কানন দেবীর জন্মদিন আজ, ২২ এপ্রিল
কানন দেবীর জন্মদিন আজ, ২২ এপ্রিলছবি: কোলাজ

‘পথিক ভ্রমর শুধায় মোরে/ সোনার মেয়ে নাম কি তোর? /বলি, ফুলের দেশের কন্যা আমি/ চম্পাবতী নামটি মোর… আমি বনফুল গো’, গানটি চট করে চেনা যায়। খুব চেনা সুর, চেনা কথা, শিল্পীর কণ্ঠটাও ব্যতিক্রম। বোঝা যায় পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ডের, ইউটিউবেও পাওয়া যায়।

১৯৪২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শেষ উত্তর’ সিনেমায় ছিল এ গান। কমল দাশগুপ্তর সংগীত পরিচালনায় এ গানের দৃশ্যে যিনি ছন্দে ছন্দে আনন্দে দুলেছেন, তিনি কানন দেবী। তিনি কিংবদন্তিতুল্য নায়িকা ও গায়িকা, বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের গ্ল্যামার কুইন কানন দেবীর জন্মদিন আজ, ২২ এপ্রিল। ১৯১৬ সালের এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন। যাঁর কাছে সুচিত্রা, সাবিত্রী, সুপ্রিয়ারা আশ্রয় পেতেন, প্রেরণা পেয়েছিলেন।

default-image

সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব আর গুণ—এই তিনের দারুণ এক সম্মিলন ছিলেন কানন দেবী। তাঁকে বলা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম নায়িকা। শুধু তা-ই নয়, বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁকেই প্রথম তারকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রথম ‘ব্র্যান্ডেড’ নায়িকা কানন দেবী—এমনও বলেন কেউ কেউ; সুচিত্রা সেনের আগের ‘সুচিত্রা’ কানন দেবী। যদিও দুজনের যাপিত জীবন, পারিবারিক অবস্থা—কোনো কিছুরই মিল নেই। সুচিত্রা তারকা ইমেজ ছেড়ে কোনো দিনও বেরোননি। তৎকালীন ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই সুচিত্রা সেনের সান্নিধ্য পাননি।

পাবনার মেয়ে সুচিত্রার পরিবার অবস্থাপন্ন, শিক্ষিত, তাঁর বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত বাঙালি স্টাইলে, উচ্চবিত্ত পরিবারে বিয়ে, কিন্তু একেবারে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিনেমায় এসেছিলেন। কানন দেবীর গল্পটা অন্য রকম। তাঁকে বলা হতো ইন্ডাস্ট্রির জননী। নায়িকা, গায়িকা, প্রযোজক, অভিভাবক—কত কী!

বিজ্ঞাপন

আরও পার্থক্য আছে। সুচিত্রা ছোটবেলায় (পাবনায় যখন ছিলেন) সংগীত চর্চা করলেও পরে তাঁকে তেমন গাইতে দেখা যায়নি। নিজের ছবিতে কখনো গান করেননি। অপর দিকে কানন দেবী ছিলেন পুরোদস্তুর গায়িকা। প্রচলিত কথায় তিনি ‘ফুল প্যাকেজ’

default-image

জন্ম নয়, কর্মেই তাঁর পরিচয়
কাগজে-কলমে আজই তাঁর জন্মদিন। তাঁর সঠিক পরিচয় নিয়েও রয়েছে নানা কথা। তিনি যেন তাঁর গানের মতোই, বনফুল! জন্মে নয়, কর্মে পরিচয় ছিল তাঁর। শুরুতে কাননের জন্মের সাল-তারিখের পরিষ্কার তথ্য ছিল না। কোনো তথ্যই যেখানে নেই, সেখানে মতামত নিয়েই চালিয়ে দিতে হতো। সে রকম এক মত স্থির হয়েছে, কানন দেবীর জন্ম ২২ এপ্রিল, ১৯১৬; আরেক মতে ১৯১২। এভাবেই জন্মস্থানও স্থির হয়েছে কলকাতার কাছেই, হাওড়ায়।
আমরা এই তারিখে স্থির থাকি। কানন দেবীর জন্ম ১৯১৬ সালের ২২ এপ্রিল হাওড়ায়। আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’তে অনেক কথা বলে গেছেন তিনি। তাঁকে নিয়েও অনেক গল্প প্রচলিত। মেখলা সেনগুপ্ত তাঁর ‘কানন দেবী: দ্য ফার্স্ট সুপারস্টার অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’ বইতেও বলেছেন কাননের দুঃখ জয় করার গল্প। মা-বাবা নেই, খাওয়াপরা নেই, ঝি-গিরি করে, দুয়ারে দুয়ারে মাথা ঠুকে কানন থেকে কানন বালা, তারপর কানন দেবী হওয়া বাংলা সিনেমার সবচেয়ে আশ্চর্য সাফল্যগাথা। তাঁর জীবনের গল্পটিই যেন অতি দুঃখের কোনো বাংলা সিনেমা। একের পর এক বাঁধা পেরিয়েছেন তিনি।

এক বর্ণনায় জানা গেছে, হাওড়ার এক গরিব পাড়ায় ছোট্ট কাননের দেখা মেলে প্রথমবার। হাওড়ার এক স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল মেয়েটি। বেতন দিতে না পেরে স্কুল ছাড়তে হয়। আরেকটি গল্পে জানা গেল, কাননকে শিশু অবস্থায় আনা হয় ভাগলপুরে গঙ্গা–তীরবর্তী রাজবাটী আদমপুরের পোস্তা বাগানবাড়িতে। সেটা ছিল ‘রাজা’ শীলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আরেকটি গল্পে আছে, কাননের বাবা দরজি, মা বাইজি। সেখান থেকে কলকাতায় আনা হয় তাঁর গানের গলা দেখে। কিন্তু পেট চালাতে হচ্ছিল বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করে। সেই আয়ে গান, নাচও চালিয়েছেন। তবে কানন দেবীর জীবনীতে যে কথা স্পষ্ট, তা হলো কাননকে প্রতিপালন করেছেন রাজবালা দেবী ও রতনচন্দ্র দাস। কানন দেবী আত্মকথায় তাঁদের মা ও বাবা বলে উল্লেখ করছেন। অবশ্য কানন দেবী এমনও বলেছেন, ‘কে বাবা, কে মা, এই ভেবে বুকের ব্যথা বাড়িয়ে কাজ কী? আমি কানন, এই পরিচয়টুকুই তো যথেষ্ট।’

default-image

বলে নেওয়া ভালো, রতনচন্দ্র দাস মেয়েকে গান শেখাতে চেয়েছিলেন। কানন দেবীরও সাধ ছিল গায়িকা হওয়ার। কানন যখন খুব ছোট, রতনচন্দ্র বই কিনে এনে তাঁকে পড়ে শোনাতেন। আর গান শোনানোর জোগাড়যন্ত্র করতেন। সেসব গল্প ও গান শুনে শুনে বালিকার অভ্যাস তৈরি হলো, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নেচেগেয়ে নায়িকা সাজা। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর নিষ্ঠুর নিয়তি কানন দেবী আর তাঁর মাকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ফেলে দেয়।

বিজ্ঞাপন

কাননকে স্কুল ছাড়িয়ে লাগানো হলো গৃহস্থের বাড়িতে রান্না, ঘর ঝাড় দেওয়া, নিকানো, কাপড় কাচার কাজে। কানন দেবী স্মৃতিকথায় বলেছেন, দুঃসহ পরিস্থিতির সামাল দিতে তাঁদের একসময় উঠতেই হলো চন্দননগরে এক অবস্থাপন্ন আত্মীয়ের বাড়ি। তবে যেদিন তাঁরা সে বাড়িতে গিয়ে উঠলেন, সেদিনই ওই আত্মীয়েরা বাড়ির গৃহকর্মীদের বিদায় করে দিলেন! তার মানে, নতুন কাজের লোক পেয়েছেন তাঁরা। কানন দেবী তাঁর সেই আত্মীয়দের নাম জানাননি।

default-image

নিদারুণ কষ্টে কাননদের দিন কাটছিল সে বাড়িতে। গালমন্দ চলত নিয়মিত। একদিন মায়ের হাত থেকে একটা সিরামিক পাত্র ছিটকে পড়ে ভেঙে গেলে শুরু হয় গালাগাল। কানন তখন মায়ের হাত ধরে বলেছিল, ‘না মা, আর একটা দিনও এখানে নয়। এক্ষুনি চলো। না খেয়ে মরলে মরব।’ সেখান থেকে বেরিয়ে হাওড়ার যে ঘোলাডাঙ্গা পল্লিতে আস্তানা হলো কানন ও রাজবালার, সেটা তখন ছোট ব্যবসায়ীদের আড়ত। সেখানে সংসার করা লোকজনের বাড়ির সামনে বোর্ড ঝুলত, ‘এটা গৃহস্থের ভিটা’। কেননা পাশের বাড়িটাই হয়তো যৌনকর্মীদের।

সেখানে মধ্যবয়সী বিপত্নীক একজনের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁদের। যাকে আত্মজীবনীতে ‘ভোলা দা’ পরিচয় দিয়েছেন তিনি। স্মৃতিচারণায় তিনি লিখেছেন, ‘সন্ধ্যাবেলায় সেই ভোলা দা হারমোনিয়াম নিয়ে বসে ভক্তিগীতি ধরতেন। যেন একটা নতুন জগৎ খুলে যেত।’ কাননকে তিনি একে একে শেখালেন কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি, কর্তাভজা, মীরা ও সুরদাসের ভজন, সংস্কৃত মন্ত্র, ব্রহ্মসংগীত এবং অতুলপ্রসাদের গান।

জীবিকার প্রয়োজনে অভিনেত্রী
জীবনে অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন তিনি কখনো দেখেননি। বাঁচার অবলম্বন হিসেবে যখন অভিনয়কে বেছে নিতে হলো, তখন অভিনয়কেই তিনি তাঁর জীবন, জীবিকা, ধ্যান ও জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে মাত্র ১০ বছর বয়সে অভিনয়জগতে নাম লেখান কানন দেবী। সেটা অবশ্য সম্ভব হয়েছে তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কল্যাণে। তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়কে কানন দেবী কাকাবাবু বলে ডাকতেন। তিনিই তাঁকে, মাত্র ১০ বছর বয়সে, ম্যাডান কোম্পানিতে নিয়ে আসেন। ম্যাডানের স্টুডিওতে গিয়ে অডিশন দেন আর নির্বাচিত হন নির্বাক চলচ্চিত্র ‘জয়দেব’-এ অভিনয়ের জন্য। জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’-এ রাধার ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে কানন দেবীর শিল্পীজীবন শুরু হলো। সেদিন কাজ শেষে হাতে পেয়েছিলেন পাঁচ টাকা। যদিও পাওয়ার কথা ছিলো ২৫টাকা। ১৯২৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর ছবিটি মুক্তি পায়। এরপর ১৯২৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ইন্ডিয়ান সিনেমা আর্টস প্রযোজিত এবং কালীপ্রসাদ ঘোষ পরিচালিত নির্বাক ছবি ‘শঙ্করাচার্য’তে বালিকা কানন অভিনয় করেন। ১৯৩১ সালে প্রথম সবাক বাংলা ছায়াছবি ‘জামাইষষ্ঠী’ মুক্তি পেল।

default-image

‘ম্যাডান থিয়েটার’-এর দ্বিতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য সবাক ছবি ‘জোরবরাত’-এর জন্য সুন্দরী ও সুকণ্ঠী নায়িকার প্রয়োজন। ছবির পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় কাননকে ডেকে পাঠালেন। কানন নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করলেন মিস কাননবালা নামে। এরপর ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঋষির প্রেম’, ‘প্রহ্লাদ’ এবং ১৯৩২ সালে ‘বিষ্ণুমায়া’ ছবিতে অভিনয় ও গান করেন। এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া।

আধুনিক গান ও রবীন্দ্রসংগীতে কানন দেবীর অসাধারণ দখল ছিল। কানন দেবীর গাওয়া ‘আমি বনফুল গো’, ‘তুফান মেইল যায়’,’ ‘যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন’ ,‘ঘর যে আমাকে ডাক দিয়েছে’, ,‘তোমারে ভুলতে পারিনা’, ‘ফেলে যাবে চলে যাবে তুমি জানি’- শুনলে বুঝা যাবে, কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি কত উঁচু দরের ছিলেন।

অবশ্য এই পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। এ পথে ছিল প্রেম, প্রলোভন, প্রবঞ্চনা। শোনা যায়, কানন দেবীর দারিদ্র্যের সুযোগ নিতেন পরিচালকেরা। সে সময়ে তাঁকে বহু সিনেমায় খোলামেলা দৃশ্যে (সে সময়ের বিবেচনায়) অভিনয় করতে হয়েছে। এত কিছুর পরও পরিচালকেরা তাঁকে আর্থিক দিক দিয়েও ঠকাতেন।

default-image

১৯৩৫ সালে ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত করেন কানন দেবী। এরপর ১৯৩৭ সালে ‘মুক্তি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সফলতার সিঁড়িতে পা রাখেন। এর পরের গল্প কেবল সাফল্যের। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি সাফল্য ধরে রেখেছিলেন। একের পর এক সুপারহিট সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘শ্রীমতি পিকচার্স’ নামে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও চালু করেন। এ ছাড়া তিনি নিজে পরিচালনার কাজও করেছেন। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ৭০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন কানন দেবী। এর মধ্যে রয়েছে ‘ঋষির প্রেম’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘কংসবধ’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘মা’, ‘কণ্ঠহার’, ‘বাসবদত্তা’, ‘পরাজয়’, ‘যোগাযোগ’, ‘মুক্তি’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘সাথী’, ‘পরিচয়’, ‘শেষ উত্তর’, ‘মেজদিদি’প্রভৃতি।

সংগীতশিল্পী হিসেবে নাম ছিল তাঁর
কানন দেবী কেবল অভিনেত্রী হিসেবেই জনপ্রিয় নন, গায়িকা হিসেবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। কানন দেবী একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি গায়িকা হলে বেশি ভালো হতো।’ শোনা যায়, তিনি ওস্তাদ আল্লারাখার কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, অনাদি দস্তিদার ও পঙ্কজ কুমার মল্লিকদের কাছেও তালিম নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আধুনিক গান ও রবীন্দ্রসংগীতে কানন দেবীর অসাধারণ দখল ছিল। এ ছাড়া অসংখ্য সিনেমায় তিনি প্লেব্যাক করেছেন। সেসব গান পেয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। কানন দেবীর গাওয়া ‘আমি বনফুল গো’, ‘তুফান মেইল যায়’,’ ‘যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন’ ‘কথা কইবো না বউ’, ,‘ঘর যে আমাকে ডাক দিয়েছে’, ,‘তোমারে ভুলতে পারিনা’, ‘ফেলে যাবে চলে যাবে তুমি জানি’, অথবা রবীন্দ্রসংগীত ‘আজ সবার রঙ্গে’ বা ‘তার বিদায়বেলার মালাখানি’ গানগুলো শুনলে বুঝা যাবে, কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি কত উঁচু দরের ছিলেন।

default-image

‘কী সুন্দর মুখ তোমার’, বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
গান নিয়ে করা প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবি আলোচনায় আসার পর হিন্দুস্তান রেকর্ডসে কবিকে প্রথম দেখেন কানন দেবী। প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এ হলো কানন, তারকা অভিনেত্রী।’ কানন প্রণাম করতেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঠোঁট ছুঁয়ে বলেছিলেন, ‘কী সুন্দর মুখ তোমার! গান করো?’ এ ঘটনা ‘বিদ্যাপতি’ ছবির সময়কার। কবির মনে ছিল না, এই মেয়েই ‘মুক্তি’-তে তাঁর গান গেয়েছেন। প্রশান্তচন্দ্র তখন যোগ করলেন, ‘ও তো আপনার গান গেয়েই বিখ্যাত।’ রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন, ‘তাই? তাহলে একবার শান্তিনিকেতনে এসে গান শুনিয়ো আমায়।’


স্বীকৃতিও কম নয়
প্রথম জীবনটা নিদারুণ কষ্টে কেটেছিল। পরিণত জীবন যে খুব বেশি সুখের, তা-ও নয়। সে অর্থে সংসার করা হয়নি। এসব নিয়ে অবশ্য তাঁর নিজের ভাবনা তেমন ছিল না। অন্যদিকে প্রাপ্তিও তাঁর কম নয়।

১৯৪১ সালে নীতিন বসু পরিচালিত ‘পরিচয়’ ও এই ছবির হিন্দি সংস্করণ ‘লগন’-এ নায়িকা চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য বিএফজেএ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মানে ভূষিত হন কানন। ১৯৬৮ সালে চলচ্চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান। ১৯৯০ সালে তিনি সিনে সেন্ট্রাল কর্তৃক হীরালাল সেন পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯১ সালে কানন দেবী ‘ইন্দিরা গান্ধী স্মৃতি পুরস্কার’ পান। ২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের ডাক বিভাগ কানন দেবীর একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

default-image

কানন দেবীর সময়ে তিনি দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। চলচ্চিত্র গবেষক রবি বসু তাঁর এক রচনায় লিখেছেন, কানন বালাকে দেখে অনেক যুবক ও প্রৌঢ়ের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত। রূপবাণী সিনেমা হলে এক যুবক মোহগ্রস্ত হয়ে তাঁর সিনেমার রোমান্টিক দৃশ্যের সময় পর্দার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। শোনা গেছে, কলকাতার রাস্তায় তাঁর আলোকচিত্র বিক্রি হতো। নারীরা তাঁর ফ্যাশনে শাড়ি-ব্লাউজ পরা শুরু করেন। তাঁর মুখ দেখা যেত বড় বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনেও।

শেষ জীবনে তিনি সেবামূলক কাজে এগিয়ে আসেন। অবশ্য দুস্থ বয়স্ক শিল্পীদের সাহায্যের জন্য তিনি সব সময়ই সক্রিয় ছিলেন। নীরবেই সেসব কাজ করতেন। তারপর ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বেলভিউ ক্লিনিকের এক নির্জন কেবিন থেকে প্রায় চুপি চুপি পাড়ি দেন অনন্তের পথে। সেই হাসপাতালেই দুই দশক পর সেই পথের যাত্রী হয়েছিলেন সুচিত্রা সেনও।

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন