‘আমি নগ্ন ছিলাম না’, বিতর্কিত সেই ফটোশুট নিয়ে মুখ খুললেন পূজা

পূজা ভাট। কোলাজ

নব্বইয়ের দশকে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ও সাহসী অভিনেত্রীদের একজন ছিলেন পূজা ভাট। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের স্পষ্টভাষিতা ও প্রচলিত ধারণার বাইরে চলার কারণে প্রায়ই খবরের শিরোনামে উঠে আসতেন তিনি। সেই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের জন্য বডি পেইন্টে ফটোশুট করা। ছবিটি অনুপ্রাণিত ছিল হলিউড তারকা ডেমি মুরের বিখ্যাত ভ্যানিটি ফেয়ারের কভারের আদলে।

ছবিটি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছিল। অনেকেই এটিকে সাহসী উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন, আবার অনেকে সমালোচনাও করেছিলেন। তবে তিন দশকের বেশি সময় পর পূজা ভাট বলেন, সেই ফটোশুটের উদ্দেশ্য কখনোই বিতর্ক সৃষ্টি করা ছিল না।

সম্প্রতি সাংবাদিক ভিকি লালওয়ানির সঙ্গে আলাপে পূজা ভাট ফিরে দেখেছেন সেই বহুল আলোচিত কভারের পেছনের গল্প, জনমতের প্রতিক্রিয়া এবং কেন তিনি মনে করেন, মানুষ ছবিটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

‘ডেমি মুরকে অসাধারণ লাগছিল’
পূজা ভাটের ভাষ্য অনুযায়ী, ফটোশুটটি কোনো উত্তেজনা বা বিতর্ক তৈরির পরিকল্পনা থেকে করা হয়নি; বরং প্রথম দেখাতেই তিনি ধারণাটি পছন্দ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘একদল মানুষের কাছ থেকে আমি প্রচুর সমালোচনা পেয়েছিলাম, আবার আরেক দল মানুষের কাছ থেকে অনেক ভালোবাসাও পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে এটি কখনোই বিতর্ক তৈরির জন্য করা হয়নি।’

পূজা জানান, সাংবাদিক দিনেশ রাহেজা তাঁকে ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ডেমি মুরের সেই বিখ্যাত প্রচ্ছদটি দেখিয়েছিলেন।

‘দিনেশ রাহেজা, যাঁর প্রতি আজও আমার অনেক শ্রদ্ধা রয়েছে, তিনি আমাকে ডেমি মুরের কভার দেখান। দিনেশ ও জিতু আমার সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, “পূজা, এই কভারটা দেখো।” আমি ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ডেমি মুরকে দারুণ লাগছিল। তাঁরা বললেন, এ ধরনের একটি ছবি পুনর্নির্মাণ করতে চান এবং জানতে চাইলেন, আমি রাজি কি না। আমি সঙ্গে সঙ্গেই বলেছিলাম, অবশ্যই।’
পরে যখন পূজা জানতে চান, বডি পেইন্টের কাজ কে করবেন, তখন তাঁকে বলা হয় ফ্যাশন ডিজাইনার আনা সিং এই দায়িত্বে থাকবেন।

সিনেমার দৃশ্যে পূজা ভাট। আইএমডিবি

ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যেই ফটোশুট
পূজা জানান, ফটোশুটটি হয়েছিল অত্যন্ত ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো কাজ শেষ করা হয়েছিল।

‘আমি তখন “ফির তেরি কাহানি ইয়াদ আয়ি” ছবির “তেরে দর পার সনম” গানের শুটিং করছিলাম। রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে কাজ শেষ করে আমি আলোকচিত্রী জগদিশ মালির বাড়িতে যাই। সেখানে আমার শরীরে পেইন্ট করা হয় এবং ফটোশুট সম্পন্ন হয়। এরপর বিষয়টি আমি একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ম্যাগাজিনটি প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলে যায়,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘ ‘ম্যাগাজিনটি বের হওয়ার পর বেশ হইচই পড়ে যায়। তবে এরপরই শহরে একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। বোমা হামলার মতো ভয়ংকর ট্র্যাজেডি ঘটে যায়। স্বাভাবিকভাবেই তখন মানুষের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না কোনো নারী নিজের শরীরে রং করে ছবি তুলেছেন কি না।’

‘আমি ছবিতে নগ্ন ছিলাম না’
এই কভারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি ছিল, পূজা ভাট নাকি সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ছবি তুলেছিলেন। সেই ধারণা সরাসরি খণ্ডন করেছেন অভিনেত্রী।
পূজা বলেন, ‘আমি ওই ছবিতে নগ্ন ছিলাম না। ডেমি মুরের ক্ষেত্রে “বার্থডে স্যুট” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার অর্থ তিনি বডি পেইন্টের নিচে সম্পূর্ণ নগ্ন ছিলেন। কিন্তু আমি তা ছিলাম না।’

পূজা আরও বলেন, ‘আমি অন্তর্বাস পরে ছিলাম। কারণ, আমরা খুব ভালোভাবেই জানতাম, সীমারেখা কোথায় এবং আমরা সেই সীমা অতিক্রম করিনি।’
তাঁর মতে, ছবিটি সেই সময়ের জন্য অনেকের কাছে সাহসী মনে হতে পারে, কিন্তু এর উদ্দেশ্য কাউকে চমকে দেওয়া ছিল না।

পূজা ভাট। আইএমডিবি

‘আমি শুধু নিজের মতো ছিলাম’
পূজা ভাট মনে করেন, মানুষের কাছে ছবিটি হয়তো দুঃসাহসিক বা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল। তবে তাঁর কাছে এটি ছিল একটি নান্দনিক ধারণার বাস্তবায়ন।
‘হয়তো অনেকের কাছে এটি খুব সাহসী বা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল। কিন্তু আমি এটি করেছি কারণ ধারণাটি আমার ভালো লেগেছিল। যাঁদের সঙ্গে কাজ করছিলাম, তাঁদের ওপর আমার আস্থা ছিল। তাই কাজটি করেছি। বিতর্ক সৃষ্টি করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আমি শুধু নিজের মতো ছিলাম।’

আরও পড়ুন

কেন এখনো আলোচনায় সেই ছবি?
তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ছবিটি এখনো আলোচনায় আসে—এ বিষয়টি তাঁকে অবাক করে।

পূজা বলেন, ‘সম্প্রতি আবারও ছবিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে এটিকে “কাল্ট ইমেজ” বলছেন। কিন্তু এ ধরনের কিছু পরিকল্পনা করে তৈরি করা যায় না। আমি শুধু নিজের মতো ছিলাম। সমস্যা হলো, আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মিথ্যার আধিক্য এত বেশি যে সত্যটাই আজ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।’

‘তখন ভাইরাল হওয়ার চিন্তা ছিল না’
এর আগেও সিদ্ধার্থ কান্নানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই ছবি নিয়ে কথা বলেছিলেন পূজা ভাট। তখনো তিনি বলেছিলেন, পুরো বিষয়টিকে তিনি শিল্পের চোখে দেখেছিলেন।

‘আমি ডেমি মুরের আসল ছবিটি দেখেছিলাম এবং সেটিকে খুব নান্দনিক মনে হয়েছিল। আমি কখনো ভাবিনি যে আমি কোনো বিতর্কিত কাজ করছি। সবকিছু নির্ভর করে উদ্দেশ্যের ওপর। আমার কাছে এটি ছিল নান্দনিক একটি কাজ,’ বলেন তিনি।
পূজা আরও বলেন, ‘তখন তো ভাইরাল শব্দটাই ছিল না। আমরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতাম। কখনো সফল হতো, কখনো হতো না। কখনো বিতর্ক তৈরি হতো, তখন মাথা নিচু করে থাকতে হতো। আবার কখনো মানুষ সেটিকে ভীষণ পছন্দ করত।’

পূজা ভাটের মতে, সেই আলোচিত প্রচ্ছদের পেছনে ছিল না কোনো প্রচারণার কৌশল বা বিতর্কের নকশা; বরং এটি ছিল শিল্প, আস্থা এবং নিজের প্রতি সৎ থাকার একটি প্রকাশ—যা আজও আলোচনায় থেকে গেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে