পোশাক নিয়ে বিতর্ক, শেষ পর্যন্ত সরল সেই বিজ্ঞাপন
রাখিবন্ধনের একটি বিজ্ঞাপনে কৃতি শ্যাননের পোশাক নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক। এরপর তাতে একে একে জড়ান বিজেপির সাংসদ ও অভিনেত্রী কঙ্গনা রনৌত এবং লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।
কঙ্গনার কটাক্ষের জবাব দেন কৃতি, অভিনেত্রীর পাশে দাঁড়ান রাহুল। রাহুলকেও পাল্টা কটাক্ষ করেন কঙ্গনা। কয়েক দিন ধরে চলা সেই আলোচনা–সমালোচনার মধ্যেই এবার বিজ্ঞাপনটি সব মাধ্যম থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট গয়না বিপণন প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।
যে বিজ্ঞাপন ঘিরে এত বিতর্ক
রাখিবন্ধন উপলক্ষে একটি গয়নাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন কৃতি। বিজ্ঞাপনে ব্রালেট ধাঁচের টপের সঙ্গে স্কার্ট পরতে দেখা যায় তাঁকে। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশ প্রশ্ন তোলে কৃতির পোশাক নিয়ে। তাঁদের অভিযোগ, রাখিবন্ধনের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সঙ্গে এমন পোশাক মানানসই নয়। কেউ কেউ পোশাকটিকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে অসংগত বলেও মন্তব্য করেন।
শুধু কৃতির পোশাক নয়, বিজ্ঞাপনের আরেকটি বিষয় নিয়েও আপত্তি ওঠে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি পোষ্য কুকুরকেও ভালোবেসে রাখি পরাতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশ বিষয়টির সমালোচনা করে।
এরপর কয়েক দিন ধরেই বিজ্ঞাপনটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা–সমালোচনা চলতে থাকে।
কঙ্গনার কটাক্ষে বিতর্ক বাড়ে
বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে কঙ্গনা রনৌত সরব হওয়ার পর। কৃতির পোশাককে বিকিনির সঙ্গে তুলনা করে প্রশ্ন তোলেন তিনি। নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে কঙ্গনা লেখেন, আজকের নারীদের সামনে ককটেল পোশাক থেকে লেহেঙ্গা-চোলি, জিনস থেকে শাড়ি, বিকিনি থেকে সালোয়ার-কামিজ—পোশাকের অসংখ্য বিকল্প রয়েছে। এত বিকল্প থাকার পরও ভাইকে রাখি পরানোর সময় কেন বিকিনি বা অন্তর্বাসের মতো পোশাক পরতে হবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিজ্ঞাপনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘অদ্ভুত’ করে তৈরি করা হয়েছে বলেও কটাক্ষ করেন কঙ্গনা।
চুপ থাকেননি কৃতি
সমালোচনার মুখে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন কৃতিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নারী কী পরবেন, তা নিয়ে সমাজ আর কত দিন নির্দেশ দিয়ে যাবে।
কৃতি লেখেন, ‘সময়ের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ফ্যাশনও বদলেছে। কিন্তু আজও কেন একজন নারীর সংস্কৃতির প্রতি সম্মানকে শুধু তাঁর পোশাক দিয়ে বিচার করা হয়? সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাঁর হৃদয়ে থাকে, তাঁর পোশাকের গলার কাটে নয়।’
রাখিবন্ধনের তাৎপর্য নিয়েও নিজের ভাবনা জানান অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের আসল সৌন্দর্য কে কী পোশাক পরেছেন, তার মধ্যে নয়; বরং ঐতিহ্য ও সম্পর্কের প্রতি মানুষের আবেগের মধ্যে। কৃতি জানান, তিনি ও তাঁর বোন একে অপরকে রাখি পরান এবং একে অপরের সুস্বাস্থ্য, সুখ ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন। তাঁদের কাছে পোষ্য কুকুরেরাও পরিবারের সদস্য, তাই ভালোবাসার এই বন্ধনে তারাও যুক্ত।
কৃতির পাশে রাহুল গান্ধী
বিতর্কের মধ্যেই কৃতির পাশে দাঁড়ান লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী। কৃতির বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন তিনি।
রাহুল লেখেন, ‘একজন নারী কী পরবেন, কী করবেন, কোথায় যাবেন—তা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। স্বাধীনভাবে চলার জন্য তাঁদের ট্রল করা বন্ধ করুন।’ রাহুলের এই মন্তব্যের পর বিতর্কে যোগ হয় রাজনৈতিক মাত্রাও। তাঁর বক্তব্য নিয়েও পাল্টা কটাক্ষ করেন কঙ্গনা।
শেষ পর্যন্ত সরল বিজ্ঞাপন
কৃতি-কঙ্গনা-রাহুলকে ঘিরে আলোচনা যখন চলছিল, তখনই বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট গয়না বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। সব মাধ্যম থেকে রাখিবন্ধন উপলক্ষে তৈরি কৃতির বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ‘ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উৎসবের প্রতি আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে। ব্র্যান্ড হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের আনন্দের মুহূর্ত পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ায়। এবার আমরা পোষ্যদের প্রতি ভালোবাসাকেও উদ্যাপন করতে চেয়েছিলাম।’
কেন বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সেটিও পরিষ্কার করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের সমাজের একাংশের অনুভূতিতে বিজ্ঞাপনটি আঘাত করে থাকলে জানাতে চাই, সেটি আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। সম্মানের কথা মাথায় রেখে আমরা সব মাধ্যম থেকে বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নিচ্ছি। এই উৎসবের মৌসুমে সবার প্রতি ভালোবাসা ও ইতিবাচক বার্তা দিতে চাই আমরা।’
ফলে কৃতির পোশাক থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার পর্যন্ত গড়াল। কয়েক দিনের ব্যবধানে বিষয়টি শুধু একটি বিজ্ঞাপন বা পোশাকের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; নারীর পোশাকের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও এতে যুক্ত হয়েছে।