বাবার সঙ্গে থাকা শিশুটি এখন বড় তারকা, ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মালিক

বাবার সঙ্গে থাকা শিশুটি কে? এক্স থেকে

দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার তারকাদের মধ্যে যে কয়েকজন আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদের অন্যতম তিনি। জন্মদিন এলেই তাঁর ভক্তদের উচ্ছ্বাস যেন নতুন করে বিস্ফোরিত হয়। কারণ, তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতাই নন—তিনি একাধারে উত্তরাধিকার, পরিশ্রম, সংগ্রাম আর নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি আর কেউ নন, রাম চরণ। আজ ২৭ মার্চ অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।

উত্তরাধিকার আর চাপে শুরু
১৯৮৫ সালের ২৭ মার্চ ভারতের চেন্নাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন রাম চরণ। তাঁর বাবা দক্ষিণ ভারতের কিংবদন্তি অভিনেতা চিরঞ্জীবী—যার কারণে শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। অনেকেই মনে করতেন, এত বড় তারকার ছেলে হওয়ায় তাঁর জন্য সাফল্যের পথ সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

স্টার কিড হওয়ার সুবিধা যেমন ছিল, তেমনি ছিল প্রত্যাশার বিশাল চাপ। নিজেকে প্রমাণ করার দায় তাঁর ওপর ছিল অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি।

অভিনয়ের পথে প্রথম পদক্ষেপ ২০০৭ সালে ‘চিরুথা’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক ঘটে রাম চরণের। প্রথম ছবিতেই তিনি নজর কাড়েন।

এখানে রাম চরণ অভিনয় করেন চরণ নামের এক তরুণের চরিত্রে, যে তার মা–বাবার হত্যাকারী গ্যাংস্টারের খোঁজে বের হয়। সিনেমাটির জন্য ফিল্মফেয়ার সাউথে সেরা নবাগত অভিনেতার পুরস্কার জেতেন। সত্যিকারের তারকাখ্যাতি আসে দ্বিতীয় ছবিতে—‘মাগাধীরা’। এই সিনেমাটি শুধু বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, বরং তাঁকে দক্ষিণ ভারতের শীর্ষ নায়কদের কাতারে নিয়ে যায়। তাঁর অভিনয়, অ্যাকশন আর পর্দায় উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করে। এস এস রাজামৌলির সিনেমাটিতে তাঁকে দেখা যায় দ্বৈত চরিত্রে।

পুনর্জন্ম আর চিরন্তন প্রেমের গল্পে ভর করে তৈরি এই ছবি সেই সময়ের সর্বোচ্চ আয় করা তেলেগু সিনেমা হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, এক হাজার দিন প্রেক্ষাগৃহে চলার রেকর্ডও গড়ে। ২০১২ সালে ‘রাচা’ সিনেমা তাঁকে বাণিজ্যিক সিনেমার নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ সিনেমায় তাঁকে দেখা যায় এক জুয়াড়ির ভূমিকায়, যে নিজের দত্তক বাবার চিকিৎসার জন্য এক তরুণীকে প্রেমে ফেলতে বাধ্য হয়।

‘গেম চেঞ্জার’ ছবিতে রাম চরণ। ভিডিও থেকে

চড়াই-উতরাই
সাফল্যের পরও রাম চরণের পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। কিছু ছবি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সমালোচকদের প্রশ্ন, দর্শকদের প্রত্যাশা—সবকিছুই তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই সময়েই তিনি নিজের অভিনয়দক্ষতা উন্নত করেন, চরিত্র নির্বাচনে সতর্ক হন। এর ফল দেখা যায় ‘রাঙ্গাস্থালম’-এ। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এক ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন—তিনি শুধু স্টার নন, একজন দক্ষ অভিনেতাও।

আন্তর্জাতিক সাফল্য
রাম চরণের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ‘আরআরআর’ সিনেমার মাধ্যমে। পরিচালক এস এস রাজামৌলির এই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র তাঁকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে। এই সিনেমায় ‘অল্লুরি সীতারামা রাজু’ চরিত্রে তাঁর শক্তিশালী অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। ছবিটির গান ‘নাটু নাটু’ অস্কার জেতার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন রাম চরণ ও তাঁর সহশিল্পীরা।

ব্যক্তিগত জীবনে নীরব
পর্দার বাইরে রাম চরণ বেশ সংযত ও ব্যক্তিগত মানুষ। ২০১২ সালে তিনি বিয়ে করেন উপাসনা কমলীনিকে। উপাসনা একজন সফল ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবী। তাঁদের সম্পর্ক সব সময়ই মিডিয়ার কাছে ‘পারফেক্ট কাপল’ হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের পর ২০২৩ সালে তাঁদের ঘরে আসে কন্যাসন্তান, যা তাঁদের জীবনে নতুন আনন্দ নিয়ে আসে। চলতি বছর যমজ সন্তানের মা-বাবা হয়েছেন তাঁরা।

‘নাটু নাটু’ সিনেমার গানের দৃশ্যে রাম চরণ ও এনটিআর জুনিয়র
ইনস্টাগ্রাম

অভিনয়ের বাইরে
অভিনয়ের বাইরে রাম চরণ একজন সফল উদ্যোক্তাও। তিনি একটি এয়ারলাইন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করছেন। এ ছাড়া সমাজসেবামূলক কাজেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রমে তিনি নিয়মিত অংশ নেন। কাজের বাইরে রাম চরণকে খুব একটা প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না, সিনেমার প্রচার ছাড়া দেন না সাক্ষাৎকারও।

রাম চরণ
এক্স থেকে

কত টাকার মালিক
রাম চরণ বিপুল সম্পদের মালিক। ২০২৫-২৬ সালে তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি রুপি। তাঁর আয় আসে সিনেমা, প্রযোজনা, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট, ব্যবসা ও বিনিয়োগ থেকে। হায়দরাবাদের জুবিলি হিলসে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ির মূল্যই প্রায় ৩০ কোটি রুপি। এই বিপুল সম্পদের পেছনে রয়েছে তাঁর ধারাবাহিক হিট সিনেমা, ব্যবসায়িক বিচক্ষণতা ও আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা।

আরও পড়ুন

সিনেমা দর্শন
রাম চরণ ফ্লপ বা হিট নিয়ে চিন্তিত নন। ‘আমি কোনো নির্দিষ্ট বা কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করি না। আমি একজন অভিনেতা হিসেবে পরিচালক যেভাবে আমাকে কল্পনা করেন, আমি সেই আকার নিতে পছন্দ করি। এরপর কী হয়, সেটা দর্শকের ওপর। হিট বা ফ্লপ নিয়ে বেশি ভাবলে আপনি কাজটাই আর করতে পারবেন না,’ বলেন তিনি।

রাম চরণ আরও জানান, হিট বা ফ্লপ—কেন তেমন প্রভাব ফেলে না। রাম চরণের ভাষ্যে, ‘যখন “মাগাধীরা” বড় হিট হয়েছিল, আমি দুই সপ্তাহ ধরে বাড়ির বাইরে যাইনি। আমার বাবা চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু অন্যদিকে, যখন একটি ছবি ব্যর্থ হয়েছে, তখন আমি উৎসবও করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ব্যর্থতা বা সাফল্যকে জীবনের গুরুতর বিষয় হিসেবে দেখি না। তবে আমি কখনো ব্যর্থতার জন্য চাইনি।’

ফিল্মফেয়ার, গালফ নিউজ অবলম্বনে