বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একজন শক্তিশালী নারী

অনুর গর্ভাবস্থার তখন ৩৬তম সপ্তাহ চলছে। এক রাতে অনু টের পেল, বাচ্চাএকেবারেই নড়াচড়ানা। দ্রুত তাকে বেলভ্যুর একটি স্থানীয় হাসপাতালেনেওয়া হলো।ভেবেছিলাম, আমাদের দুশ্চিন্তা হয়তো একটা রুটিন চেকআপের মধ্য দিয়েই কেটে যাবে। তাই হাসপাতালের বহির্বিভাগের ইমার্জেন্সি রুমের বাইরে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে করতে বেশ বিরক্তই লাগছিল। ভাবছিলাম, ছোট্ট একটা চেকআপে এত সময় লাগে! কিন্তু একটু পরেই চিকিৎসক বেরিয়ে এসে বললেন, দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হবে। ওই রাতেই সিজারিয়ান পদ্ধতিতে জেইনের জন্ম হলো। দিনটি ছিল ১৩ আগস্ট ১৯৯৬। ঘড়িতে তখন সময় রাত ১১টা ২৯।

জন্মের পর একটুও কাঁদল নাজেইন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে বেলভ্যুয়ের হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর করে লেক ওয়াশিংটনের সিয়াটল চিলড্রেনস হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) পাঠানো হলো। সারা রাত অনু প্রসবউত্তর কষ্টে ভুগল। আমি ওর পাশে ছিলাম। ভোরে গেলাম জেইনের কাছে। সারা রাতের ঝড়ঝাপটার পর ওকে দেখে মুহূর্তেই রাজ্যের প্রশান্তি আমার ওপর নেমে এল। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকল, ততই আমরা উপলব্ধি করলাম, ইউটেরো অ্যাসফিক্সিয়েশনের প্রভাব জেইনকে কতটা কাবু করেছে। বুঝতে পারছিলাম সেরেব্রাল পালসির কারণে বড় হয়েও তাকে হুইলচেয়ার আর আমাদের ওপর নির্ভর করতে হবে সব সময়। ওই সময়টায়আমি ভেঙে পড়েছিলাম। আমার আর অনুর জীবনের পরিকল্পনাগুলো এভাবে বদলে গেল, ভেবে মন খারাপ হচ্ছিল।

তবে জেইনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বিষয়টাকে একেবারে অন্যভাবেগ্রহণ করেছিল অনু। ওর প্রতিক্রিয়া ছিল চাপা আর নীরব। নিজেকেযেন ভুলে গিয়েছিলঅনু! জেইনের প্রতিটা অনুভূতি উপলব্ধি করতে শুরু করলও। জেইনের জন্য যা কিছু ভালো, অনু সেটার জন্যই ছুটে চলত। ‘আমরাই কেন?’—নিয়তির কাছে এই প্রশ্ন না করে সে জেইনের সর্বোচ্চ পরিচর্যার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিল।

শুরুর কয়েক মাস প্রতিদিন আমি অনুকে দেখতাম। ওর সংগ্রাম দেখে জীবনের অনেক মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছি। ওকে দেখেই শিখেছি যে দুঃখ করার মতো কিছুই আমাদের সঙ্গে হয়নি। বরং, কষ্ট পাচ্ছে আমাদের সন্তান, আর সেই কষ্টকে আমরা কী করে লাঘব করব, সেই পথ খুঁজে বের করাই হলো আমাদের দায়িত্ব। অনু অসাধারণ শক্তিমান এক নারী, একজন পরিশ্রমী মা এবং সেরা সঙ্গী। তাঁর মতোসহানুভূতিশীল মানুষ বিরল। ওকে দেখেই শিখেছি, একজন বাবা কিংবা একজন সিইও—যেকোনো দায়িত্বে সফল হতে হলে সহমর্মিতার চর্চা অপরিহার্য।

ব্যক্তি ও কর্মজীবন—দুই ক্ষেত্রেই যেকোনো পরিস্থিতিতে অনু আমাকে সহানুভূতিশীল হতে শিখিয়েছে। আর এ জন্যই এখন আমি আমার মাইক্রোসফটের সহকর্মীদের নিয়ে আমাদের কর্মক্ষেত্রকে মানবিক করে তোলার জন্য সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করতে পারি। এমনকি মাইক্রোসফটের সব উদ্ভাবন ও সেবাতেও আমরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্নসহ সব ধরনের মানুষের কথা মাথায় রাখি। কর্মী থেকে শুরু করে গ্রাহক—সবার জন্য মাইক্রোসফটকে সহজলভ্য করে তোলা শুধু পেশাগত দায়বদ্ধতাই নয়, আমার ব্যক্তিগত তাড়নাও।

খুলে গেল ‘জানালা’

অনুর অক্লান্ত ছুটে চলা দেখেই তাঁর মতো একজন মায়ের গল্প সবাইকে বলতে আমি অনুপ্রাণিত হই, আমার মতো পরিস্থিতিতেও কেউ যেন কোনো দিন হার না মানে। বিশেষ শিশুর বাবা হওয়ার পর আমার জীবনের বাঁক বদলে যায়। এই অভিজ্ঞতা আমার জানার বোঝার পরিধি ও উপলব্ধিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আমি আজ যে অবস্থানে আছি, এর পেছনে জেইন ও তার মায়ের সংগ্রামের অবদান অনেক।

বিভিন্ন সময় জেইনকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে একটা দিনের কথা আমার খুব মনে পড়ে। জেইন তখন অপারেশন থিয়েটারে। আমি ওর বেরিয়ে আসার অপেক্ষা করছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম জেইনের ঘরে থাকা আশপাশের সব যন্ত্রই উইন্ডোজে চলছে। তখন মনে হচ্ছিল, জীবনে যে কাজগুলো করেছি, খারাপ করিনি। মুহূর্তেই কেমন এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ উপলব্ধি করলাম। আমি এমন এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, যাদের প্রযুক্তি একটা মুদিদোকান থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, গবেষণাগার—সবখানে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওই একটা মুহূর্ত আমাকে বুঝিয়ে দিল, কতটা গুরুত্বের সঙ্গে আমাকে আমার কাজ করে যেতে হবে।

জেইন প্রতিদিন আমাকে মনে করিয়ে দেয়, ওর জন্য এখনো আমার আরও অনেক অসাধ্য সাধন করা বাকি। ওর মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ, যারা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে, তাদের রোজকার সংগ্রাম সহজ করার জন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে। নতুন নতুন উদ্ভাবনে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে, তাদেরও এসব কর্মযজ্ঞে যুক্ত করতে হবে। জেইন আমার অনুপ্রেরণার উৎস, আমাদের পরিবারের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। ওর শক্তি আর উষ্ণতা আমাকে রোজ প্রেরণা আর সাহস দেয়; যেন প্রযুক্তির সর্বোচ্চটুকু ব্যবহার করে আমরা পৃথিবীটা সবার জন্য আরও সহজ করতে পারি।

ইংরেজি থেকে অনুদিত।

সূত্র: লিংকডইন, ব্লুমবার্গ ও সত্য নাদেলার আত্মকথাহিট রিফ্রেশ অবলম্বনে

পড়াশোনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন