যৌনতা, ব্যক্তিজীবন ও বিতর্ক—ওটিটিতে দর্শকের মনোযোগের নতুন অস্ত্র
একদিকে সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা ও যৌনতার গল্প; অন্যদিকে ক্যামেরার সামনে তারকাদের ব্যক্তিজীবন, ঝগড়া, প্রেম, বিচ্ছেদ, কান্না কিংবা বিতর্কিত মন্তব্য। বিনোদনের পর্দায় এসব নতুন নয়। নতুন হলো এগুলো ব্যবহারের ধরন। সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, রিয়েলিটি শো, ডেটিং শো কিংবা কমেডি অনুষ্ঠান–ঘরানা আলাদা হলেও লক্ষ্য যেন একটাই, দর্শকের চোখ যতক্ষণ সম্ভব পর্দায় আটকে রাখা।
সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উদাহরণ ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’। নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় অ্যান্থলজি সিরিজটির তৃতীয় কিস্তির ট্রেলার প্রকাশের পর আবারও আলোচনায় এসেছে যৌনতা, নারীর আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের জটিলতা। বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে, কিরণ রাও, শকুন বাত্রা ও বিশাল ভরদ্বাজ—চার নির্মাতার চার গল্পে ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ও দমিত ইচ্ছাকে দেখা হবে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। সিরিজটি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়ার কথা ১৮ সেপ্টেম্বর।
ট্রেলারে অদিতি রাও হায়দারির একটি সংলাপও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নারীর আকাঙ্ক্ষাকে তিনি বাতির সুইচের মতো সরল কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে তুলে ধরেছেন জটিল ও আবেগনির্ভর অভিজ্ঞতা হিসেবে। ফলে ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’ শুধু যৌনতার গল্প নয়; নারীর ইচ্ছা, সম্পর্ক ও ক্ষমতার সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
যৌনতা এখন গল্পের পাশাপাশি বিপণনের অস্ত্র
সিনেমায় যৌনতা নতুন কোনো বিষয় নয়। হলিউড, ইউরোপীয় সিনেমা কিংবা ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্র—বহু বছর ধরেই যৌনতা গল্প বলার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরিবর্তন এসেছে মূলত ডিজিটাল যুগে।
আগে একটি সিনেমা নিয়ে আলোচনা তৈরি করতে পোস্টার, গান, ট্রেলার কিংবা সংবাদ সম্মেলন ছিল প্রচারের প্রধান হাতিয়ার। এখন একটি সংলাপ, কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য কিংবা বিতর্কিত কোনো মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেই মুহূর্তে তৈরি হয় আলোচনা।
‘লাস্ট স্টোরিজ’ ফ্র্যাঞ্চাইজি এর ভালো উদাহরণ। ২০১৮ সালে প্রথম কিস্তি মুক্তির পর ভারতীয় মূলধারার বিনোদনে যৌনতা, সম্পর্ক ও নারীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০২৩ সালে আসে দ্বিতীয় কিস্তি। তৃতীয় কিস্তিতেও সেই ধারাই বজায় রয়েছে। ফলে যৌনতা এখানে শুধু গল্পের বিষয় নয়, দর্শকের আগ্রহ তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তবে যৌনতা ব্যবহারের অর্থ সব সময় সস্তা চমক নয়। ভালোভাবে ব্যবহার করা হলে এটি সম্পর্ক, বিবাহ, ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনার দরজা খুলতে পারে। সমস্যা হয় তখন, যখন গল্পের চেয়ে যৌনতার উপস্থিতিই বড় হয়ে ওঠে।
বিতর্ক যখন নিজেই বিনোদন
রিয়েলিটি শোয়ে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। এখানে চরিত্রগুলো কাল্পনিক নয়। বাস্তব মানুষই হয়ে ওঠেন অনুষ্ঠানের কনটেন্ট। তাঁদের পছন্দ–অপছন্দ, প্রেম, রাগ, কান্না, ঝগড়া, ভুল মন্তব্য—সবকিছুই দর্শকের বিনোদনের উপাদান।
‘বিগ বস’–এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। ২০তম মৌসুমেও ছবিটি খুব একটা বদলায়নি। প্রতিযোগীদের ঝগড়া, ব্যক্তিগত মন্তব্য, শরীর নিয়ে কটাক্ষ কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়মিতই আলোচনায় আসছে। এক পর্বে আসিফ খান ও কাজি তৌকিরের হাতাহাতিও আলোচনার বিষয় হয়। নারী প্রতিযোগীদের শরীর ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে মন্তব্য ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তবে রিয়েলিটি শোয়ের বিতর্ক সব সময় নেতিবাচক নয়। কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই অনুষ্ঠানের আলোচনাকে বড় সামাজিক প্রশ্নে নিয়ে যায়। ‘বিগ বস ২০’–এর প্রতিযোগী আম্রপালি দুবে যেমন বলেছেন, সমাজে নারীর প্রায় সব কাজই কোনো না কোনোভাবে বিচার করা হয়। তাঁর বক্তব্য ব্যক্তিগত জীবন থেকে আলোচনাকে সরিয়ে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নে নিয়ে গেছে।
অর্থাৎ বিতর্ক নিজেই সমস্যা নয়। প্রশ্ন হলো, বিতর্কটি কি কোনো অর্থপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিচ্ছে, নাকি কেবল কয়েক ঘণ্টার ভাইরাল কনটেন্ট তৈরি করছে?
কতটা বাস্তব এই ‘রিয়েলিটি’?
নাম রিয়েলিটি শো হলেও এসব অনুষ্ঠান কখনোই পুরোপুরি বাস্তব নয়। ক্যামেরা কোথায় থাকবে, কোন ঘটনা দেখানো হবে, কোন অংশ বাদ যাবে, কোন মুহূর্তকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে—সবকিছুর পেছনেই থাকে নির্মাতাদের সিদ্ধান্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রিয়েলিটি টেলিভিশনে এই নির্মাণপ্রক্রিয়াকে আরও প্রকাশ্য করে তোলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দর্শক যে ‘বাস্তবতা’ দেখছেন, সেটিও আসলে সম্পাদিত ও নির্মিত একটি বাস্তবতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই সীমারেখা আরও ঝাপসা হয়েছে।
একজন তারকা প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে পোস্ট করলেন, কেউ বিচ্ছেদের খবর জানালেন, কেউ বিতর্কিত মন্তব্য করলেন—কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটি হয়ে গেল সংবাদ। এরপর সেই সংবাদ থেকে তৈরি হলো ভিডিও, রিল, মিম ও পোস্ট। আবার সেই আলোচনাই কাজে লাগল সিনেমা বা অনুষ্ঠানের প্রচারণায়।
ফলে তারকার ব্যক্তিজীবনও এখন কনটেন্ট।
প্রেমও যখন প্রতিযোগিতা
এই প্রবণতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র ডেটিং রিয়েলিটি শো। ‘লাভ ইজ ব্লাইন্ড’, ‘দ্য আলটিমেটাম’, ‘পারফেক্ট ম্যাচ’ কিংবা বিভিন্ন দেশের ডেটিং শোতে প্রেমকে শুধু গল্প হিসেবে দেখানো হয় না; সেটিকে বানানো হয় প্রতিযোগিতা।
কার সঙ্গে কার সম্পর্ক হবে? কে কাকে বেছে নেবে? কে কাকে ছেড়ে যাবে? কে বিয়ে করবে? কে প্রতারণা করবে? শেষ পর্যন্ত কে একা থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে দর্শক পরের পর্বে যান।
ডেটিং শোগুলোর জনপ্রিয়তা দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত সম্পর্কও এখন বিনোদনের কাঠামোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে পরিণত হতে পারে। এমনকি প্রেমের মতো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও দর্শককে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
নতুন ব্রিটিশ ডেটিং রিয়েলিটি শো ‘উইল ইউ ম্যারি মি?’–তে দর্শক ভোটের মাধ্যমে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত কার কাছে বিয়ের প্রস্তাব যাবে, সেটিও দর্শকের অংশগ্রহণে নির্ধারিত হওয়ার কথা।
অর্থাৎ দর্শক আর শুধু দর্শক থাকছেন না। তিনি হয়ে উঠছেন সম্পর্কের বিচারক।
কমেডিতেও বিতর্কের টান
রিয়েলিটি শো কিংবা যৌনতার গল্পের বাইরে কমেডি অনুষ্ঠানও এই নতুন বিনোদন অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’–এর মতো অনুষ্ঠানে তারকাদের নিয়ে ঠাট্টা, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, অস্বস্তিকর প্রশ্ন কিংবা সীমা ছুঁয়ে যাওয়া রসিকতা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি দ্বিতীয় মৌসুমের একটি পর্বে বরুণ ধাওয়ানকে নিয়ে সময় রায়নার রসিকতাও আলোচনার বিষয় হয়েছে।
এখানেও সূত্রটি একই—যে মুহূর্ত নিয়ে দর্শক কথা বলবেন, সেটিই সফল মুহূর্ত।
এই জায়গায় ‘বিতর্ক’ আর নেতিবাচক শব্দ হিসেবে থাকছে না। এটি হয়ে উঠছে এনগেজমেন্টের মুদ্রা। কেউ প্রশংসা করলে আলোচনা বাড়ে, কেউ সমালোচনা করলেও বাড়ে। কেউ প্রতিবাদ করলেও ভিডিওর ভিউ বাড়ে।
অ্যালগরিদমও কি দায়ী
কিছুটা অবশ্যই। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাফল্যের বড় মাপকাঠি—দর্শক কতক্ষণ দেখছেন, কোথায় থামছেন, কী শেয়ার করছেন ও কী নিয়ে কথা বলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এমন কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষের আবেগকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়, সেটি আনন্দ হোক, রাগ, কৌতূহল কিংবা বিতর্ক।
ভাইরাল হওয়াই কি সাফল্য
একসময় সিনেমার সাফল্য বোঝা হতো বক্স অফিস দিয়ে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সাফল্য বোঝা হতো টিআরপি দিয়ে। এখন সেই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড, ভিডিওর ভিউ, মিম, হ্যাশট্যাগ, সার্চ, কমেন্ট ও অনলাইন বিতর্ক।
‘বিগ বস ২০’–এর সাম্প্রতিক দর্শক পরিসংখ্যানেও বদলে যাওয়া চিত্রটি দেখা যায়। অরম্যাক্স মিডিয়ার হিসাবে প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠানটি ৬৪ লাখ দর্শক পেয়েছে। একই সময়ে ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’–এর দ্বিতীয় মৌসুম ৭৮ লাখ দর্শক নিয়ে এগিয়ে ছিল। অর্থাৎ বড় তারকা ও বড় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ইউটিউবকেন্দ্রিক কনটেন্টও এখন একই দর্শকের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
আজকের দর্শক একসঙ্গে অনেক ধরনের গল্প দেখতে চান। একদিকে বড় বাজেটের সিনেমা, অন্যদিকে বাস্তব মানুষের জীবন নিয়ে রিয়েলিটি শো। কখনো সম্পর্কের গল্প, কখনো যৌনতা, কখনো সত্য ঘটনা, আবার কখনো তারকার ব্যক্তিজীবনের একঝলক।
ফলে সিনেমা, সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনের সীমানা আগের মতো স্পষ্ট নেই।
সিনেমার অভিনেতা রিয়েলিটি শোতে নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলছেন। রিয়েলিটি শোর প্রতিযোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে উঠছেন। ইনফ্লুয়েন্সারকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে রিয়েলিটি সিরিজ। আবার সেই সিরিজের ঘটনাই পরিণত হচ্ছে সংবাদে।
বাস্তব জীবন, সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদন—সবকিছু মিশে যাচ্ছে একই স্রোতে।
এ কারণেই ‘লাস্ট স্টোরিজ ৩’–এর মতো সিরিজে যৌনতা নিয়ে আলোচনা হোক, ‘বিগ বস’–এ তারকার ঝগড়া ভাইরাল হোক কিংবা কোনো কমেডি অনুষ্ঠানের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম হয়ে উঠুক—পেছনে কাজ করছে একই অর্থনীতি: মনোযোগের অর্থনীতি।
হিন্দুস্তান টাইমস, আইএমডিবি, ইন্ডিয়া টুডে ও পিংকভিলা অবলম্বনে