অদ্ভুত এক বাজি
একটা বাজি ধরি? আমি বলছি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে অন্তত ৮৫০ জন মানুষ আছেন, যাঁদের মাথায় ঠিক সমানসংখ্যক চুল—একটাও কম নয়, একটাও বেশি নয়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমি কি সবার চুল গুনে দেখেছি? দেখিনি। একজনেরও নয়। তবু কথাটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। কারণ, প্রমাণটা চুলে নেই, প্রমাণটা যুক্তিতে।
অন্ধকারে মোজার হিসাব
শুরু করা যাক ছোট একটা ঘটনা দিয়ে। লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ড্রয়ার হাতড়ে মোজা খুঁজছেন। ড্রয়ারে আছে কেবল দুই রঙের মোজা—সাদা আর কালো, এলোমেলোভাবে রাখা। চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অন্তত কয়টি মোজা তুললে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে একই রঙের একজোড়া পাবেনই?
উত্তর তিনটি। দুটি তুললে একটি সাদা আর একটি কালো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তৃতীয়টি যে রঙেরই হোক, আগের কোনো একটির সঙ্গে মিলে যাবেই। রং দুই রকম, মোজা তিনটি—কাউকে না কাউকে ভাগাভাগি করতেই হবে।
খোপ কম, কবুতর বেশি
এই সহজ কথাটিরই একটা গালভরা নাম আছে—পায়রার খোপনীতি। বক্তব্য মাত্র এক লাইনের: খোপের সংখ্যার চেয়ে কবুতরের সংখ্যা বেশি হলে অন্তত একটি খোপে একাধিক কবুতরকে ঢুকতেই হবে।
খোপ ছয়টি, কবুতর সাতটি। তাই একটি খোপে দুজনকে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতেই হয়েছে—গোটা নীতিটি এই ছবিতেই বন্দী।
শুনে মনে হতে পারে, এ আবার নীতি হলো নাকি! অথচ এই সরল কথাটি দিয়েই এমন সব জিনিস প্রমাণ করা যায়, যা প্রথমে অসম্ভব শোনায়।
ধরুন, আপনার ক্লাসে ৫০ জন শিক্ষার্থী। মাস আছে ১২টি। প্রতিটি মাসে যদি সর্বোচ্চ ৪ জন করে জন্মাত, তাহলে মোট শিক্ষার্থী হতো ৪৮ জন। কিন্তু ক্লাসে আছে ৫০ জন! তার মানে, এমন অন্তত একটি মাস আছেই, যে মাসে ক্লাসের অন্তত ৫ জনের জন্ম। কাল ক্লাসে গিয়ে গুনে দেখতে পারেন—মিলবেই।
এবার চুলের হিসাব
এবার বাজিটা মেটানো যাক। মানুষের মাথায় সাধারণত এক থেকে দেড় লাখ চুল থাকে। আমি বরং উদার হয়ে ধরে নিচ্ছি, সবচেয়ে ঘন চুলের মানুষটিরও চুল দুই লাখের বেশি নয়। তাহলে চুলের সংখ্যা হতে পারে ০ (টাকমাথা) থেকে ২ লাখ পর্যন্ত—সম্ভাব্য মোট ২,০০,০০১ রকম। এগুলোই আমাদের খোপ। আর কবুতর? বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ।
এবার উল্টো দিক থেকে ভাবি। ধরা যাক আমার দাবি ভুল, অর্থাৎ প্রতিটি ঘরে সর্বোচ্চ ৮৪৯ জন করে আছে। তাহলে দেশের মোট মানুষ হওয়ার কথা বড়জোর ৮৪৯ × ২,০০,০০১ = ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৮৪৯ জন। কিন্তু আমরা তো ১৭ কোটি! বাকি মানুষগুলো তাহলে গেল কোথায়? কোথাও যায়নি—কোনো একটি ঘরে অন্তত ৮৫০ জনকে ঢুকতেই হয়েছে।
বাজিটা জিতে গেলাম। একটাও চুল না গুনে।
যে কারণে সব ফাইল ছোট করা যায় না
মজার ব্যাপার, এই যুক্তি কম্পিউটারের ভেতরেও কাজ করে। ধরুন কেউ দাবি করল, সে এমন এক সফটওয়্যার বানিয়েছে, যা পৃথিবীর যেকোনো ফাইলকে ছোট করে ফেলতে পারে, আবার প্রয়োজনে হুবহু ফিরিয়েও আনতে পারে। দাবিটি যে ভুল, তা বোঝার জন্য একটি ফাইলও পরীক্ষা করে দেখতে হবে না। কারণ, ছোট আকারের ফাইল বানানো যায় অল্প কয়েক রকম, আর বড় আকারের ফাইল অনেক অনেক রকম। কবুতর বেশি, খোপ কম। তাই দুটি আলাদা ফাইল বাধ্য হয়ে একই জায়গায় গিয়ে ঠেকবে—আর তখন ফেরত আনার সময় সফটওয়্যারটি বুঝবেই না কোনটি ফিরিয়ে দেবে।
শেষ কথা: না গুনেই জানা
স্কুলের গণিতে আমরা বেশির ভাগ সময় হিসাব কষি—যোগ, ভাগ, সমাধান। কিন্তু গণিতের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রটা হিসাব নয়, যুক্তি।
জরিপ করে বড়জোর বলা যায় ‘সম্ভবত এমন’; যুক্তি দিয়ে বলা যায় ‘এমনই, অন্য কিছু হওয়া অসম্ভব’। ১৭ কোটি মানুষের একজনকেও না ছুঁয়ে তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত কথা বলে ফেলা—এই ক্ষমতা আর কোনো বিষয়ের নেই।
যাওয়ার আগে একটা ধাঁধা রেখে যাই। ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সংখ্যার মধ্য থেকে যেকোনো ৫১টি বেছে নিন, যেভাবে খুশি। আমি বলছি, আপনার বাছাই করা সংখ্যাগুলোর মধ্যে পাশাপাশি দুটি সংখ্যা (যেমন ৪৭ আর ৪৮) থাকবেই।
খোপগুলো এবার নিজে বানিয়ে ফেলুন। উত্তরটা আপনার হাতের মুঠোয়।