স্বামীর সঙ্গে ৩০ বছরের বয়সের ব্যবধান, আলোচিত বিয়ে–বিচ্ছেদের গল্প বললেন সুচিত্রা

সুচিত্রা কৃষ্ণমূর্তি ও শেখর কাপুর। এক্স থেকে

তখন তিনি একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। কলেজের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন পরিচালক শেখর কাপুর। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সুচিত্রা কৃষ্ণমূর্তি। নিজের ভাষায়, তিনি তখন পুরোপুরি ‘ফ্যানগার্ল’। বয়সের ব্যবধান তখনো তাঁর কাছে বড় কোনো বিষয় হয়ে ওঠেনি। বরং সেই আকর্ষণই ধীরে ধীরে গড়ায় সম্পর্কে।

কিন্তু এই প্রেম মেনে নেওয়া সহজ ছিল না পরিবারের জন্য। সুচিত্রার চেয়ে প্রায় ৩০ বছরের বড় শেখর কাপুর তখন প্রতিষ্ঠিত পরিচালক, এর আগে তাঁর বিয়েও হয়েছিল। পরিবারের আপত্তির কারণ শুধু বয়সের ব্যবধান ছিল না, শেখর ছিলেন বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া একজন মানুষ এবং চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তাঁর মা–বাবা।

এমনকি বিয়ের সিদ্ধান্ত যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন সুচিত্রার মা তাঁর পা ধরে অনুরোধ করেছিলেন—এই বিয়ে যেন তিনি না করেন। এতটাই মরিয়া ছিলেন তিনি যে মেয়েকে বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু তখন নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরেননি সুচিত্রা।

আজ, সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার প্রায় দুই দশক পর, অতীতের দিকে তাকিয়ে গল্পটি বলেন তিনি অনেকটা অন্য চোখে। সম্প্রতি হাউটারফ্লাইয়ের ‘দ্য মেল ফেমিনিস্ট’ অনুষ্ঠানে নিজের ও শেখরের সম্পর্কের শুরুর কথা বলতে গিয়ে সুচিত্রা জানান, শেখর তাঁকে প্রেমে ফেলেননি; বরং তিনিই প্রথমে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

প্রথম দেখাতেই মুগ্ধতা
শেখর কাপুরকে প্রথম দেখার সময় সুচিত্রা ছিলেন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। কলেজের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন শেখর। তিনি সুচিত্রার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলেছিলেন। সেই মুহূর্তের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট তাঁর কাছে। তখনই তিনি বুঝেছিলেন, মানুষটির প্রতি তাঁর আলাদা একধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে।
পরে আলোকচিত্রী গৌতম রাজাধ্যক্ষের মাধ্যমে শেখরের সঙ্গে আবার দেখা হয়। সুচিত্রার বয়স তখন ১৮। একটি চলচ্চিত্রে কাজ করার জন্য তাঁকে শেখরের সঙ্গে দেখা করতে পাঠানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছবিটি আর তৈরি হয়নি। কিন্তু সেই অসমাপ্ত চলচ্চিত্রের সূত্রেই শুরু হয় অন্য এক গল্প।

সুচিত্রার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর শেখর তাঁকে ফোন করতেন, বাইরে নিয়ে যেতেন। পরিবারের লোকজনও ধীরে ধীরে বিষয়টি বুঝতে পারেন। তাঁর বোন বিষয়টি মোটেও ভালোভাবে নেননি। মজা করে শেখরকে বলতেন, ‘আঙ্কেল, আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন।’

কিন্তু পরিবারের আপত্তি কিংবা বয়সের ব্যবধান—কোনোটিই তখন সুচিত্রার প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

মায়ের সেই অনুরোধ
শেখর কাপুরের সঙ্গে সুচিত্রার বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩০ বছর। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা জানিয়েছেন, এই ব্যবধান নিয়ে তাঁর পরিবার শুরু থেকেই অস্বস্তিতে ছিল। তাঁর মা বিশেষভাবে চিন্তিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বিয়ে থেকে বিরত রাখতে তাঁর পা পর্যন্ত ধরেছিলেন।

শেখর কাপুর ও সুচিত্রা কৃষ্ণমূর্তি। এক্স থেকে

২০২৩ সালে সিদ্ধার্থ কান্নানের সঙ্গে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারেও একই ঘটনার কথা বলেছিলেন সুচিত্রা। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর মা–বাবা এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, বয়সের এত বড় ব্যবধান, শেখরের আগের বিয়ে এবং চলচ্চিত্রজগতের জীবন—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি তাঁর মেয়ের জন্য জটিল হতে পারে।
কিন্তু সুচিত্রা তখন ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই মানুষটির সঙ্গেই জীবন কাটাতে চান। ১৯৯৯ সালে বিয়ে করেন তাঁরা। তখন সুচিত্রার বয়স ২২, শেখরের ৫২।

বিয়ের পরই বদলে গেল অনেক কিছু
প্রেমের সময় যে সম্পর্ককে সুচিত্রা নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছিলেন, বিয়ের পর সেই সম্পর্কেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে ফাটল। ২০২৩ সালের সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা জানিয়েছিলেন, তাঁদের দাম্পত্যে সমস্যা শুরু হয়েছিল প্রথম বছরেই। এমনকি তিনি তখন সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। তাঁর সামনে তখন সংগীত শেখার একটি সুযোগও এসেছিল। বার্কলি কলেজ অব মিউজিকে পড়ার জন্য তিনি আংশিক বৃত্তি পেয়েছিলেন। সংগীত ছিল তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন।

সেই সময় জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা
সন্তান আসছে—এই খবর সুচিত্রার জীবনের পরিকল্পনা বদলে দেয়। বিয়ে থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের মতো জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত তখন স্থগিত করেন তিনি। আরও কয়েক বছর সংসারে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন, সম্পর্কটি আর টেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
সুচিত্রা পরে বলেছেন, শুধু সামাজিক মর্যাদা, অর্থ কিংবা মানুষের চোখে একটি সফল সংসারের ছবি ধরে রাখার জন্য তিনি থাকতে চাননি। তাঁর কাছে নিজের সম্মান ও নিজের মতো করে বেঁচে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

আরও পড়ুন

অভিনয় নিয়েও ছিল মতবিরোধ
দাম্পত্যের টানাপোড়েনের আরেকটি বিষয় ছিল সুচিত্রার অভিনয়জীবন। ‘কাভি হাঁ, কাভি না’ ছবিতে শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করে তখন তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু বিয়ের পর শেখর চাইতেন না তাঁর স্ত্রী চলচ্চিত্রে অভিনয় করুন। সুচিত্রা জানিয়েছেন, বিষয়টি তখন খুব গভীরভাবে বুঝতে পারেননি তিনি। তাঁর মনে হয়েছিল, অভিনয় না করলেও জীবনে আরও অনেক কিছু করার সুযোগ থাকবে।
শেখর তাঁর গান করা কিংবা সংগীতের ভিডিওতে কাজ করার বিষয়ে আপত্তি করতেন না। কিন্তু চলচ্চিত্রে অভিনয় চালিয়ে যাওয়া তিনি চাননি। সুচিত্রা পরে উপলব্ধি করেন, নিজের পেশাগত জীবনের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছিল।
তবে ক্যারিয়ার নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই বলেও জানিয়েছেন সুচিত্রা। বরং সেই কঠিন দাম্পত্য তাঁকে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মেয়ের জন্ম, তারপর বিচ্ছেদ
২০০১ সালে জন্ম নেয় তাঁদের মেয়ে কাবেরী কাপুর। সন্তানকে ঘিরে নতুন করে সংসারকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটি টেকেনি। ২০০৭ সালে বিচ্ছেদ হয় তাঁদের। তখন কাবেরীর বয়স মাত্র ছয় বছর। দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার পরও মেয়ের জন্য যোগাযোগ বজায় রাখেন দুজন। সুচিত্রা নিজের জীবনে বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এমন এক সময়ে, যখন ভারতে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা এখনকার মতো স্বাভাবিক ছিল না, তখন তাঁর খোলামেলা অবস্থান নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। সুচিত্রা পরে নিজেই বলেছেন, বিচ্ছেদের পর তাঁকে অনেকেই চুপ থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের অভিজ্ঞতা লুকিয়ে রাখতে চাননি।

যে মা বিয়ে আটকাতে চেয়েছিলেন, তিনিই পাশে দাঁড়ালেন
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সময় অবশ্য সুচিত্রা পেলেন পরিবারের পূর্ণ সমর্থন। সবচেয়ে বেশি পাশে ছিলেন সেই মা, যিনি একসময় মেয়ের পা ধরে শেখরকে বিয়ে না করার অনুরোধ করেছিলেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা বলেন, যখন সম্পর্কের পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করেছিল, তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন—কোনো অসম্মানজনক পরিস্থিতি মেনে নিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। তিনি যেন মনে রাখেন, তিনি একা নন; তাঁর পরিবার তাঁর পাশে আছে।

আরও পড়ুন

সুচিত্রার কাছে এই সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিয়ের সময় তিনি নিজের সিদ্ধান্তে পরিবারের আপত্তি অগ্রাহ্য করেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে কি না—এমন হিসাব না করে, কঠিন সময়ে পরিবার যে তাঁকে আগের মতোই গ্রহণ করেছিল, সেটিই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে।

‘ভ্যাকেশন ড্যাড’ শেখর
বিচ্ছেদের পর কাবেরীর দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন দুজন। তবে সুচিত্রার ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের দৈনন্দিন জীবনের বেশির ভাগ দায়িত্ব তাঁর ওপরই ছিল। শেখর বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতেন এবং মেয়ের সঙ্গে ছুটি কাটানো বা ভ্রমণের সময় বেশি পেতেন।

২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তাই মজা করে শেখরকে ‘হলিডে ড্যাড’ বা ‘ভ্যাকেশন ড্যাড’ বলেছিলেন সুচিত্রা। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, মেয়ের সঙ্গে শেখরের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। কাবেরী অনেক সময় বাবার কাছেই বেশি স্বচ্ছন্দ—এটিকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখেন না। বরং সন্তানের জীবনে বাবা ও মা—দুজনের উপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

এই সম্পর্কের জায়গাটি তাঁদের দাম্পত্যের সময়কার সম্পর্কের চেয়ে আলাদা। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাঁরা একসঙ্গে থাকতে পারেননি, কিন্তু মা–বাবা হিসেবে মেয়ের জন্য যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।

আর বিয়ে করেননি দুজনেই
বিচ্ছেদের পর সুচিত্রা আর বিয়ে করেননি। শেখর কাপুরও নতুন করে বিয়ে করেননি। ২০২৬ সালে নিজের একক জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুচিত্রা জানিয়েছিলেন, সম্পর্কের জন্য একজন মানুষকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়। তাঁর কাছে বিয়ে জীবনের বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি একটি পছন্দ।
সুচিত্রা নিজের সৃজনশীল জীবন নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি গান, লেখালেখি ও নানা ধরনের শিল্পচর্চায় যুক্ত থেকেছেন।

আর কাবেরীও এখন নিজের পথ তৈরি করেছেন। ২০২৫ সালে ‘ববি অউর ঋষিস লাভ স্টোরি’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক হয়েছে তাঁর। ফলে মা–বাবার আলাদা জগতের বাইরে নিজের পরিচয় তৈরির পথেও এগিয়েছেন তিনি।