দুঃস্বপ্নের দাম্পত্য জীবন! এই নায়িকার গল্প সিনেমার মতোই

সারিথা। আইএমডিবি

আশির দশকে দক্ষিণি সিনেমার চার ভাষায় যিনি রাজত্ব করেছেন, সেই সারিথার জীবন যেন এক ট্র্যাজিক চলচ্চিত্রের গল্প—যেখানে সাফল্যের উজ্জ্বল আলোকে ছাপিয়ে গেছে ব্যক্তিগত জীবনের ভয়াবহ অন্ধকার।

দক্ষিণ ভারতের সিনেমার ইতিহাসে আশির দশক মানেই নতুন ধারার সিনেমা, পরীক্ষামূলক গল্প আর একঝাঁক শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীর উত্থান। এ সময়েই গড়ে উঠেছে বহু সুপারস্টারের ক্যারিয়ার। কিন্তু এই উত্থানের পাশাপাশি ছিল অনেক তারকার নীরব পতন—যাঁদের কেউ হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতায়, আবার কেউ আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছেন। সেই উজ্জ্বল অথচ বেদনাবিধুর নামগুলোর একটি হলো সারিথা।

তামিল, মালয়ালম, তেলেগু ও কন্নড়—দক্ষিণ ভারতের চারটি প্রধান চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতেই যিনি সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সেই সারিথা ছিলেন অভিনয়শক্তির এক অনন্য উদাহরণ। একের পর এক শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের একজন।

কিন্তু ক্যারিয়ারের এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ ব্যক্তিগত জীবন—যেখানে ছিল সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং গভীর ট্রমা।

সারিথা। আইএমডিবি

চার ভাষায় রাজত্ব
আশির দশকে যখন দক্ষিণি সিনেমায় নায়িকাদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, তখন সারিথার উপস্থিতি ছিল আলাদা। শুধু সৌন্দর্যের কারণে নয়, বরং অভিনয়ের গভীরতা, সংলাপ বলার দক্ষতা এবং চরিত্রে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার জন্য তিনি দ্রুতই নির্মাতাদের প্রথম পছন্দে পরিণত হন।
তামিলনাড়ু রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনবার সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পাওয়া সারিথা ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর প্রতিটি চরিত্রেই থাকত ভিন্নতা। গ্রাম্য নারী হোক বা শিক্ষিত শহুরে নারী, শক্ত মনের সংগ্রামী চরিত্র হোক বা আবেগপ্রবণ প্রেমিকা—সব চরিত্রেই তিনি রেখে যেতেন নিজের স্বাক্ষর।
তাঁর অভিনীত বহু ছবি আজও দক্ষিণি সিনেমার ক্ল্যাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময়ের দর্শকের কাছে সারিথা মানেই ছিল মানসম্মত অভিনয়ের গ্যারান্টি।

প্রথম বিয়ে: শুরুতেই ভাঙন
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই সারিথার ব্যক্তিজীবনে নেমে আসে ঝড়। ১৯৭৫ সালে, চলচ্চিত্রে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই তিনি বিয়ে করেন ভেঙ্কটা সুব্বাইয়াহ নামের এক ব্যক্তিকে। তবে এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
এই বিয়ের ভাঙন সারিথার মানসিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তবু তিনি নিজেকে ভেঙে পড়তে দেননি। বরং কাজের মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে দেন। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাঁর উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের ভিত্তি।

সারিথা। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

সুপারস্টার হওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে
ক্যারিয়ারের শিখরে থাকার সময় সারিথা দ্বিতীয়বার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এবার তাঁর জীবনসঙ্গী ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা মুকেশ। বাইরে থেকে দেখলে এই বিয়ে ছিল দুই সফল তারকার মিলন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বছরের পর বছর ধরে সারিথা অভিযোগ করেছেন, এই দাম্পত্য জীবন ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও আদালতের নথিতে উঠে এসেছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ।

সবচেয়ে ভয়ংকর যে অভিযোগটি সামনে এসেছে, তা হলো—অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সারিথার ভাষায়, সে সময় তাঁর ওপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছিল, যা তাঁর জীবনের গভীর ট্রমায় পরিণত হয়।
এই অভিযোগ শুধু একজন তারকার ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়, বরং এটি দক্ষিণি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পারিবারিক সহিংসতার এক নির্মম উদাহরণ হিসেবেও আলোচিত হয়েছে।

নীরব থাকার চাপ সারিথা একাধিকবার জানিয়েছেন, পরিবার ও সমাজের চাপে তাঁকে অনেক কিছু চুপ করে সহ্য করতে হয়েছিল। বিশেষ করে সন্তানের কথা ভেবে তিনি বহু সময় নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেননি।

সারিথা তাঁর বাবার অনুরোধে অনেক সময় অভিযোগ না তুলে নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। এই নীরবতাই ধীরে ধীরে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

আরও পড়ুন

ক্যারিয়ারের ওপর প্রভাব
ব্যক্তিগত জীবনের এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে সারিথার পেশাগত জীবনে। একসময় যিনি ছিলেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ, তিনি ধীরে ধীরে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। কাজ কমতে থাকে, আর মানসিক চাপ বাড়তে থাকে।
অনেকেই মনে করেন, এই দাম্পত্য ট্রমা না থাকলে সারিথার ক্যারিয়ার আরও দীর্ঘ ও উজ্জ্বল হতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকার তাঁর পেশাগত আলোকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়।

সাহসী প্রত্যাবর্তন
তবু সারিথার গল্প শুধু ভেঙে পড়ার নয়। একসময় তিনি আবার নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিনয় থেকে পুরোপুরি হারিয়ে না গিয়ে তিনি ধীরে ধীরে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে ফিরতে থাকেন।
পরিণত বয়সের চরিত্র, মায়ের ভূমিকা কিংবা শক্ত নারী চরিত্রে সারিথা আবারও প্রমাণ করেন, অভিনয়শক্তি কখনো ম্লান হয়নি। বরং অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও গভীর অভিনেত্রীতে পরিণত করেছে।

আজ সারিথার জীবনগাথা শুধু একজন তারকার গল্প নয়। এটি দক্ষিণি সিনেমার এক যুগের গল্প, যেখানে সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বহু নারীর নীরব কষ্ট।
চার ইন্ডাস্ট্রির রানি হয়েও যিনি ব্যক্তিগত জীবনে নিরাপদ ছিলেন না—এই বাস্তবতা সারিথাকে একদিকে কিংবদন্তি অভিনেত্রী, অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার এক করুণ প্রতীক করে তুলেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে