প্রসাধনী বিক্রেতা থেকে ৩৩০ কোটি রুপির মালিক
ছিলেন কৌতুক অভিনেতা। এক সিনেমা দিয়েই ঘুরে যায় তাঁর ক্যারিয়ার। এখন বড় পর্দা, ওটিটিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। তিনি আর কেউ নন, আরশাদ ওয়ার্সি। আজ ১৯ এপ্রিল, এই অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক আরশাদ সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য।
স্কুল ছেড়ে বিক্রয়কর্মী
মুম্বাইয়ের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম। বাবা আহমেদ আলী খান ছিলেন কবি। ছদ্মনামে কাজ করেছেন হিন্দি সিনেমায়ও। তবে একটা সময়ে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়। ফলে কিছুদিন এতিমখানায়ও থেকেছেন তিনি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর স্কুল ছাড়েন। বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হয় বিক্রয়কর্মীর পেশা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসাধনী বিক্রি করতেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭ বছর। আশির দশকের শেষের দিকে দুটি সিনেমায় একটি নাচের দলের হয়ে পারফর্মও করেন।
ভাগ্যবদলের শুরু হয় ১৯৯১ সালে। একটি নাচের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৯২ সালে ২১ বছর বয়সে ‘ওয়ার্ল্ড ড্যান্স চ্যাম্পিয়নশিপ’–এ আধুনিক জ্যাজ ক্যাটাগরিতে চতুর্থ পুরস্কার পান। পরে নিজেই নাচের স্টুডিও চালু করেন।
১৯৯৩ সালে ‘রূপ কি রানি চোরি কি রাজা’ ছবির শিরোনাম সংগীত কোরিওগ্রাফি করার সুযোগ পান। এ সময়ই তাঁকে জয়া বচ্চন সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন।
সার্কিট হয়ে পরিচিতি
১৯৯৬ সালে অমিতাভ বচ্চনের প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত ‘তেরে মেরে স্বপ্নে’ সিনেমায় সুযোগ পান। এর ধারাবাহিকতায় আরও কিছু সিনেমা করেন। তবে তাঁর জীবন বদলে যায় ২০০৩ সালে রাজকুমার হিরানীর ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ সিনেমায় অভিনয় করে। এই ছবিতে সার্কিট চরিত্র তাঁর ক্যারিয়ারের বাঁকবদল এনে দেয়। জনপ্রিয়তার সঙ্গে জোটে পুরস্কারও।
এরপর এই ‘মুন্না ভাই’, ‘গোলমাল’ ও ‘ধামাল’ফ্র্যাঞ্চাইজি ছাড়াও ‘অ্যান্থনি কৌন হ্যায়?’, ‘ধামাল’ তাঁকে কমেডি অভিনেতা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। নাসিরউদ্দিন শাহর সঙ্গে ‘ইশকিয়া’ ও অক্ষয় কুমারের সঙ্গে ‘জলি এলএলবি’ সিনেমা তাঁর ক্যারিয়ারে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
এখনো তাড়া করে অতীত
আরশাদ ওয়ার্সি জানান, যখন তাঁর মাত্র ১৪ বছর বয়স, নিজের দুই অভিভাবককেই হারিয়েছিলেন। সম্প্রতি রাজ শামানির পডকাস্টে অরশাদ উল্লেখ করেন, পরিবার নিয়ে তাঁর খুব বেশি স্মৃতি নেই। কারণ, শৈশবের বেশির ভাগ সময়ই তিনি বোর্ডিং স্কুলে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার শৈশব নিয়ে বলতে গেলে আমার স্কুলের স্মৃতি আমার পরিবারের স্মৃতির চেয়ে বেশি মনে আছে। আমি মাত্র আট বছর বয়সে বোর্ডিং স্কুলে গিয়েছিলাম।’
মাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরশাদ বলেন, তাঁর মায়ের শেষ স্মৃতি ভয়ংকর; আজও তাঁকে তাড়া করে। তিনি স্মরণ করেন, বাবার মৃত্যুর পরে তাঁর মায়ের কিডনি বিকল হয়ে যায় এবং তিনি ডায়ালাইসিসে ছিলেন, ‘আমার মা একজন সাধারণ গৃহিণী ছিলেন। দারুণ রান্না করতেন। তাঁর কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা আমাদের বলেছিলেন, তাঁকে পানি দেবেন না। কিন্তু তিনি বারবার পানি চাইছিলেন। আমি “না” বলেই যাচ্ছিলাম। তিনি মারা যাওয়ার আগে রাতে আমাকে ডাকলেন। আবার পানি চাইতে শুরু করলেন। সেই রাতে তিনি মারা যান, আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়ি।’
আরশাদ আরও বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয়, যদি তাঁকে পানি দিতাম; তারপরও মারা যেতেন। তবে সারা জীবন ভাবতাম, তিনি আমার কারণেই মারা গেলেন।’
অভিনেতা জানান, কৈশোরে মা-বাবাকে হারিয়ে তিনি একা হয়ে যান। নিজে নিজেই সব শিখতে হয়েছে। আরশাদ ওয়ার্সির ভাষ্যে, ‘আমি বয়সের চেয়ে অনেক পরিপক্ব ছিলাম। কারণ, চোখের সামনে অনেক কিছু দেখেছি। আমার বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। আমরা ছোটবেলায় অনেক বড় বাড়িতে থাকতাম, এরপর বাড়ি ছোট হতে থাকে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পরে আমি সেভাবে কাঁদিনি। কারণ, নিজেকে পরিণত দেখাতে চেয়েছি। কয়েক সপ্তাহ পরে যখন বুঝলাম কী ঘটেছে, তখন কাঁদি।’
আরশাদ স্মরণ করেন, তিনি বিভিন্ন জায়গায় গানের শো করতেন; প্রতি শো থেকে তিনি ১৭৫ রুপি পেতেন। বাড়ির খরচ, বিল আর মায়ের চিকিৎসা মিলিয়ে জীবন ছিল অনেক কঠিন।
আরশাদ ওয়ার্সি বলেন, ‘আমি সাহসী হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু জীবন খুব কঠিন ছিল। একটা সময়ের পর যত চেষ্টাই করি না কেন, সব ভেঙে পড়ে। এটি খুব ভয়ংকর সময় ছিল। আমি সপ্তাহে কয়েক শ রুপি উপার্জন করতাম, আর মায়ের সাপ্তাহিক ডায়ালাইসিস খরচ ছিল ৮০০ রুপি। সেই সময় আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমাকে অনেক টাকা উপার্জন করতে হবে।’
গানের শোতে ১৭৫ রুপি পাওয়া সেই আরশাদ এখন ৩৩০ কোটি রুপির মালিক। বছরে তাঁ আয় ১৫-২০ কোটি রুপি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে