default-image

দেশে এখন আমরা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিচ্ছি। দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া চলছে। টিকার যা মজুত আছে এবং নতুন যে চালান আসার কথা, তাতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাই দুই ডোজ করে দেওয়া সম্ভব হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে আরও টিকা দরকার। কারণ, দেশের অন্তত ১০-১২ কোটি মানুষকে দুই ডোজ করে টিকা না দিলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে মুক্তি নেই। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে অন্য ধরনের টিকা কেনার চেষ্টাও সরকারের আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যদি প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণের পর দ্বিতীয় ডোজের সময় অন্য ধরনের টিকা দেওয়া হয়, তাহলে এই মিশ্র টিকায় কি সুফল পাওয়া যাবে? ক্ষতি হতে পারে কি? প্রশ্নটি ব্রিটেনে গত জানুয়ারি মাসে উঠেছিল। সে সময় সরকার বলেছিল, প্রথম ডোজ টিকা যত বেশি সম্ভব ব্যক্তিকে দেবে, এরপর যদি টিকায় টান পড়ে তাহলে প্রয়োজনে দ্বিতীয় ডোজে অন্য ধরনের টিকা দেওয়া হবে। এই নীতির ফলে সে সময় ব্রিটেনের মানুষ একটু ভয় পেয়েছিল। কারণ এই মিশ্র টিকার ভালো-মন্দ নিয়ে সে সময় কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা হয়নি। অবশ্য পরে ফেব্রুয়ারি মাসে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রথম ডোজ বায়োএনটেক টিকা দিয়ে দ্বিতীয় ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা অথবা এর বিপরীত ধারায় মিশ্র টিকা দিয়ে ফলাফল পরীক্ষা করার পদক্ষেপ নেন। হয়তো দ্রুতই এর ফলাফল জানা যাবে।

এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে গত ৩০ মার্চ কার্ল জিমারের একটি লেখা ছাপা হয়। তিনি বলছেন, গবেষণার ফলাফল থেকে এর ভালো-মন্দ সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। তবে ইবোলা ভাইরাসের চিকিৎসায় মিশ্র টিকা ব্যবহারের উদাহরণ আছে। গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করে দেখছেন, কারও দেহে  করোনাভাইরাসের কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে একই ধরনের টিকা ব্যবহার না করে দুই ধরনের টিকা ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যায় কি না। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে টিকার এ ধরনের মিশ্রণ হয়তো টিকার সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি উপায় হতে পারে। উপরন্তু গবেষকদের অনেকে মনে করেন, একই ধরনের টিকার দুই ডোজের চেয়ে মিশ্র টিকায় বেশি সুফল পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের একজন ইমিউনোলজিস্ট অ্যাডাম হুইটলি মনে করেন, দ্রুতই কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা যায় না। আমরা অপেক্ষা করব গবেষণার ফলাফলের জন্য। সারা বিশ্বেই এখন টিকার টানাটানি। যদি দেখা যায় মিশ্র টিকায় ক্ষতি নেই, তাহলে একটি বড় সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে হয়তো।

বিজ্ঞাপন

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন

default-image

সম্প্রতি কথা উঠেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার রূপান্তরিত করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা খুব বেশি সুরক্ষা দিতে পারে না। ওদিকে বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, আমাদের দেশে সম্প্রতি ভয়াবহ হারে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকার রূপান্তরিত করোনাভাইরাসই বেশি দায়ী। অপর একটি খবর আমাদের সচকিত করে। দক্ষিণ আফ্রিকা নাকি অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ফেরত দিয়েছে। ওরা বলছে, এই টিকা তাদের দেশে করোনা সংক্রমণ রোধে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছে না। আবার এমন কথাও প্রচলিত, এই টিকা নেওয়ার পরও অনেকের করোনা হচ্ছে। এর ফলে অনেকে ভাবছেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় লাভ কী? কিন্তু এ রকম ভাবার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি এখনো পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির (সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) একটি ছোট দল টিকা নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখছে। বিশেষভাবে তাঁরা বুঝতে চাচ্ছে, করোনার কোনো রূপান্তরিত ভার্সন এ ধরনের সংক্রমণ ঘটায় কি না। এই গবেষক দলের মুখপাত্র ক্রিস্টেন নর্ডলান্ড জানিয়েছেন, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি যে রূপান্তরিত ভাইরাসের কারণেই টিকা নেওয়ার পরও কেউ কেউ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও অন্যান্য টিকার পরীক্ষামূলক পর্বের ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণের সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং দ্বিতীয় ডোজের পর কোনো কোনো টিকায় এমনকি ৯০ শতাংশের বেশি সুরক্ষা পাওয়া যায়। এটাও মনে রাখতে হবে, বয়স্ক, হৃদরোগ বা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত লোকজনের কারও কারও টিকা নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। সাধারণভাবে বলা যায়, একবার টিকা নেওয়ার পর প্রায় ৪০ ভাগ তো সুরক্ষা না-ও পেতে পারেন, এটা প্রথমেই পরীক্ষামূলক পর্বে জানা গেছে। এর পরও সবার টিকা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। টিকা নেওয়ার একটি সুফল হলো করোনায় আক্রান্ত হলেও রোগের তীব্রতা কম থাকে।

মাস্ক কত দিন পরব

বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, দুই ডোজ টিকার কোর্স সম্পন্ন করলেও বাইরে চলাফেরায় প্রত্যেকের মুখে মাস্ক পরতে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কারণ টিকায় নিজের মোটামুটি সুরক্ষা হলেও তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে। সুতরাং দেশের অন্তত ১৮ বছর ও এর বেশি বয়সের ৮০ ভাগ জনগোষ্ঠী টিকা গ্রহণ না করা পর্যন্ত করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যায়। অন্যদিকে, বিদেশ থেকে আগতদের দুইবার টিকা নেওয়া না থাকলে তাঁদের মাধ্যমেও করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকবে। তাই মুখে মাস্ক ও জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস আমাদের জীবনযাপন প্রণালির স্বাভাবিক অঙ্গ হিসেবে মেনে নিতে হবে। তাহলে হয়তো আগামী বছর দুয়েকের মধ্যে আমরা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব। বিল গেটস সেদিন বলেছেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্ব করোনা সংক্রমণের আশঙ্কামুক্ত হতে পারে।

আব্দুল কাইুয়ম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক
[email protected]

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন