মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বিজয়ের চমক, সিনেমার জন্য কী পদক্ষেপ নিলেন তিনি

বিজয়। এএনআই

তামিল সিনেমার সঙ্গে রাজনীতি, তারকাপূজা আর ভোররাতের ‘ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো’ সংস্কৃতি বহু দশকের পুরোনো। সেই সংস্কৃতিতেই এবার বড় পরিবর্তন আনলেন তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ বিজয়। নতুন নিয়মে মুক্তির প্রথম সাত দিন তামিল সিনেমা দিনে পাঁচটি শো চালানোর অনুমতি পাবে। তবে ভোররাতের শো নিষিদ্ধই থাকছে।

এই সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে এর পেছনে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ বিতর্ক—তা এখন দক্ষিণি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

কী বদলাল নতুন নিয়মে
বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই গত ২৫ মে তামিলনাড়ু সরকার নতুন নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল ছবির ক্ষেত্রে রাজ্যের সব প্রেক্ষাগৃহ প্রথম সাত দিন দিনে পাঁচটি শো চালাতে পারবে। আগে এর জন্য আলাদা সরকারি অনুমতি নিতে হতো।

পুরোনো নিয়ম অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর সিনেমা হলে সাধারণত দিনে চারটি শো চালানোর অনুমতি ছিল। বিশেষ উৎসব বা সরকারি ছুটির দিনে পঞ্চম শো চালাতে আলাদা অনুমতি প্রয়োজন হতো। ফলে বড় বাজেটের ছবির মুক্তির আগে প্রযোজক, পরিবেশক ও হলমালিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের এ সিদ্ধান্তে তাই স্বস্তি পেয়েছে পুরো ইন্ডাস্ট্রি। অভিনেতা বিশালসহ অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তামিল সিনেমায় ‘ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

তামিলনাড়ুতে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, অনেক সময় ধর্মীয় উৎসবের মতো আবেগের বিষয়। বিশেষ করে রজনীকান্ত, অজিত কুমার, বিজয় বা কমল হাসানের সিনেমা মুক্তি মানেই উৎসবের আমেজ।

একসময় প্রেক্ষাগৃহে শো শুরু হতো দুপুর বা বিকেল থেকে। পরে মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি আসার পর ভোর ৫টা, এমনকি রাত ১টার শো-ও চালু হয়। ভক্তরা প্রিয় তারকার সিনেমা সবার আগে দেখার জন্য রাতভর লাইনে দাঁড়াতেন।

সিনেমা হলের বাইরে আতশবাজি ফোটানো, বিশাল কাটআউটে দুধ ঢালা, নাচ-গান—এসব ছিল সাধারণ দৃশ্য। প্রথম দিনের প্রথম শো যেন সিনেমা দেখার চেয়ে বড় এক সামাজিক অভিজ্ঞতা।

থালাপতি বিজয়
ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘থুনিভু’–‘ভারিসু’ আর এক মৃত্যুর পর সব বদলে যায়
২০২৩ সালের পঙ্গল উৎসবে মুক্তি পেয়েছিল ‘থানিভু’ ও ‘ভারিসু। একদিকে অজিত, অন্যদিকে বিজয়—দুই সুপারস্টারের ছবি ঘিরে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে।
‘থুনিভু’র কিছু শো শুরু হয়েছিল রাত একটায়, আর ‘ভারিসু’র ভোর চারটায়। কিন্তু উৎসবের আবহ ট্র্যাজেডিতে বদলে যায়, যখন অজিতের এক ভক্ত মারা যান। এর আগেও তারকাদের কাটআউট ভেঙে পড়া, ভক্তদের সংঘর্ষ, জনসম্পত্তি নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল।

এরপরই তামিলনাড়ু সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। ভোররাতের শো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি সিনেমা হলের বাইরে দুধ ঢালার মতো উন্মাদনাতেও নিষেধাজ্ঞা আসে।

কেন ইন্ডাস্ট্রি ক্ষুব্ধ ছিল
ভোররাতের শো বন্ধ হওয়ার পর বড় ছবির আয়েও প্রভাব পড়ে। কারণ, মুক্তির প্রথম সপ্তাহই একটি ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সময়।

ভারতের অন্য রাজ্যে যেখানে সকাল ৫টা বা ৬টার শো চালানো হচ্ছিল, সেখানে তামিলনাড়ুতে প্রথম শো সাধারণত সকাল ৯টা বা ১০টার আগে শুরু করা যেত না।
প্রযোজকদের অভিযোগ ছিল, এতে রাজ্যের দর্শকেরাই নিজেদের প্রিয় তারকার ছবি সবার পরে দেখছেন। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছিল আয়ও।

থালাপতি বিজয়
ইনস্টাগ্রাম থেকে

বিজয়ের সিদ্ধান্তে কী সুবিধা হবে
নতুন নিয়মে দিনে একটি অতিরিক্ত শো মানে শত শত প্রেক্ষাগৃহে হাজার হাজার বাড়তি দর্শক। এতে প্রযোজক, পরিবেশক ও হলমালিক—সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখন আর প্রতি সিনেমার জন্য সরকারের কাছে অনুমতি চাইতে হবে না। ফলে মুক্তির আগের প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমবে।
তবে ভোররাতের শো এখনো ফিরছে না

অনেকেই ভেবেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিজয় হয়তো আবার ৪টা বা ৫টার শো ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু আপাতত সে পথে হাঁটছে না সরকার।

নতুন নিয়মে শুধু শোর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, সময় নয়। অর্থাৎ প্রথম শো এখনো সকাল ৯টার আগেই শুরু করা যাবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার একদিকে ইন্ডাস্ট্রিকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে চাইছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়টিও মাথায় রাখছে।

আরও পড়ুন

কেন এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ
বিজয় নিজে ৩৩ বছর তামিল সিনেমার অন্যতম বড় তারকা ছিলেন। ফলে ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা তিনি খুব কাছ থেকে জানেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রযোজক ও হলমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেকের কাছেই ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন, পুরোনো উন্মাদনা ফিরলেও তা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।

তাই আপাতত তামিল সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি পেয়েছে ‘পাঁচ শো’র স্বস্তি, কিন্তু ‘ভোররাতের উন্মাদনা’ এখনো অপেক্ষাতেই রয়ে গেল।

ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে