যৌনতার গল্প বলা এখনো ডিমের ওপর হাঁটার মতো: রাধিকা আপ্তে
প্রেম, সম্পর্ক, যৌনতা ও নারীর আকাঙ্ক্ষা—ভারতীয় সিনেমায় এসব বিষয় নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি গল্প হচ্ছে। বিশেষ করে নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু সিনেমা ও সিরিজ তৈরি হয়েছে। তবু এই জায়গায় কাজ করতে গিয়ে এখনো নির্মাতাদের অনেকটা ‘ডিমের ওপর হাঁটার’ মতো সাবধানে এগোতে হয় বলে মনে করেন অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তে।
রাধিকার মতে, মানুষ খুব দ্রুত কোনো কিছুতে আপত্তি জানায়। আর শিল্পের ক্ষেত্রে সেটিই বড় সমস্যা। কারণ, একজন শিল্পী কখনো কখনো বুঝতেই পারেন না, তাঁর তৈরি কোনো কাজ ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে কারও মনে আঘাত করেছে।
‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ মুক্তির আগে ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় সিনেমায় নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের গল্প বলার সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছেন রাধিকা। পাশাপাশি জানিয়েছেন, নতুন অ্যান্থলজিতে তাঁর চরিত্রের গল্প, সহশিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা এবং স্বামী ডেরেকের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নিয়েও।
‘মানুষ খুব দ্রুত ক্ষুব্ধ হয়ে যায়’
ভারতীয় সিনেমায় নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে—এমনটা মনে করেন রাধিকা। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কাজ করার সময় এখনো নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের সতর্ক থাকতে হয়।
রাধিকার ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, মানুষ খুব দ্রুত ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে আপনি যখন শিল্প তৈরি করছেন, তখন এটি বড় সমস্যা।’
রাধিকার মতে, কোনো শিল্পী এমন কিছু তৈরি করতে পারেন, যা কারও কাছে আপত্তিকর মনে হবে—কিন্তু কাজটি করার সময় শিল্পী নিজেও হয়তো বুঝতে পারবেন না যে সেটি কাউকে আঘাত করতে পারে।
এ সমস্যা শুধু যৌনতা বা যৌন আকাঙ্ক্ষার গল্পের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিনেতা ও তাঁদের কাজের সঙ্গে সমাজের তৈরি করা নৈতিকতার ধারণাও বড় ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন রাধিকা।
কারও ব্যক্তিগত ‘গ্রহণযোগ্যতা’র ধারণার সঙ্গে কোনো কিছু না মিললেই সেটিকে সমস্যা হিসেবে দেখা হতে পারে। আর সেই কারণেই শিল্পীদের অনেক সময় নিজের গল্প বলার সময়ও হিসাব করে এগোতে হয়।
দর্শক প্রস্তুত, বাধা অন্য জায়গায়
রাধিকা মনে করেন না যে দর্শক এসব গল্প দেখতে চান না। বরং দর্শক, অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা—সবাই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু অন্য কিছু সামাজিক ও নৈতিক চাপের কারণে এই পরিবর্তন সব সময় সহজে আসে না।
নারীর ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা কিংবা যৌনতার মতো বিষয় নিয়ে গল্প বলতে গিয়ে ‘মোরাল পুলিশিং’ এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করেন তিনি।
অর্থাৎ গল্পের বিষয়টি দর্শক গ্রহণ করবেন কি না, শুধু সেটিই প্রশ্ন নয়। তার আগে গল্পটি সমাজের প্রচলিত নৈতিকতার ধারণার সঙ্গে সংঘাতে যাচ্ছে কি না, সেটিও ভাবতে হয়।
‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’-এ রাধিকার গল্পে বিষাদ
নেটফ্লিক্সে আজ মুক্তি পাওয়া ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’-এ প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও জটিল সম্পর্কের চারটি গল্প রয়েছে। অ্যান্থলজিটির চারটি গল্প পরিচালনা করেছেন বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে, কিরণ রাও, শকুন বাত্রা ও বিশাল ভরদ্বাজ।
এই অ্যান্থলজিতে রাধিকা আপ্তের গল্পেও রয়েছে সম্পর্কের জটিলতা ও আবেগের টানাপোড়েন।
নিজের গল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাধিকা জানান, গল্পটির মধ্যে বিষাদও রয়েছে। চরিত্রগুলো নিজেদের অনুভূতিই ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না। কারণ, তাদের সামনে অনেক কিছু হারানোর বা বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘এটার মধ্যে একটা ট্র্যাজেডিও আছে,’—নিজের গল্প সম্পর্কে বলেন রাধিকা।
তবে গল্পটির কেন্দ্রীয় জায়গায় রয়েছে চরিত্রগুলোর বন্ধুত্ব। তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও বন্ধুত্বই শেষ পর্যন্ত গল্পটিকে ধরে রাখে।
এই কাজের মাধ্যমে আবারও বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে রাধিকার। পাশাপাশি অভিনয় করেছেন কঙ্কনা সেন শর্মা ও বিজয় ভার্মা। তাঁদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাকে তিনি দারুণ উপভোগ করেছেন।
রাধিকার ভাষায়, পুরো অভিজ্ঞতাটিই ছিল ‘একটি দারুণ আনন্দের ব্যাপার’।
সম্পর্কে নিরাপত্তা থাকলে জায়গাও তৈরি হয়
সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন রাধিকা। স্বামী ডেরেকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও একে অপরকে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে কাজ করে, সেটিও জানিয়েছেন তিনি।
সাধারণত সম্পর্কের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত জায়গা বা স্পেস পেতে হলে সেটি আলাদা করে দাবি করতে হয়—এমন ধারণা প্রচলিত। কিন্তু রাধিকার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন।
রাধিকার মতে, তাঁদের সম্পর্কে একে অপরকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়াটাই স্বাভাবিকভাবে আরও বেশি স্বাধীনতার জায়গা তৈরি করেছে।
তাঁদের সম্পর্কে ঈর্ষার জায়গা নেই বলেও জানান রাধিকা। কারণ, দুজনই জানেন যে প্রয়োজন হলে নিজেদের চাহিদার কথা একে অপরকে বলতে পারবেন। রাধিকার কাছে মানসিক নিরাপত্তাই হয়ে উঠেছে সঙ্গী হিসেবে পথচলা এবং ব্যক্তিগত পরিসর—দুটোর ভিত্তি।
এনডিটিভি অবলম্বনে