অভিনয়ের সুযোগ পেতে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়, নায়িকার ক্ষোভ
লালগালিচা, কোটি টাকার সিনেমা, তারকাখ্যাতি আর বিলাসবহুল জীবনের গল্পের পাশাপাশি বলিউডে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, কাস্টিং কাউচ আর বহিরাগত শিল্পীদের সংগ্রামের কথাও উঠে এসেছে নানা সময়ে। এ আলোচনা কয়েক বছর ধরে আরও জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনের পর অনেক অভিনেত্রী ও শিল্পী প্রকাশ্যে তাঁদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন।
সম্প্রতি অভিনেত্রী মানভি গাগরু এমনই এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথা সামনে এনেছেন। জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘টিভিএফ পিচার্স’, ‘ট্রিপলিং’ এবং ‘ফোর মোর শটস প্লিজ!’–এর এই অভিনেত্রী জানিয়েছেন, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি এমন একটি বার্তা পেয়েছিলেন, যেখানে অভিনয়ের সুযোগের বদলে ‘সমঝোতা’ করতে বলা হয়েছিল। আর সেই সমঝোতার বিনিময়ে এক লাখ রুপির বেশি দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
‘সমঝোতা করলে এক লাখের বেশি পাবেন’
সম্প্রতি ‘টু গার্লস অ্যান্ড টু কাপস’ পডকাস্টে অতিথি হয়ে মানভি গাগরু নিজের ক্যারিয়ারের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। সেখানেই তিনি স্মরণ করেন একটি অস্বস্তিকর ঘটনার কথা। অভিনেত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তাঁর কাছে একটি বার্তা আসে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘আপনি যদি সমঝোতা করতে রাজি থাকেন, তাহলে এক লাখ রুপির বেশি পাবেন।’
এ ধরনের প্রস্তাব যে কতটা অপমানজনক এবং ভয়াবহ হতে পারে, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। তবে মানভি জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতি তাঁকে হতবাক করলেও তিনি নিজের কাজ এবং অভিনয়দক্ষতার ওপরই ভরসা রেখেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, বিনোদনজগতে সুযোগের খোঁজে থাকা তরুণ শিল্পীদের লক্ষ্য করেই অনেক সময় এ ধরনের ফাঁদ পাতা হয়।
বহিরাগতদের জন্য পথটা কঠিন
মানভি গাগরু বলিউডের তথাকথিত ‘ফিল্মি পরিবার’ থেকে আসেননি। ফলে নিজের অবস্থান তৈরি করতে তাঁকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তাঁর মতে, বহিরাগত শিল্পীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুযোগ পাওয়ার আগেই নিজেকে প্রমাণ করার চাপ।
তিনি বলেছেন, শিল্পে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তানদের তুলনায় বহিরাগতদের অনেক বেশি অডিশন দিতে হয়, অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হয় এবং নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে হয়।
এখানেই উঠে আসে বলিউডের আরেক বহুল আলোচিত বিষয়—স্বজনপ্রীতি বা নেপোটিজম।
নেপোটিজম: সুবিধা আছে, কিন্তু সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই
স্বজনপ্রীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মানভি কোনো রাখঢাক করেননি। তাঁর মতে, তারকার সন্তানেরা অবশ্যই কিছু বাড়তি সুবিধা পান। কারণ, তাঁরা ছোটবেলা থেকেই শিল্পের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চেনেন এবং সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। তবে তিনি এটাও মনে করেন যে কেবল সুযোগ পেলেই দীর্ঘ মেয়াদে সফল হওয়া যায় না।
মানভির কথায়, দর্শকই শেষ পর্যন্ত ঠিক করেন কে টিকে থাকবে আর কে হারিয়ে যাবে। একটি বা দুটি সুযোগ হয়তো পরিচয়ের কারণে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু দর্শকের গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ে তোলা কঠিন।
এ মন্তব্য অনেকটাই সেই বিতর্কের মাঝামাঝি অবস্থানকে তুলে ধরে, যেখানে একদিকে নেপোটিজমের সুবিধা অস্বীকার করা যায় না, অন্যদিকে প্রতিভা ও দর্শকসমর্থনের গুরুত্বও উপেক্ষা করা যায় না।
ওটিটি কি বদলে দিয়েছে সমীকরণ
মানভি গাগরুর ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান বহু বহিরাগত শিল্পীর জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। একসময় বলিউডে প্রধান চরিত্রে সুযোগ পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু ওয়েব সিরিজ ও ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তারে অভিনয়দক্ষতাই এখন অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে উঠছে।
‘টিভিএফ পিচার্স’, ‘ট্রিপলিং’, ‘ফোর মোর শটস প্লিজ!’ কিংবা ‘হাফ সিএ’–এর মতো প্রকল্পগুলো প্রমাণ করেছে যে দর্শক পরিচিত পদবির চেয়ে ভালো অভিনয় ও শক্তিশালী গল্পকে বেশি গুরুত্ব দেন। মানভিও মনে করেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন প্রতিভাবান শিল্পীদের সামনে আগের চেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংগ্রাম থেকে প্রতিষ্ঠা
মানভি গাগরুর যাত্রা আসলে সমসাময়িক ভারতীয় বিনোদনশিল্পের একটি প্রতীকী গল্প। যেখানে একদিকে রয়েছে স্বপ্ন, কঠোর পরিশ্রম এবং ধৈর্য; অন্যদিকে রয়েছে অনিশ্চয়তা, প্রত্যাখ্যান এবং কখনো কখনো অনৈতিক প্রস্তাবের মুখোমুখি হওয়ার বাস্তবতা।
তিনি জানিয়েছেন, এসব বাধা সত্ত্বেও নিজের অভিনয়দক্ষতা উন্নত করার দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। এমন চরিত্র বেছে নিয়েছেন, যা তাঁকে একজন শিল্পী হিসেবে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে