‘কুৎসিত বোন’ তকমা, চরম অপমান সহ্য করেও জাতীয় পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি
বলিউডে অনেকেই তারকা পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিতি পান, কিন্তু সেই পরিচয়ই কখনো কখনো হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বোঝা। এমনই এক গল্প অভিনেত্রী ও কস্টিউম ডিজাইনার সিম্পল কাপাডিয়ার। তিনি ছিলেন ডিম্পল কাপাডিয়ার ছোট বোন ও রাজেশ খান্নার শ্যালিকা। অভিনয়ে বড় সাফল্য না পেলেও পরবর্তী সময়ে কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে জিতে নেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তবে সেই পথ ছিল অপমান, তুলনা ও ব্যক্তিগত সংগ্রামে ভরা।
১৯৭৩ সালে ‘ববি’ দিয়ে ডিম্পল কাপাডিয়ার বিস্ফোরক অভিষেকের পর গোটা দেশ যখন তাঁর সৌন্দর্য ও অভিনয়ে মুগ্ধ, তখন সিম্পল ছিলেন বোর্ডিং স্কুলের ছাত্রী। পরে ১৯৭৭ সালে পরিচালক শক্তি সামন্তর ‘অনুরোধ’ ছবির মাধ্যমে তারও অভিষেক হয়। কাকতালীয়ভাবে ছবির নায়ক ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি রাজেশ খান্না।
অভিষেক ছবির শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা অবশ্য সুখকর ছিল না। ১৯৮৬ সালে সাংবাদিক সুস্মিতা রায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিম্পল অভিযোগ করেন, রাজেশ খান্না তাঁকে ‘কাচরা’ বা আবর্জনার মতো ব্যবহার করতেন। নতুন শিল্পী হওয়ায় তিনি ভীষণ নার্ভাস ছিলেন, কিন্তু রাজেশ সংলাপের মহড়া পর্যন্ত দিতেন না। সহযোগিতা না পেয়ে একদিন তিনি কান্নার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।
পরিস্থিতি দেখে পরিচালক শক্তি সামন্ত হস্তক্ষেপ করেন। সিম্পলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজেশ খান্নাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন—তিনি যত বড় সুপারস্টারই হোন না কেন, নতুন শিল্পীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতেই হবে। এরপর বাধ্য হয়েই রাজেশ নিজের আচরণ বদলান।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কও খুব একটা উষ্ণ ছিল না। সিম্পল বলেছিলেন, ডিম্পলের বিয়ের পর তিনি একই বাড়িতে থাকলেও রাজেশের সঙ্গে কখনোই তাঁর বোঝাপড়া তৈরি হয়নি। তাঁকে তিনি ‘বোঝা কঠিন একজন মানুষ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
‘অনুরোধ’ বক্স অফিসে ব্যর্থ হওয়ার পর শুরু হয় আরেক দফা মানসিক চাপ। ডিম্পলের সঙ্গে তাঁর সৌন্দর্যের তুলনা করা হতে থাকে। অনেকেই তাঁকে ‘কুৎসিত বোন’ বলে বিদ্রূপ করেন। এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে সিম্পল বলেছিলেন, ডিম্পল যে অসাধারণ সুন্দর, তা তিনি জন্ম থেকেই জানেন। কিন্তু একটি ছবির ব্যর্থতার জন্য শুধু চেহারাকে দায়ী করা অর্থহীন।
সিম্পল আরও স্বীকার করেছিলেন, অভিনয় নিয়ে কখনোই খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না। মূলত অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই সিনেমায় এসেছিলেন। প্রায় ২৫টি ছবিতে অভিনয়ের পর তিনি অভিনয় ছেড়ে কস্টিউম ডিজাইনের দিকে মন দেন।
ডিম্পল কাপাডিয়ার প্রত্যাবর্তনের সময় থেকেই তাঁর পোশাকের নকশা করতে শুরু করেন সিম্পল। ধীরে ধীরে তিনি শ্রীদেবী, মাধবীসহ আরও অনেক অভিনেত্রীর কস্টিউম ডিজাইন করেন। ১৯৯৪ সালে ‘রুদালি’ ছবির জন্য সেরা পোশাক পরিকল্পনায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিজের নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ‘ডর’, ‘বরসাত’, ‘চাচি ৪২০’, ‘দ্য হিরো: লাভ স্টোরি অব আ স্পাই, ‘সোচা না থা’সহ একাধিক ছবিতে কাজ করেন।
ডিম্পল কাপাডিয়াও বহুবার বলেছেন, তাঁর চলচ্চিত্রজীবনে সিম্পলের অবদান ছিল অপরিসীম। ২০২৪ সালে ভোগকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর প্রায় সব ছবির পোশাকই ডিজাইন করতেন সিম্পল, যা তাঁকে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করত।
ব্যক্তিগত জীবনেও সিম্পলের অগ্রাধিকার ছিলেন তাঁর বড় বোন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি মজা করে বলেছিলেন, যদি বিয়ে করেন, তাহলে এমন কাউকেই করবেন, যাঁর বাড়ি ডিম্পলের বাড়ির কাছাকাছি এবং যিনি ডিম্পলের সঙ্গে সময় কাটাতে আপত্তি করবেন না।
১৯৯২ সালে তিনি রাজিন্দর সিং শেঠিকে বিয়ে করেন। পরে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। তাঁদের ছেলে করণ কাপাডিয়া পরবর্তী সময়ে বলিউডে অভিনয়ে আসেন।
দীর্ঘ তিন বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর ২০০৯ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে মারা যান সিম্পল কাপাডিয়া। জীবনের শুরুতে ‘কুৎসিত বোন’ কিংবা ‘অযোগ্য অভিনেত্রী’ তকমা পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজস্ব প্রতিভায় বলিউডে স্থায়ী সম্মান অর্জন করেছিলেন—অভিনেত্রী হিসেবে নয়, একজন সফল কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে