default-image

তিনি আমার কাছে সৌমিত্র কাকু। তিনি কত বড় অভিনেতা, তা তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই। পর্দায় তিনি যখন অভিনয়ের গরিমা ঝেড়ে ফেলে চরিত্রের আচরণ ফুটিয়ে তুলছিলেন, এই উপমহাদেশের শিল্পভুবনে সেটা শুধু বিস্ময়কর ঘটনাই ছিল না, ছিল এক নতুন যুগের শুরু। বিশ্বচলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রথম সারিতেই তাঁর স্থান। অমন যে শিখরে ওঠা শিল্পী, মানুষ হিসেবে তাঁর সীমানা ছিল আরও প্রসারিত ও গভীর। মহাসাগরের মতো—অতলান্ত, কিন্তু শান্ত।

আমি তাই বলতে বসেছি মানুষ সৌমিত্রেরই গল্প। এ আমার বিরাট দুর্ভাগ্য, তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলাম না। দু–তিনটি ছবির কথা হয়েছিল। কিন্তু ঠিকঠাক একটা কাজের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একটা প্রায় হয়েই গিয়েছিল। কোভিড–১৯ এসে আটকে দিল। এখন তো তিনি নিজেই চলেই গেলেন।

default-image

আবার আমার এক বিরাট সৌভাগ্যও বলতে হয়। অভিনেতাকে ছাপিয়ে বিরাট এক মানুষ হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য পেয়েছি। তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয় এক পুরস্কার দেওয়ার অনুষ্ঠানে। কোন পুরস্কার, তা ঠিক মনে নেই। তবে পশ্চিমবঙ্গে আমার অভিনয়পর্বের প্রথম দিকটায়। পুরস্কার দেওয়ার আগে আয়োজকেরা আমাকে নিয়ে গেলেন মঞ্চের পেছনের ঘরটাতে। ঢুকেই দেখি সেখানে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর মাধবী মুখোপাধ্যায়। যাঁদের অভিনয় দেখে শিহরিত হতে হতে আমি বড় হয়েছি, সেই তাঁরাই কিনা বসে আছেন আমার সামনে? আমার ইতস্তত ভাব দেখে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘তুমিই জয়া? এসো এসো। আমরাই তো তোমার হাতে আজকের পুরস্কারটা তুলে দেব।’ তাঁর কথা শুনে আমি তো বিমূঢ়। কোনো কথা মাথাতেই ঠিকমতো ঢুকছিল না। দুজনার মাঝখানে গিয়ে আমি বসলাম। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আমার চিবুক ধরে খুব আন্তরিক স্বরে বললেন, ‘তোমার অভিনয়ের এত সুনাম শুনেছি। দেখতে হবে তো।’

বিজ্ঞাপন

এখনো মনে আছে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা শুনে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে এরপরও কতবার যে দেখা হয়েছে। কাজে, অনুষ্ঠানে, শুটিং স্পটে, সাহিত্য উৎসবে। মুখে সেই স্মিত হাসি, কণ্ঠে একই সহজ আন্তরিকতা। কোনো মানুষ যত ওপরে ওঠেন, ততই কি সহজ হয়ে আসেন? কিংবদন্তির সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন আমার সৌমিত্র কাকু। পরবর্তী প্রজন্মের সবার কাছে এটিই তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয়। আমিও সে বৃত্তে ঢুকে পড়লাম।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সত্যিকারের প্রজ্ঞাবান। বিচিত্র বিষয় নিয়ে কী সহজে কত গভীর কথা যে বলে যেতেন! বয়সের সীমা টপকে যেতেন অনায়াসে। আর ছিল তাঁর অসাধারণ রসবোধ।

এ রকম গুণী মানুষকে কাছে পেলে কি সহজে আর ছাড়া যায়! তাঁর ঝুলিও অজস্র রঙিন গল্পে ঠাসা। কাছে পেলেই পীড়াপীড়ি করতাম তাঁকে, ‘ওই ফিল্মের গল্পটা শোনাও না।’ ‘অমুক পরিচালক তোমাকে দিয়ে কীভাবে কাজ করাত, বলো তো?’ এভাবে যেকোনো ভ্রমণপথ আনন্দে ভরে উঠত তাঁর মুখরোচক গল্পে।

default-image

কোথাও একবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শুটিং শেষ হয়েছে। আমিও কাজ শেষে বাড়ি ফিরব। দীর্ঘ পথ। তিনি গল্প জুড়েছেন। হঠাৎ আবদার করে বললাম, ‘একটা কবিতা আবৃত্তি শোনাবে?’ আমাকে অবাক করে দিয়ে সত্যিই সত্যিই আবৃত্তি করতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও’। যখন পড়লেন, ‘মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসিলাম’, মনে হলো যেন মরুভূমির লু হাওয়া পেরিয়ে এসে জলপ্রপাতের প্রশান্তির মধ্যে ঢুকে পড়েছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার আবৃত্তির সেই অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা আমার মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে রইল।

সেদিন বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বললাম, ‘তোমাকে নামিয়ে দিয়ে এসে তবে আমি ফিরব।’ তাঁকেই আগে নামিয়ে তারপর বাড়ি ফিরব, সেটাই তো সংগত। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলে কথা। তিনি বললেন, ‘এটা হতেই পারে না। অনেক রাত। তুমি একা একা কী করে ফিরবে?’ এই বলে আগে তিনি আমাকে আমার যোধপুর পার্কের বাড়িতে নামালেন। তারপর নিজে ফিরলেন বাড়িতে।

সেই সজীব আর প্রাণবন্ত মানুষটি চলে গেলেন। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। কলকাতায় থাকলে হয়তো তাঁকে শেষ দেখাটা দেখতে যেতাম। আবার দেখিনি যে, সেটাও হয়তো একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। তাঁর স্মিত হাসিমাখা চেহারাটাই আমার মনে অক্ষয় হয়ে বেঁচে আছে। হাসিতে উজ্জ্বল সেই মুখটির চারপাশে আমার মনে এখনো উড়ে বেড়াচ্ছে হাজারো প্রজাপতির মতো কত না রঙের গল্প।

default-image
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0