৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরিজীবী থেকে ১০০ কোটির সিনেমার নায়ক
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় এমন অনেক তারকা আছেন, যাঁদের ক্যারিয়ার শুরুই হয়েছিল রুপালি পর্দার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু কার্থির গল্পটা আলাদা। তিনি সিনেমায় এসেছিলেন প্রায় দুর্ঘটনাবশত। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া, মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকার চাকরি, নিউইয়র্কে ডিজাইন ফার্মে রাতভর কাজ—এসব পেরিয়ে একসময় তিনি হয়ে উঠেছেন তামিল সিনেমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তারকাদের একজন।
চলচ্চিত্র পরিবার থেকে যাত্রা
কার্থির জন্ম চলচ্চিত্র পরিবারে। তাঁর বড় ভাই সুরিয়া তখন ইতিমধ্যেই তামিল সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক। বাবা শিবকুমারও ছিলেন অভিনেতা। ফলে সিনেমার জগৎ তাঁর অচেনা ছিল না। কিন্তু কার্থির নিজের পরিকল্পনা ছিল একেবারেই অন্য রকম।
চেন্নাইয়ের একটি কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে তিনি চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু মাসে পাঁচ হাজার টাকার সেই চাকরি তাঁকে খুব দ্রুতই ক্লান্ত করে তোলে। একই রুটিন, একই ডেস্ক—সবকিছু যেন একঘেয়ে লাগতে শুরু করে।
এরপরই জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেন কার্থি। উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর ভেতরের সৃজনশীল মানুষটা যেন নতুন করে জেগে ওঠে।
সিনেমায় আগ্রহ
পড়াশোনার পাশাপাশি একটি ডিজাইন ফার্মে পার্টটাইম কাজ করতেন তিনি। রাত চারটা পর্যন্ত অফিসে বসে কাজ করার ঘটনাও আছে তাঁর জীবনে। পরে এক সাক্ষাৎকারে কার্থি বলেছিলেন, অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী অবাক হয়ে দেখেছিলেন—এত রাতেও একজন কর্মী ডেস্কে বসে কাজ করছেন!
এই সময়টাতেই সিনেমার প্রতি তাঁর আগ্রহ গভীর হতে শুরু করে। অভিনয় নয়, বরং পরিচালনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ তাঁকে বেশি টানত। দেশে ফিরে তিনি কিংবদন্তি নির্মাতা মণি রত্নমের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ‘আয়ুথা এঝুনথু’ এবং এর হিন্দি সংস্করণ ‘যুবা’র পোস্ট-প্রোডাকশনেও যুক্ত ছিলেন।
সেখানেই তিনি কাছ থেকে দেখেন সিনেমা তৈরির জাদু। সিনেমাটোগ্রাফার রবি কে চন্দ্রন ও প্রোডাকশন ডিজাইনার সাবু সাইরিলের কাজ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ক্যামেরার সামনে
তবে ভাগ্য তাঁকে ক্যামেরার পেছনে থাকতে দেয়নি। পরিচালক আমির যখন ‘পারুথিভিরান’-এর জন্য তাঁকে প্রস্তাব দেন, তখনো কার্থি নিজেকে অভিনেতা হিসেবে ভাবেননি। কিন্তু ভাই সুরিয়া আগেই ছবির গল্প শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজি হন কার্থি।
গ্রামের রুক্ষ যুবকের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেন তিনি। ভাষা, শরীরী ভঙ্গি, হাঁটাচলা—সবকিছুতে আলাদা প্রস্তুতি নেন। ছবিটি মুক্তির পর দর্শক প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তিনি সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে বসে সিনেমা দেখেছিলেন। ক্লাইমেক্স শেষে পুরো হল দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিল। কার্থি নাকি তখন আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন।
প্রথম ছবিতেই জাতীয় পুরস্কারজয়ী পারফরম্যান্সের মতো প্রশংসা পান তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
তারকাখ্যাতি পাওয়া
‘আইরাথিল অরুভান’, ‘মাদ্রাজ’, ‘থিরান’—একটার পর একটা ভিন্নধর্মী ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজেকে আলাদা করে তুলেছেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ‘কাইথি’ দিয়ে।
পরিচালক লোকেশ কঙ্গরাজের এই সিনেমায় ছিল না কোনো গান, ছিল না নায়কের প্রচলিত নাচ-গান বা রোমান্স। তবু ছবিটি বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির বেশি আয় করে। ‘কাইথি’ শুধু বক্স অফিস সাফল্যই নয়, কার্থিকে প্যান-ইন্ডিয়া তারকায় পরিণত করে। কার্থির বিশেষত্ব হলো তিনি কখনো শুধু তারকাখ্যাতির পেছনে ছোটেননি। বরং গল্প ও চরিত্রকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর অভিনয়ে একধরনের স্বাভাবিকতা আছে, যা দর্শকদের কাছে তাঁকে আলাদা করে তোলে।
কার্থি এখন
কার্থিকে চলতি বছর দেখা গেছে ‘ভা ভাথিয়ার’ সিনেমায়। এ ছাড়া মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘সর্দার ২’। এ ছাড়া ‘হিট’ ফ্র্যাঞ্চাইজিসহ আরও বেশ কয়েকটি নতুন সিনেমায় দেখা যাবে তাঁকে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে