প্রথম আলো: প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন নিয়ে প্রায় এক যুগ ধরে আলোচনা হলেও এখনো আইনটি চূড়ান্ত হয়নি, এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

এস এম হাফিজুর রহমান: এটা ঠিক যে শিক্ষা আইন নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা হলো। যা–ই হোক, আমার মনে হয়, এখন আইনটি দ্রুত করে ফেলা ভালো। কারণ, এর মধ্যে কিছু বিষয় আছে, যা নিয়ে বিতর্ক আছে। এর অন্যতম দুটি বিষয় হলো শিক্ষকদের কোচিং-প্রাইভেট এবং নোট-গাইড বই। এসব নিয়ে বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত।

গণসাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো–চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে শিক্ষকদের কোচিং-প্রাইভেট বন্ধ রাখার দাবি করেছেন। আপনার অবস্থান জানতে চাই।

এস এম হাফিজুর রহমান: এসএসসি, এইচএসসি, জেএসসি ইত্যাদি পাবলিক পরীক্ষার সময় কোচিং বন্ধ রাখা হচ্ছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, এসব কোচিং সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। কখনো কখনো প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথাও শোনা যায়। অভিভাবকদের কেউ কেউ বলেন, তিনি তাঁর সন্তানকে প্রাইভেটে পড়াতে চান। বর্তমানে যা দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের অনেকেই ঠিকমতো ক্লাসে আসে না, কিন্তু কোচিংয়ে ঠিকই যাচ্ছে। ক্লাসের সময়েও কোচিং পড়ছে। কেন এ অবস্থা হলো, সেটি আগে বের করতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোচিং-প্রাইভেট বা গাইড বই সমর্থন করি না। কিন্তু এর একটি চাহিদা আছে। অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করেন, স্কুলের শিক্ষকের চেয়ে কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ভালো। গাইড বই কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই ব্যবহার করছে। কিন্তু এই চাহিদা কেন আসছে, এ জায়গা সমাধান করতে না পারলে সব সময়ই এ নিয়ে বিতর্ক থাকবে। একটা পক্ষ চাইবে আরেক পক্ষ বিরোধিতা করতে।

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদানের জন্য কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা বা কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হবে না। শিক্ষকদের কোচিং-প্রাইভেটের সুযোগ রাখা হয়েছে। অবশ্য কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে কোচিং-প্রাইভেটে পড়াতে পারবেন না। কিন্তু এটি তদারক করা সম্ভব বলে মনে করেন?

এস এম হাফিজুর রহমান: প্রথমত বলব, এগুলো তদারক করা খুবই কঠিন হবে। কারণ, এর ব্যাপ্তি অনেক বড়। আবার সরকার কেন এসব একেবারে বন্ধ করতে পারছে না, সেটিরও একটি আন্দাজ করা যায়। হয়তো বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপ আছে। কিন্তু এগুলো বন্ধ হলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ভালো হবে। আমি মনে করি, শিক্ষায় খরচ বৃদ্ধির বড় কারণ হলো কোচিং-প্রাইভেট ও গাইড বই। এর ব্যয় অনেকে বহন করতে পারে না।

প্রথম আলো: শিক্ষা আইনের খসড়ায় নোট-গাইড বই নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। আবার সহায়ক বই প্রকাশ বা বাজারজাতের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখছেন?

এস এম হাফিজুর রহমান: শোনা যাচ্ছে, ইতিমধ্যে অনেকেই নোট-গাইড নাম বাদ দিয়ে সহায়ক বই লিখে ফেলছে। আমার প্রশ্ন হলো, সহায়ক বইয়ের সংজ্ঞা কী? এটি কি কেবল শিক্ষা আইনে এক লাইনেই বলা থাকবে? নাকি এর বৈশিষ্ট্যের কথা থাকবে? সারা বিশ্বেই শিক্ষার্থীদের জন্য একের অধিক রেফারেন্স বই থাকে। বিভিন্ন প্রকাশক তা প্রকাশ করে। কিন্তু তারা গুণগত মানসম্মত শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ কাজে যুক্ত করে। পাঠ্যবই যেভাবে উন্নয়ন করে, সেভাবেই এসব বই উন্নয়ন করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে কারা এসব গাইড বই তৈরি করছে? নামও পাওয়া যাবে না। তাই এভাবে সহায়ক বইয়ের অনুমোদন দিলে সেটি আরও বিপজ্জনক হবে। সহায়ক বইয়ের বৈশিষ্ট্য কী হবে, তা আগে ঠিক করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জানার জন্য বহু উৎস থাকতেই পারে। কিন্তু সেই উৎস কতটা গুণমানসম্পন্ন, কারা এটি তৈরি করছে, সে বিষয়গুলো দেখতে হবে। আরেকটি গুরুত্ব বিষয় হলো মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটিই বলে দেবে এ ধরনের কোচিং বা গাইড বই ব্যবহারের দরকার আছে কি না। যেমন সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি যেভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তাতে গাইড বই থেকে বের হওয়া যায়নি। সুতরাং শিক্ষাক্রমে মূল্যায়নের এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোচিং-প্রাইভেট ও গাইডের কোনো প্রয়োজন না পড়ে বা সবাই নিরুৎসাহিত হয়। ব্যবস্থাটিই এমনভাবে করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মনে করবে, কোচিংয়ে গেলে অযথা সময় নষ্ট, গাইড বই কেনায় টাকা খরচ।

উচ্চশিক্ষা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন