ষড়যন্ত্র নাকি অন্য কিছু? সাফল্য পেয়েও বলিউড ছাড়েন কমল হাসান

‘এক দুজে কে লিয়ে’ সিনেমায় কমল হাসান। আইএমডিবি
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

বলিউডে পা রেখেই সাফল্য। একের পর এক আলোচিত সিনেমা, দর্শকের প্রশংসা, সমালোচকদের স্বীকৃতি—সবই পেয়েছিলেন তিনি। চাইলে হিন্দি সিনেমার অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠতে পারতেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই যেন উল্টো পথে হাঁটলেন। মুম্বাইয়ের চাকচিক্য, তারকাখ্যাতি কিংবা বড় বাজেটের ছবির হাতছানি—কোনোটিই তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। ফিরে গেলেন দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে। তিনি কমল হাসান।  

কেন বলিউডে নিজের সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার দীর্ঘ করেননি এই অভিনেতা? তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে কি ছিল শুধু কাজের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ, নাকি বলিউডের অন্দরমহলের এমন কিছু বাস্তবতা, যা তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল? এ নিয়ে নানা সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। এমনকি ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও সামনে এসেছে। তবে কমল হাসান নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ জানিয়েছেন। আজ ৭ নভেম্বর, আলোচিত এই দক্ষিণি তারকার জন্মদিন। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক কমল হাসানের বলিউড অধ্যায়।  

এক ছবিতেই বলিউডে পরিচিতি  
কমল হাসানের হিন্দি সিনেমায় যাত্রা শুরু ১৯৭৪ সালে কে বালাচন্দরের ‘আইনা’ দিয়ে। তবে বলিউডে তাঁর পরিচিতি আসে ১৯৮১ সালে। সে বছর মুক্তি পায় ‘এক দুজে কে লিয়ে’। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন তাঁর গুরু কে বালাচন্দর। তেলেগু ছবি ‘মারো চরিত্র’-এর হিন্দি সংস্করণে রতি অগ্নিহোত্রীর বিপরীতে অভিনয় করেন কমল।
ছবিটি বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পায়। রাতারাতি হিন্দি দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর ‘সনম তেরি কসম’, ‘ইয়ে তো কামাল হো গয়া’, ‘জারা সি জিন্দেগি’ ও ‘সদমা’র মতো ছবিতে অভিনয় করেন। বিশেষ করে ‘সদমা’য় শ্রীদেবীর সঙ্গে তাঁর অভিনয় আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় জুটি হিসেবে আলোচিত হয়।
১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া রমেশ সিপ্পির ‘সাগর’ও তাঁর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য ছবি। ঋষি কাপুর ও ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে অভিনয় করেও নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন কমল। একই বছর অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘গেরাফতার’ ছবিতেও দেখা যায় তাঁকে। ফলে হিন্দি সিনেমায় তাঁর অবস্থান যে বেশ শক্ত হচ্ছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ ছিল না।

কিন্তু এত কিছুর পরও বলিউডে নিয়মিত হলেন না তিনি। ১৯৮৫ সালের পর দীর্ঘ বিরতি। ১৯৯৭ সালে ‘চাচি ৪২০’ দিয়ে আবার হিন্দি ছবিতে ফিরলেও আগের মতো নিয়মিত হননি। পরে ‘হে রাম’, ‘অভয়’, ‘মুম্বাই এক্সপ্রেস’ ও ‘বিশ্বরূপম’-এর মতো একাধিক দ্বিভাষিক বা হিন্দি সংস্করণের ছবিতে কাজ করেছেন।

বলিউডের কাজের গতিতে বিরক্তি
বলিউড থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে কমল হাসান বারবার তুলে ধরেছেন কাজের ধীরগতি ও অনিয়মকে। ২০১৮ সালে ‘ইন্ডিয়া টুডে’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি হিন্দি সিনেমার কাজের সংস্কৃতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, একটি ছবি তৈরি করতে মুম্বাইয়ে দুই থেকে তিন বছর লেগে যেত। অথচ সেই সময়ে দক্ষিণে তিনি একাধিক ছবিতে কাজ করতে পারতেন।
কমলের কাছে সময় ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, একজন অভিনেতার কর্মজীবন খুব দীর্ঘ নয়। তাই একটি ছবির পেছনে বছরের পর বছর আটকে থাকা তাঁর কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি।

২০০৯ সালে আইএএনএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের কথা বলেছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, বলিউডে একটি ছবি তৈরি হতে দুই থেকে তিন বছর লেগে যেত। ওই সময়ে দক্ষিণ ভারতে তিনি প্রায় সাতটি ছবিতে কাজ করতে পারতেন। তাই তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজের পরিচিত চলচ্চিত্রজগতে।

সিনেমার দৃশ্যে কমল হাসান। আইএমডিবি

ছয়টি ছবির চুক্তি, কিন্তু নিজের স্বাধীনতা কোথায়?
২০১৭ সালে ইন্ডিয়া টুডে সাউথ কনক্লেভে আরও খোলামেলাভাবে বলেছিলেন কমল। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার তুলনা করতে গিয়ে তিনি নিজেকে হিন্দি সিনেমার ‘গরিব আত্মীয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তাঁর কথায়, সে সময় বলিউডের অনেক অভিনেতা একই সঙ্গে ছয়টি ছবিতে কাজ করতে পারতেন। কিন্তু কমলকে নিজের কাজের পাশাপাশি দৈনন্দিন বিষয়ও সামলাতে হতো। এমনকি নিজের কাপড়চোপড়ও নিজেকেই ধুতে হতো। তাঁর চোখে, মুম্বাইয়ের তারকাদের জীবনযাপন ছিল অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ ও বিলাসী। অন্যদিকে তিনি এমন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না।

তবে বিষয়টি শুধু সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য ছিল না। কমলের কাছে অভিনয় মানে একটি চরিত্রকে সময় দেওয়া, একটি ছবির কাজ শেষ করে তারপর পরের কাজে যাওয়া। একসঙ্গে অনেক ছবিতে যুক্ত থাকা তাঁর শিল্পীসত্তার সঙ্গে ঠিক খাপ খেত না। তাঁর কাছে এটি ছিল সৃজনশীলতা ও কাজের নৈতিকতার প্রশ্নও।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও কালোটাকার অভিযোগ
কমল হাসানের বলিউড ছাড়ার আলোচনায় সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কথিত যোগাযোগ। ২০১৭ সালের সেই সাক্ষাৎকারেই তিনি বলেছিলেন, সে সময় বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগাযোগ ছিল অনেক বেশি। সেই পরিস্থিতিতে তিনি থাকতে চাননি—কারও হুমকির কাছে নতি স্বীকার করতেও চাননি, আবার এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করেও সময় নষ্ট করতে চাননি।
কালোটাকা নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন অভিনেতা। তাঁর দাবি তিনি ও তাঁর ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রের কাজে কালোটাকার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল কালোটাকার আশ্রয় না নিয়েও চলচ্চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।

সিনেমার দৃশ্যে কমল হাসান। আইএমডিবি

আশির দশকে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রশিল্পে অর্থের উৎস, অনানুষ্ঠানিক বিনিয়োগ এবং অপরাধজগতের প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বহু প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।

চিত্রনাট্য চাওয়ায় মনমোহন দেশাইয়ের সঙ্গে দূরত্ব
বলিউডে কমল হাসানের পথচলা যে খুব সহজ ছিল না, তার আরেকটি উদাহরণ মনমোহন দেশাইয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ঘটনা। ২০২৩ সালে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ তাঁর একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে। সেখানে কমল জানিয়েছিলেন, মনমোহন দেশাইয়ের সঙ্গে একটি ছবির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি চিত্রনাট্য দেখতে চেয়েছিলেন। এতে বিরক্ত হয়েছিলেন জনপ্রিয় পরিচালক।

দেশাই নাকি তাঁকে বলেছিলেন, অমিতাভ বচ্চনও তাঁর কাছে চিত্রনাট্য চান না। জবাবে কমল বলেছিলেন, অমিতাভ হয়তো সে ধরনের স্বাধীনতা নিতে পারেন, কিন্তু তাঁর পক্ষে তা সম্ভব নয়। তিনি কাজ শুরুর আগে গল্প ও চিত্রনাট্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন।
এই ঘটনা থেকে কমলের কাজের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তারকাখ্যাতি কিংবা পরিচালকের নামের চেয়ে একটি ছবির গল্প ও চরিত্র তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বলিউডের প্রচলিত তারকাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় এমন প্রত্যাশা সব সময় সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

কমল হাসান। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

২০২৫ সালে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে সাংবাদিক বীর সাংভির সঙ্গে কমলের পুরোনো সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ আসে। সেখানে অভিনেতা বলেন, একটি হিন্দি ছবি শেষ করতে দেড় বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেত। এর মধ্যে পোশাকের ফ্যাশন বদলে যেত, অভিনেতার শারীরিক গঠনে পরিবর্তন আসত, আবার দৃশ্য ধারণ করতে হতো। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে তিনি ক্লান্তিকর ও ভীতিকর বলে বর্ণনা করেছিলেন।

আরও পড়ুন

ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব কতটা সত্য?
কমল হাসান বলিউড ছেড়েছেন—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ব্যাখ্যা শোনা যায়। কেউ মনে করেন, মুম্বাইয়ের তারকাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় তিনি নিজের জায়গা করে নিতে চাননি। কেউ আবার মনে করেন, বলিউডের ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী ও প্রচলিত কাজের ধরন তাঁর মতো স্বাধীনচেতা শিল্পীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়েও নানা জল্পনা রয়েছে।
তবে এ প্রসঙ্গে কমল হাসান কখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।

বলিউডে ফিরেছেন, তবে...
বলিউড থেকে দূরে থাকলেও হিন্দি দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি ছিন্ন করেননি কমল। ১৯৯৭ সালে ‘চাচি ৪২০’ দিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল উল্লেখযোগ্য। পরে ‘হে রাম’, ‘অভয়’, ‘মুম্বাই এক্সপ্রেস’ ও ‘বিশ্বরূপম’-এর মতো ছবিতে কাজ করেছেন। ২০১৫ সালে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নিজের শর্তে হিন্দি সিনেমায় কাজ করতে চান। এমন গল্প বলতে চান, যেগুলো বলা প্রয়োজন বলে মনে করেন।

২০০৯ সালে আইএএনএসকে তিনি আরও বলেছিলেন, বলিউডে তাঁর জন্য একটি সম্ভাবনাময় দর্শকগোষ্ঠী রয়েছে। হিন্দি দর্শকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আছে বলেই সুযোগ পেলে তিনি সেখানে ফিরতে চান। অর্থাৎ বলিউডকে প্রত্যাখ্যান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না; বরং নিজের পছন্দ ও কাজের ধরন অনুযায়ী ছবি বেছে নেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।