৯৮১ সালে ডিপিআইয়ের নাম পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরে রূপান্তরিত হয়। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার তিনটি প্রধান অধিদপ্তর—প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা সবই মূলত একসময়ের ঐক্যবদ্ধ ডিপিআইয়ের একেকটি খণ্ডিত রূপ। এবার যদি মাউশিকেও ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে এটি হবে ইতিহাসের আরেকটি বিভাজন, যার যৌক্তিকতা আজও অস্পষ্ট। শিক্ষা প্রশাসনে দায়িত্ব বণ্টন নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এর একটি স্পষ্ট ভিত্তি হচ্ছে BCS (General Education) Composition and Cadre Rules, 1980। এই বিধিমালা অনুযায়ী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সব শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্যাডার পদগুলো শিক্ষা ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত।
এই কম্পোজিশন রুলসের ধারা ৬(১)(খ)-এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, স্কুল ও কলেজ শাখা ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত আলাদা থাকবে, এরপর একীভূত হয়ে একটি অভিন্ন ক্যাডারে পরিণত হবে। অর্থাৎ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত অধিদপ্তরের পদগুলো শিক্ষা ক্যাডারের। কেননা কলেজ পর্যায়ে সরাসরি পাঠদানের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দপ্তরগুলোতে কাজ করার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা প্রশাসনকে কার্যকর ও যুগোপযোগী করার মানসে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো শিক্ষা ক্যাডারের শিডিউলভুক্ত করা হয়।
কলেজ অধিদপ্তর নামের মধ্যেই একপ্রকার অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়, কেননা নামকরণ সাধারণত শিক্ষার বিভিন্ন স্তরভিত্তিক হওয়াটাই সমীচীন—যেমন প্রাথমিক, মাধ্যমিক কখনো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হয় না। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিস্ময়করভাবে নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর’। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) ভেঙে দুটি অধিদপ্তর করার ক্ষেত্রে মাউশির ‘মা’ অংশ নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর করা হলে বাকি অংশ ‘উশি’ নিয়ে উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সুযোগ-সুবিধা ও গবেষণা পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর করা হতো সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
সেটা না করে উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামকরণের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সংকোচনমুখী নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মাউশি ভেঙে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামকরণের সিদ্ধান্তকে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লঙ্ঘন হিসেবেও দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অধ্যায় ২৭-এ মাউশি ভেঙে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) কর্তৃক আয়োজিত ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস অন এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স শীর্ষক কর্মশালার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত বিয়াম ফাউন্ডেশন গবেষণা ও পরামর্শ সেবাকেন্দ্র কর্তৃক দাখিল করা প্রতিবেদনে শিক্ষা প্রশাসনের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মাউশি ভেঙে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে দাখিল করা সময়াবদ্ধ সংস্কার পরিকল্পনায় মাউশি পুনর্গঠন করে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর নামে দুটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামো পুনর্গঠনসংক্রান্ত উপর্যুক্ত তিনটি সুপারিশের দুটিতেই মাউশির পরিবর্তিত নাম উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর এবং অন্যটিতে উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর করার সুপারিশ করা হয়েছিল। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় পূর্বোক্ত তিনটি সুপারিশকে উপেক্ষা করে শুধু জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে আমলে নিয়ে মাউশি ভেঙে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর করার জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠায় এবং এ প্রস্তাব অনুমোদনও লাভ করে। এখন দুটি অধিদপ্তরের অর্গানোগ্রাম তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামকরণের ফলে শিক্ষা ক্যাডারের বিস্তৃতি নয়, বরং আরও সংকুচিত হবে এবং মেধাবীদের আকর্ষণ হারাবে। ভবিষ্যতে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন। কারণ, শ্রেণিশিক্ষকতার সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সমস্যাসমূহ অনুধাবন করে সেগুলো সমাধানের জন্য শিক্ষার বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা কাজ করেন। উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামকরণের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারকে কলেজের ব্রাকেটে বন্দী করা হলে মেধাবীরা শিক্ষাকে বিসিএস পরীক্ষার চয়েস লিস্টে রাখতে আর আগ্রহী হবেন না।
উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামকরণের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারকে কলেজের ব্রাকেটে বন্দী করা হলে মেধাবীরা শিক্ষাকে বিসিএস পরীক্ষার চয়েস লিস্টে রাখতে আর আগ্রহী হবেন না।
মাউশিকে দুই ভাগ করার প্রক্রিয়াকে অনেকেই শিক্ষা প্রশাসন থেকে শিক্ষাপেশাজীবীদের বিতাড়িত করে অশিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র হিসেবেও দেখছেন। কারণ, ইতিপূর্বে মাউশির পূর্বতন প্রতিষ্ঠান ডিপিআই ভেঙে কারিগরি, প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর করে সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিতাড়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশে জনপ্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের যেমন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা যেমন মাঠপর্যায়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হন, তেমনি শিক্ষা প্রশাসন অর্থাৎ শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরগুলোতে সরাসরি পাঠদানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পদায়ন দেওয়া উচিত। তবেই কেবল কার্যকর এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব।
সর্বশেষ মাউশি ভেঙে দুই ভাগ করার এ প্রক্রিয়াও একদিকে শিক্ষা প্রশাসনে আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে শিক্ষা প্রশাসন থেকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে শুধু কলেজকেন্দ্রিক শ্রেণিশিক্ষকতায় তাঁদের সীমাবদ্ধ করার পরিকল্পনা বলে মনে করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবর্তে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর নামকরণ সে চেষ্টারই অংশ।
কম্পোজিশন ও ক্যাডার রুলস অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সব পদই বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের শিডিউলভুক্ত। এ পদগুলোতে বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ অনুযায়ী শিক্ষা সার্ভিস থেকেই দীর্ঘদিন নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পদগুলোতে শিক্ষা সার্ভিস–বহির্ভূত জনবল পদায়ন করার কারণে ২০০৪ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষাপেশাজীবীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না। মামলা করেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে পদগুলো পুনরুদ্ধার করা যায়নি। এভাবে দীর্ঘদিন এগুলো দখলে রেখে শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালার মাধ্যমে পদগুলোতে শিক্ষা সার্ভিস–বহির্ভূত জনবল পদায়নের ব্যবস্থা করে কাগজে-কলমে শিক্ষা ক্যাডারের জনবলকে বিতাড়িত করা হয়। অথচ পদগুলো এখনো বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিডিউলভুক্ত পদ।
একটি মন্ত্রণালয় ভেঙে নতুন এক বা একাধিক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি হলে অথবা নতুন নামকরণ কিংবা কার্যপরিধির রদবদল হলে কি প্রশাসন ক্যাডারকে সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়? হয় না। তাহলে শিক্ষায় নতুন কোনো অধিদপ্তর হলে কেন বারবার শিক্ষা প্রশাসন থেকে শিক্ষা ক্যাডারকে সরিয়ে দেওয়া হয়?
আলাদা মন্ত্রণালয় হওয়ায় প্রাথমিকে ১টি সচিব, ৪টি অতিরিক্ত সচিব, ৫টি যুগ্ম সচিব, ১৬টি উপসচিবের পদ সৃজন হয়েছে। অধিদপ্তরের প্রধানের পদটি তৃতীয় গ্রেড পরিচালক থেকে গ্রেড–১ ডিজিতে উন্নীত হয়েছে এবং শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতাবিহীন ব্যক্তিদের কবজায় গেছে। কিন্তু শিক্ষার মান কি বেড়েছে?
অবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষার মান না বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। সরকারি প্রাথমিকে বিনা বেতনে পড়ানো হচ্ছে। বিনা মূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি দেওয়ার পরও অভিভাবকেরা কেন পয়সা খরচ করে সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন?
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক শুমারি (এপিএসসি), ২০২৫ মতে দেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি, এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। ৪৯ হাজার ৬৩টি বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাই দুই কোটি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর মধ্যে এক কোটিই পড়ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বিশাল সংখ্যায় প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করার পরও গড়ে ওঠা অর্ধলক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করছে। বিনা মূল্যের পাঠশালা উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের টিউশন ফি দিয়েই অভিভাবকেরা সেগুলোতে তাঁদের বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন।
আলাদা অধিদপ্তর হওয়ার পরও আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার উভয় ধারাতেই রয়েছে বিস্তর সমস্যা। ইবতেদায়ি, ফোরকানিয়া, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল—এসব আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষাক্রমে আধুনিকীকরণের অভাব সুস্পষ্ট। স্বায়ত্তশাসিত এসব প্রতিষ্ঠানে (প্রায় ৩০ হাজার) সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ মাদ্রাসায় প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুবিধা নেই। অধিদপ্তর আলাদা হলেও মাদ্রসা শিক্ষার গুগগত মানে পরিবর্তন আসেনি, স্বভাবতই তাই প্রশ্ন জাগে, কার স্বার্থে এই বিভাজন?
মাউশি পুনর্গঠন বা বিভাজন হলে প্রশাসনিক কাঠামো যেভাবেই সাজানো হোক না কেন, শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্ব তাঁদেরই হাতেই তুলে দেওয়া উচিত হবে, যাঁরা শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বাস্তবতা জানেন, অর্থাৎ শিক্ষা ক্যাডারের হাতে। ক্যাডারটির শিডিউলভুক্ত প্রশাসনিক পদগুলোর অধিকাংশ যেমন উপানুষ্ঠানিক, কারিগরি, মাদ্রাসা, প্রাইমারি, ব্যানবেইজ, এনটিআরসিএর পদগুলো দখল করা হয়েছে।
বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সংকট অদক্ষতা নয়, অব্যবস্থাপনা। শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা সমাধান অফিস ভাগে নয়, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে। অথচ একের পর এক ‘গঠন-খণ্ডণ-পুনর্গঠন’ প্রকল্পে শিক্ষা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দক্ষতাকে ক্ষয়প্রাপ্ত করা হচ্ছে।
প্রশ্নটা তাই এখনো একই, শিক্ষা প্রশাসনের বৈধ অভিভাবক কে? BCS (General Education) Composition and Cadre Rules, 1980-এ তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং বুদ্ধি আড়ষ্ট হলে মুক্তি ও মানসম্পন্ন শিক্ষা অসম্ভব।
*লেখক: সচিব তালুকদার, সৌরভ জাকারিয়া, মনিরুজ্জামান ও অরিয়ন তালুকদার, সহপ্রতিষ্ঠাতা, দ্য ইডভাইজরস, (থিঙ্কট্যাংক অব সিভিল এডুকেশন)।