ছবির শিশুটি এখন আলোচিত নায়িকা, ৭৮ কোটি টাকার মালিক

শৈশবে মৌনী রায়। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর বলিউড অভিনেত্রী মৌনী রায়ের জন্মদিন। ১৯৮৫ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে জন্ম তাঁর। ৪১ বছরে পা দেওয়া এই অভিনেত্রীকে এখন বলিউডের পরিচিত মুখ হিসেবে দেখা হলেও তাঁর তারকাখ্যাতির শুরু টেলিভিশনে। একসময় ‘কৃষ্ণ তুলসী’ চরিত্রে ঘরে ঘরে পরিচিতি পাওয়া মৌনী পরে ‘সতী’, ও ‘জুনুন’ চরিত্রে নিজের অভিনয়ের ভিন্ন ভিন্ন দিক দেখিয়েছেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ‘নাগিন’ দিয়ে। সেখান থেকেই টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী থেকে বলিউডের দৌড়ে ঢুকে পড়েন তিনি।

ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি মৌনীর ব্যক্তিজীবনও বারবার আলোচনায় এসেছে। প্রেম, বিয়ে, ২০২৬ সালে স্বামী সুরজ নাম্বিয়ারের সঙ্গে আলাদা হয়ে যাওয়া, বিচ্ছেদ ঘিরে নানা গুঞ্জন, বন্ধুত্ব নিয়ে জল্পনা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনও কম নাটকীয় নয়। এর মধ্যেই অভিনয়, নাচ, বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে নিজের আলাদা আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই অভিনেত্রী।

নাচ থেকে অভিনয়ে
অভিনেত্রী হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই যে মৌনী মুম্বাইয়ে এসেছিলেন, তা নয়। দিল্লির মিরান্ডা হাউস থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। পরে গণযোগাযোগের পড়াশোনাও শুরু করেন। কিন্তু অভিনয়ের সুযোগ আসার পর বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে মৌনী জানিয়েছেন, প্রায় ১৯ বছর আগে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মূলত গ্রীষ্মকালীন কাজের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনয়ে জড়িয়ে পড়েন।

এর আগে ২০০৪ সালের ‘রান’ সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড নৃত্যশিল্পী হিসেবেও দেখা গিয়েছিল মৌনীকে। তবে অভিনয়ে আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয় ২০০৬ সালে একতা কাপুরের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কিউকি সাস ভি কভি বহু থি’ দিয়ে। সেখানে কৃষ্ণ তুলসীর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। চরিত্রটি তাঁকে টেলিভিশন দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে।

‘দেবো কে দেব মহাদেব’ থেকে তারকা
এরপর ‘দেবো কে দেব মহাদেব’-এ সতীর চরিত্রে অভিনয় করে আরও বড় পরিচিতি পান মৌনী। মোহিত রায়নার সঙ্গে তাঁর জুটি তখন দর্শকের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়। এরপর ‘জুনুন-আইসি নফরত তো ক্যায়সা ইশক’-এও অভিনয় করেন তিনি। টেলিভিশনে একের পর এক চরিত্র বদলে নিজের জায়গা শক্ত করছিলেন মৌনী।
২০১৪ সালে ‘ঝলক দিখলা যা’–তেও অংশ নেন মৌনী। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর নাচের দক্ষতা যে ক্যারিয়ারে বড় ভূমিকা রেখেছে, সেখানেও তার প্রমাণ মেলে।
‘নাগিন’ বদলে দেয় সবকিছু

২০১৫ সালে আসে সেই চরিত্র, যা মৌনী রায়ের ক্যারিয়ারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় ‘নাগিন’। সিরিয়ালটিতে তাঁর অভিনয় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। অতিপ্রাকৃত কাহিনির এ ধারাবাহিকের সাফল্যের পর তিনি ‘নাগিন ২’-এও অভিনয় করেন।

চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন মৌনীকে ‘নাগিন’-এর সঙ্গে এক করে দেখা হয়েছে। একদিকে এটি তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা দেয়, অন্যদিকে এই পরিচয়ই পরবর্তী সময়ে বলিউডে নিজের অভিনয়ক্ষমতা প্রমাণের ক্ষেত্রে তাঁর জন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

মৌনী রায়। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

বলিউডে প্রথম বড় সুযোগ
২০১৮ সালে ‘গোল্ড’ দিয়ে বলিউডে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন মৌনী। অক্ষয় কুমারের বিপরীতে অভিনয় করা ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল মোনোবিনা দাস। এই ছবির মধ্য দিয়ে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ থেকে বলিউড অভিনেত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

এরপর ‘রোমিও আকবর ওয়াল্টার’, ‘মেড ইন চায়না’, ‘লন্ডন কনফিডেনশিয়াল’, ‘ভেলে’, ‘দাবাং ৩’সহ বেশ কিছু সিনেমা ও প্রকল্পে কাজ করেন। তবে সব ছবি তাঁকে সমান সাফল্য এনে দেয়নি।

‘ব্রহ্মাস্ত্র’ দিয়ে নতুন করে নজরে
মৌনীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাগুলোর একটি ‘ব্রহ্মাস্ত্র: পার্ট ওয়ান-শিবা’। ২০২২ সালের এই ছবিতে রণবীর কাপুর ও আলিয়া ভাটের পাশাপাশি খল চরিত্র জুনুনে অভিনয় করেন তিনি।

‘নাগিন’-এর পর যে অতিপ্রাকৃত চরিত্রের সঙ্গে মৌনীর নাম বারবার জড়িয়ে যাচ্ছিল, ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ সেই পরিচিতিরই অন্য রূপ এনে দেয়। ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয় এবং তিনি আইফা পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। পাশাপাশি ফিল্মফেয়ারেও মনোনয়ন আসে।

তবে বলিউডে মৌনীর পথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে দ্য হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছিলেন, ‘ব্রহ্মাস্ত্র’-এর পরও অনেক জায়গায় তাঁর নাম আলোচনায় আসত না। তাঁর দীর্ঘদিনের ‘নাগিন’ পরিচয় তাঁকে একধরনের ছকের মধ্যে আটকে রেখেছিল বলেও সেই সাক্ষাৎকারে উঠে আসে।

মৌনী রায়। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

বিয়ে করেছিলেন সুরজ নাম্বিয়ারকে
ব্যক্তিজীবনে মৌনী রায় বিয়ে করেন দুবাইভিত্তিক ব্যবসায়ী সুরজ নাম্বিয়ারকে। ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি গোয়ায় বিয়ে হয় তাঁদের। বিয়েতে ছিল বাঙালি ও মালয়ালি—দুই সংস্কৃতিরই আয়োজন।
বিয়ের আগে কয়েক বছর সম্পর্কে ছিলেন মৌনী ও সুরজ। বিয়ের পরও দুজনকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা গেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসাতেও একসঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা। ২০২২ সালে ‘আলটিমেট গুরু’ নামের একটি শিক্ষামূলক উদ্যোগ এবং ২০২৩ সালে মুম্বাইয়ে ‘বদমাশ’ নামে রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন তাঁরা।

চার বছরের মাথায় বিচ্ছেদ
২০২৬ সালে মৌনী ও সুরজের দাম্পত্য নিয়ে শুরু হয় জোর গুঞ্জন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে অনুসরণ না করার বিষয়টি সামনে আসার পর বিচ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে মৌনী সংবাদমাধ্যমকে ব্যক্তিগত জীবনে গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ করেছিলেন।

পরে মে মাসে দুজনই যৌথ বিবৃতিতে জানান, তাঁরা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মৌনী ও সুরজ বলেন, ব্যক্তিগত বিষয়টি তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেই এবং সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সামলাতে চান। একই সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ‘মনগড়া’ ও অতিরঞ্জিত তথ্য না ছড়ানোর অনুরোধও করেন।

আরও পড়ুন

বিচ্ছেদের পরও বিতর্ক থামেনি
বিচ্ছেদের খবর প্রকাশের পর মৌনীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন করে নানা আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অভিনেতা অর্জুন বিজলানির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়ায়। একসঙ্গে ডিনারে দেখা যাওয়ার পর সেই আলোচনা আরও বাড়ে।

অর্জুন অবশ্য বিষয়টিকে বন্ধুত্বের বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে দেখানো অপ্রয়োজনীয়। মৌনীকে নিয়ে ব্যক্তিগত ও ভিত্তিহীন মন্তব্য না করারও আহ্বান জানান তিনি।

মৌনী রায়
ইনস্টাগ্রাম থেকে

পাপারাজ্জিদের সঙ্গে বিবাদ
২০২৬ সালের জুলাইয়ে পাপারাজ্জিদের সঙ্গেও আলোচনায় আসেন মৌনী। মুম্বাইয়ে বন্ধু অনুষা দান্ডেকরের সঙ্গে রাতের খাবার শেষে বের হওয়ার সময় তাঁকে ছবি তুলতে থাকা আলোকচিত্রীদের থামতে বলেন তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে একটি বার্তাও দেন, যদিও সেটি পরে মুছে ফেলেন। ঘটনাটি নিয়ে অনলাইনে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

এর আগেও মৌনীর পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি নিয়ে নানা সময় আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি বরাবরই নিজের ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে সচেতন থাকার কথা জানিয়েছেন।

সম্পদের পরিমাণ কত?
বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, মৌনীর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬৫ কোটি রুপি (৭৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা)। অভিনয় ছাড়াও বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান, সংগীতচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে তাঁর আয় আসে বলে এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানিকন্ট্রোল জানিয়েছে, বিভিন্ন সিনেমা, উপস্থিতি ও সংগীতচিত্রের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ১০ লাখ থেকে প্রায় ১ কোটি রুপি পর্যন্ত।

টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে