প্রথম ৫ ছবি ফ্লপ, এখন তিনি শাহরুখের চেয়েও ধনী

রনি স্ক্রুওয়ালা। প্রযোজকের ইনস্টাগ্রাম থেকে

বলিউডে কোনো ছবির ভাগ্য যেমন আগাম বোঝা কঠিন, তেমনি অনিশ্চিত এই ইন্ডাস্ট্রিতে মানুষের ভবিষ্যৎও। আজ যাঁরা সুপারস্টার, কাল তাঁরাই হারিয়ে যেতে পারেন। আবার একের পর এক ব্যর্থতার পরও কেউ কেউ শীর্ষে উঠে আসেন—সবকিছু বদলে দিতে পারে মাত্র একটি শুক্রবার। বলিউডে এমন বহু উত্থান-পতনের গল্প থাকলেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর একটি প্রযোজক রনি স্ক্রুওয়ালা। প্রথম কয়েকটি ছবি টানা ব্যর্থ হলেও শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠেছেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী ও ধনী ব্যক্তি।

হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৫ অনুযায়ী, রনি স্ক্রুওয়ালা বর্তমানে বলিউডের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। এই তালিকায় তিনি টপকে গেছেন বলিউডের ‘বাদশাহ’ শাহরুখ খানকেও।

শুরুটা ছিল বড় ধাক্কা দিয়ে
রনি স্ক্রুওয়ালার সিনেমায় যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। স্ত্রী জারিনা স্ক্রুওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে ইউটিভি মোশন পিকচার্স ব্যানারে তিনি প্রযোজনা করেন ‘দিল কে ঝরোখে মেঁ’। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মনীষা কৈরালা ও বিকাশ ভাল্লা। কিন্তু বক্স অফিসে ছবিটি মুখ থুবড়ে পড়ে।

রনি স্ক্রুওয়ালা। প্রযোজকের ইনস্টাগ্রাম থেকে

সম্প্রতি মাস্টার্স ইউনিয়নের এক আলোচনায় সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে রনি বলেন, ‘ছবিটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ফ্লপ। শুটিংয়ের সময় একটা দৃশ্যে কোবরাকে দুধ খাওয়াতে হয়েছিল। সাধারণত কোবরা শুটিং সেটে দুধ খায় না। কিন্তু আমাদের কোবরা দুধ খেয়েছিল। সেটা দেখে পরিচালক বলেছিলেন, “এই ছবি সুপারহিট হবেই।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাই আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়ায়।’

টানা পাঁচটি ব্যর্থতা, তবু পিছু হটা নয়
এই ছবির পর একের পর এক ব্যর্থতা আসে। শাহরুখ খান ও হৃতিক রোশন অভিনীত ছবিও বাঁচাতে পারেনি তাঁকে। তবু প্রশ্ন উঠেছে, টানা পাঁচটি ফ্লপের পরও কীভাবে হাল ছাড়েননি তিনি?

এই প্রশ্নের উত্তরে রনি বলেন, তাঁর কাছে কখনোই কোনো ‘প্ল্যান বি’ ছিল না। ‘আমি হয় সবার মতো চলছিলাম, নয়তো ভাবছিলাম—একজন আউটসাইডারের মতোই চলি। আসলে আমাকে বদলাতে হয়নি। আমি যা হতে চাইছিলাম, সেটাই হতে দেওয়াটাই ছিল শেখার জায়গা। মিডিয়া ব্যবসা আর টিভি চ্যানেল তৈরির সময় আমরা যেভাবে ভেবেছিলাম, ঠিক সেভাবেই কাজ করেছি। কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে আমি নিজের জায়গা বুঝতে পারছিলাম না, তাই অন্যদের অনুসরণ করছিলাম। পরে আবার নিজের বিশ্বাসে ফিরে যাই’, বলেন রনি।

তিনি আরও জানান, তাঁর মধ্যবিত্ত পারিবারিক বেড়ে ওঠা, কোনো বিকল্প পরিকল্পনা না থাকা এবং বাবার স্পষ্ট কথা—সংকটে পড়লে আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়—এই সবকিছুই তাঁকে লড়াই চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

একসঙ্গে ‘লক্ষ্য’, ‘স্বদেশ’ ও ‘রং দে বাসন্তী’
রনি স্ক্রুওয়ালার প্রযোজনা সংস্থা ইউটিভি একসময় একসঙ্গেই ‘লক্ষ্য’, ‘স্বদেশ’ও ‘রং দে বাসন্তী’—এই তিন ছবি শুরু করে। কোনটি কাজ করবে, সেটি তখন কেউই জানতেন না।

রনি স্ক্রুওয়ালা। এক্স থেকে

রনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম একটু ভাঙচুর করতে। গল্প বলার ধরন বদলাতে চেয়েছিলাম। তরুণ পরিচালকদের সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম। আমরা এমন কাউকে চাইনি, যিনি বলবেন, “আমি জানি কীভাবে এটা করতে হয়।” আমরা কাস্টিংয়ের চেয়ে চিত্রনাট্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।’

তবে বাস্তবতা হলো, ফারহান আখতারের ‘লক্ষ্য’ (হৃতিক রোশন, প্রীতি জিনতা) ও আশুতোষ গোয়ারিকারের ‘স্বদেশ’ (শাহরুখ খান, গায়ত্রী যোশী)—দুটিই তখন বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

আরও পড়ুন

ছোট ছবিতে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো
এই ব্যর্থতার পরও রনি পিছু হটেননি;  বরং ‘ডি’, ‘ম্যায় মেরি পত্নী অউর ওহ’-এর মতো তুলনামূলক ছোট ছবির মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। শেষ পর্যন্ত ইউটিভি ও রনি স্ক্রুওয়ালার বড় সাফল্য আসে ‘রং দে বাসন্তী’ ছবির মাধ্যমে, যা বাণিজ্যিক ও সমালোচক, দুই দিক থেকেই সাড়া ফেলে।

রনি স্ক্রুওয়ালা প্রযোজিত ‘শ্যাম বাহাদুর’–এ ভিকি কৌশল। ছবি: আইএমডিবি

ইউটিভির পর আরএসভিপি মুভিজ
ইউটিভি অধ্যায় শেষ হওয়ার পর রনি প্রতিষ্ঠা করেন আরএসভিপি মুভিজ। এই ব্যানারে তিনি প্রযোজনা করেছেন একের পর এক আলোচিত ছবি—‘লাস্ট স্টোরিজ’, ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’, ‘রাত আকেলি হ্যায়’, ‘পাভা কাধাইগাল’, ‘লাস্ট স্টোরিজ ২’, ‘শ্যাম বাহাদুর’, ‘উল্লোজুক্কু’, ‘রাত আকেলি হ্যায়: দ্য বানসাল মার্ডার্স’সহ আরও অনেক কাজ।

শাহরুখের চেয়েও এগিয়ে
হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৫ অনুযায়ী, রনি স্ক্রুওয়ালার মোট সম্পদ ১৩ হাজার কোটি রুপি, যা তাঁকে বলিউডের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই তালিকায় তাঁর পরেই রয়েছেন শাহরুখ খান, যাঁর মোট সম্পদ প্রায় ১২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি।

প্রথম পাঁচটি ছবির ব্যর্থতা দিয়ে যাত্রা শুরু করা এক প্রযোজকের এই উত্থান তাই শুধু বলিউডের নয়, পুরো ভারতীয় বিনোদনজগতেরই এক প্রেরণার গল্প।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে