ইউসুফ খান থেকে কেন দিলীপ কুমার হয়েছিলেন তিনি
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে দিলীপ কুমার নামটি এক কিংবদন্তি। কিন্তু জন্মসূত্রে তাঁর নাম ছিল ইউসুফ খান। পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে স্ত্রী সায়রা বানু শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে ইউসুফ বলেই ডাকতেন। অথচ চলচ্চিত্রজীবনের শুরু থেকেই তিনি পরিচিত হন ‘দিলীপ কুমার’ নামে। কেন নিজের আসল নাম ব্যবহার করেননি? সে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তিনি নিজেই।
১৯৭০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিলীপ কুমার বলেছিলেন, ‘মার খাওয়ার ভয়েই আমি দিলীপ কুমার নামটি নিয়েছিলাম।’ সম্প্রতি সেই সাক্ষাৎকার আবার প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি। তার পর থেকেই নতুন করে আলোচনায় দিলীপ কুমারের নামবদলের গল্প।
বাবা ছিলেন চলচ্চিত্রের ঘোর বিরোধী
দিলীপ কুমারের বাবা লালা গুলাম সারওয়ার আলী খান চলচ্চিত্রজগৎ একেবারেই পছন্দ করতেন না। সিনেমায় অভিনয়কে তিনি সম্মানজনক পেশা মনে করতেন না। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু পৃথ্বীরাজ কাপুরের ছেলে অভিনয় করায়ও তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন।
সাক্ষাৎকারে দিলীপ কুমার স্মরণ করেন, তাঁর বাবা প্রায়ই বন্ধু লালা বশেশর নাথকে বলতেন, ‘তোমার সুস্থ-সবল ছেলেটা কী কাজ করছে দেখো!’
এ পরিবেশেই বড় হয়েছেন ইউসুফ খান। তাই নিজে যখন অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বাবার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভীত ছিলেন।
‘ইউসুফ খান নয়, অন্য যেকোনো নাম দিন’
দিলীপ কুমার বলেন, ‘আমি জানতাম, বাবা জানতে পারলে খুব রেগে যাবেন। তিনি ছিলেন খুবই কঠোর স্বভাবের পাঠান। তাই ভয় পেতাম।’
অভিনয়জীবন শুরুর সময় দিলীপের সামনে তিনটি নামের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল—ইউসুফ খান, দিলীপ কুমার ও বাসুদেব। তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু বলেছিলাম, ইউসুফ খান নামটা যেন না রাখা হয়। অন্য যেকোনো নাম চলবে।’
কয়েক মাস পর একটি সংবাদপত্রে নিজের প্রথম ছবির বিজ্ঞাপন দেখে তিনি জানতে পারেন, তাঁর নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘দিলীপ কুমার’।
প্রথম ছবির আগে বদলে যায় পরিচয়
১৯৪৪ সালে পরিচালক অমিয় চক্রবর্তীর ‘জোয়ার ভাটা’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। ছবিটি প্রযোজনা করেছিল তৎকালীন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান বম্বে টকিজ। সে ছবিতেই প্রথমবার পর্দায় ভেসে ওঠে ‘দিলীপ কুমার’ নামটি।
নামটি দিয়েছিলেন দেবিকা রানী
২০১৪ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘দ্য সাবট্যান্স অ্যান্ড দ্য শ্যাডো’-তে দিলীপ কুমার লিখেছেন, তাঁর নতুন নামের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অগ্রদূত অভিনেত্রী ও প্রযোজক দেবিকা রানী।
দেবিকা রানী দিলীপকে বলেছিলেন, ‘ইউসুফ, শিগগিরই তোমার অভিনয়জীবন শুরু হবে। আমার মনে হয়, তোমার একটি পর্দার নাম থাকা উচিত। এমন একটি নাম, যার সঙ্গে দর্শক সহজেই সংযোগ তৈরি করতে পারবেন এবং যা তোমার রোমান্টিক পর্দা-ইমেজের সঙ্গে মানানসই হবে।’
এরপর দেবিকা রানীই ‘দিলীপ কুমার’ নামটি প্রস্তাব করেন। দিলীপ কুমারেরও নামটি ভালো লেগেছিল। পরে সেই নামই হয়ে ওঠে ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি পরিচয়।
শৈশবের বন্ধু রাজ কাপুর, পর্দায় বাবা পৃথ্বীরাজ
মজার বিষয় হলো, দিলীপ কুমার ও পৃথ্বীরাজ কাপুর—দুজনেরই শিকড় ছিল বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ারে। পরে দুই পরিবারই মুম্বাইয়ে চলে আসে। পৃথ্বীরাজ কাপুরের বড় ছেলে রাজ কাপুর ছিলেন দিলীপ কুমারের শৈশবের বন্ধু।
পরে কে আসিফ পরিচালিত কালজয়ী ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’–এ (১৯৬০) পৃথ্বীরাজ কাপুর সম্রাট আকবরের চরিত্রে এবং দিলীপ কুমার যুবরাজ সেলিমের চরিত্রে অভিনয় করেন। বাস্তব জীবনে বাবার অভিনয়ে আপত্তি থাকলেও পর্দায় তিনি পেয়েছিলেন আরেক কিংবদন্তি ‘বাবা’কে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে