এটা যৌনতা ও নিজের প্রয়োজন বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়: ৪১–এ পা দিয়ে রাধিকা
বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর জীবন, শরীর ও যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো নানা ট্যাবুতে আটকে আছে। বিশেষ করে চল্লিশের পর নারীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলাকে অনেক সমাজেই অস্বস্তিকর বলে মনে করা হয়। সে ধারণার বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে। ৪১ বছরে পা দিয়ে তাঁর উপলব্ধি, এ বয়সেই তিনি নিজের শরীর, চাওয়া-পাওয়া ও যৌনতার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক ভালো বুঝতে পারছেন।
সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের অ্যানথোলজি সিনেমা ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’-এ অভিনয় করেছেন রাধিকা। সিনেমাটিতে চল্লিশের কোঠায় থাকা এক নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে যৌনতা ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। ছবিতে কাজ করার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেও বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন অভিনেত্রী।
‘বয়স বাড়াকে অবনতির মতো দেখা হয়’
রাধিকার মতে, সমাজ বয়স বাড়াকে স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়া হিসেবে দেখার বদলে একধরনের অবনতি হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন।
রাধিকা বলেন, ‘আমরা সমাজ হিসেবে বয়সের ব্যাপারে খুবই বৈষম্যমূলক। বয়স বাড়াকে যেন কোনো ধরনের অবনতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আমার বয়স এখন ৪১। এই বয়সে আমি ২০ বা ৩০-এর তুলনায় নিজেকে ও নিজের শরীরকে অনেক ভালোভাবে চিনতে পারছি।’
জীবনের বিভিন্ন বয়সে মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের কথাও বলেন রাধিকা। তাঁর মতে, বিশের পরে মানুষ মূলত এমন অনেক কিছু করার ব্যস্ততায় থাকে, যা তার মা–বাবা করতে নিষেধ করেছিলেন। তিরিশের পরে এসে আবার নিজের সিদ্ধান্ত ও মা–বাবার দেওয়া পরামর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
কিন্তু চল্লিশের পরে এসে মানুষ নিজের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করতে শুরু করে বলে মনে করেন রাধিকা।
‘চল্লিশে আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয় বোঝার সময়’
রাধিকার ভাষায়, চল্লিশের দশক জীবনের এমন একটি সময়, যখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষা, প্রয়োজন ও যৌনতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে।
‘এটা আকাঙ্ক্ষা, বোঝাপড়া, যৌনতা ও নিজের প্রয়োজন বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমি আমার চল্লিশের দশকেই নিজেকে সবচেয়ে ফিট, তরুণ ও প্রাণবন্ত মনে করছি,’ বলেন রাধিকা।
মাতৃত্ব রাধিকার শরীর ও নিজের শরীরকে বোঝার অভিজ্ঞতাকেও বদলে দিয়েছে বলে জানান অভিনেত্রী। তাঁর মতে, মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। ফলে নিজের শরীর ও প্রয়োজনকে নতুন করে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
রাধিকার কাছে তাই চল্লিশের বয়স কোনো সীমাবদ্ধতার সময় নয়; বরং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সময়।
যৌনতা নিয়ে কথা বলাও এখনো ট্যাবু
তবে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এতটা খোলামেলা হওয়ার পরও রাধিকা মনে করেন, ভারতের অনেক সমাজে যৌনতা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কথা বলা এখনো কঠিন। বিশেষ করে নারীর আকাঙ্ক্ষাকে পুরুষের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে আলাদাভাবে দেখার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
রাধিকা বলেন, যৌনতা বা আকাঙ্ক্ষার কথা বলার আগে সমাজে নারী-পুরুষের সমানভাবে চিন্তা ও কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। নিজের বেড়ে ওঠার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ছোটবেলায় তিনিও যৌনতাকে ‘খারাপ’ বা লজ্জার বিষয় হিসেবে ভাবতেন।
রাধিকার প্রশ্ন, পুরুষ ও নারীর আকাঙ্ক্ষাকে কেন আলাদা চোখে দেখা হবে? যৌনতা যেহেতু মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়, তাই এটিকে এক পক্ষের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
মেয়েকে লজ্জা নয়, বোঝাপড়া শেখাতে চান
এখন মা হওয়ার পর নিজের মেয়েকে যৌনতা ও শরীর সম্পর্কে কীভাবে শেখাবেন, সেটিও ভাবছেন রাধিকা। তিনি চান না বড় হতে গিয়ে তাঁর মেয়ে নিজের স্বাভাবিক কৌতূহল বা আকাঙ্ক্ষাকে লজ্জার বিষয় হিসেবে ভাবুক।
একটি বইয়ে পড়া একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন অভিনেত্রী। সেখানে লেখক তাঁর শৈশবের একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন। নিজের শরীর সম্পর্কে জানতে গিয়ে বাবার কাছে ধরা পড়ার পর তিনি বকুনি খেয়েছিলেন। সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত লজ্জাবোধ দীর্ঘদিন তাঁর মনে থেকে গিয়েছিল।
রাধিকা বলেন, নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে তিনি এমনটা করতে চান না। তাঁর মেয়ে যখন নিজের শরীর ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জানতে শুরু করবে, তখন সে যেন সেটিকে লজ্জার বিষয় হিসেবে না দেখে, সেদিকেই নজর রাখবেন রাধিকা।
‘শুধু যৌনতা নয়, নিজের ভেতরের কণ্ঠও’
রাধিকার মতে, যৌনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাবের প্রভাব শুধু নারীর ওপর পড়ে না; পুরুষেরাও এর শিকার হন। সমাজে যৌনতা নিয়ে নানা ধরনের ধারণা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে নারী-পুরুষ উভয়েরই নিজের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হয়।
হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে