হারিয়ে যাওয়া সেই মইন্নাকে খুঁজে নিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার
গাজীপুরের বোর্ডবাজারে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করা ছেলেটিই একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছিল। তাঁর কাঁধে সিমেন্টের বস্তা, মাথায় ইট; কিন্তু নামের পাশে যুক্ত হয়েছে এমন এক পরিচয়, যা অনেকেই সারা জীবন খুঁজেও পান না। বাস্তব জীবনের নির্মম সংগ্রামে হারিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কারই তাঁকে খুঁজে নিয়েছে। ‘আম-কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ২০২৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর পুরস্কার পাচ্ছেন মো. লিয়ন। এর আগে লিয়ন পেয়েছে মেরিল–প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কার।
ময়মনসিংহের চরপাড়ার ছেলে লিয়নের জীবনগাথা যেন নিজেই এক সিনেমা, যেখানে নেই ঝলমলে সেট, নেই কৃত্রিম আলো। আছে শুধু সংগ্রাম, দায়িত্ব আর টিকে থাকার লড়াই। শৈশব পেরোনোর আগেই কাঁধে এসে পড়ে পরিবারের ভার। অভাবের সংসার টানতে একসময় তিনি পাড়ি জমান গাজীপুরে। মনে হয়েছিল, পোশাক কারখানায় কাজ পেলে হয়তো জীবন একটু সহজ হবে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় কারখানার ফটক থেকেই ফিরে আসতে হয় তাঁকে। সেদিন কোথাও আর যাননি লিয়ন। বোর্ডবাজারেই থেকে গেছেন।
ঘুরতে ঘুরতে জুটে যায় রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ। বাবা আবদুল খলিল পেশায় রাজমিস্ত্রি। বাবার হাত ধরেই শেখা—কংক্রিট মিক্সারে কতটুকু পাথর, কতটুকু বালু আর সিমেন্ট লাগবে। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, মাথায় ইট তুলে সিঁড়ি ভেঙে তিন-চারতলায় ওঠা—এটাই এখন লিয়নের প্রতিদিন। কোনো মাসে কাজ জোটে ১০ দিন, কোনো মাসে ১৫। মেসে গাদাগাদি করে থাকেন। নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ মিটিয়ে যা বাঁচে, পাঠান বাড়িতে।
অথচ এক দশক আগেই অন্য এক আলোয় এসেছিলেন লিয়ন।
২০১৬ সালে নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের সিনেমা ‘আম-কাঁঠালের ছুটি’-তে ডানপিটে কিশোর ‘মইন্না’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। তখন টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। বয়স মাত্র ১৩। জীবনে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো—ভয় ছিল, জড়তাও ছিল। আলো, ক্যামেরা, মানুষ—সবই নতুন। কিন্তু ধীরে ধীরে ভয় কাটে। চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন লিয়ন। মইন্না শুধু একটি চরিত্র হয়ে থাকেনি, সে হয়ে উঠেছিল বাস্তবের খুব কাছের এক মানুষ।
দর্শকের ভালোবাসা পেলেও বাস্তব জীবনে সিনেমার আলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অভাবের সংসারে পড়াশোনা থেমে যায়। ছোট ভাইকে দেখাশোনার দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে। নৈশবিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। সময়ের স্রোতে অভিনয়ের দিনগুলোও ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে। মইন্না যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল বাস্তব জীবনের কোলাহলে।
২০২৪ সালে হঠাৎ গল্পে আসে নাটকীয় মোড়। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের মনোনয়নের খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু লিয়নের কোনো খোঁজ নেই। ফোন নম্বর অচল, ঠিকানা অজানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজ শুরু করেন নির্মাতা। সেই পোস্ট চোখে পড়ে লিয়নের এক ফুফুর। সেখান থেকেই আবার যোগাযোগের সূত্রপাত।
বোর্ডবাজারের সেই নির্মাণশ্রমিকই হাজির হন পুরস্কারের মঞ্চে। ২০২৪ সালের ২৪ মে ঢাকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে ঘোষণা হয় তাঁর নাম। শহীদুজ্জামান সেলিম, নাসির উদ্দিন খানের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পেছনে ফেলে বিচারকদের রায়ে সেরা অভিনেতার পুরস্কার ওঠে লিয়নের হাতে। মিলনায়তনভর্তি দর্শকের করতালিতে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে আবেগে ভরা।
সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থাপক হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে অনেকে পুরস্কারের পেছনে ছোটে। আবার কেউ কেউ আছেন, যাঁদের পুরস্কারই খুঁজে বেড়ায়। লিয়ন আহমেদ সেই মানুষগুলোর একজন।’
পুরস্কার নিয়ে আবার বোর্ডবাজারেই ফিরেছেন লিয়ন। তবে এবার তাঁর চোখে নতুন স্বপ্ন। আবার পড়াশোনা করতে চান তিনি।
‘বন্ধুরা আমাকে ইংরেজি আর বাংলায় মেসেজ দেয়। আমি পড়তে পারি না বলে খুব খারাপ লাগে,’ প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন লিয়ন।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শুধু তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতি নয়। এটি যেন জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে নতুন করে শুরু করার সাহস।
মইন্না চরিত্রটা হয়তো পর্দায় ছিল, কিন্তু লিয়নের জীবনটাই আজ বাস্তবে এক শক্তিশালী সিনেমা-সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া আর আবার ফিরে আসার গল্প।