‘মাসুদ রানা’ কতটা স্পাই-থ্রিলার

‘মাসুদ রানা’ সিনেমার পোস্টার থেকে। প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক থেকে

কাজী আনোয়ার হোসেন পড়া আছে বেশ। জেমস বন্ডের সিনেমাও দেখেছি ঢের। তা সত্ত্বেও বাড়তি কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই শুধু বিনোদনের আশায় আমরা তিন সহকর্মী গত ৩১ মে বিকেলে ‘মাসুদ রানা’ দেখতে গিয়েছিলাম। সিনেমাটি ঈদুল আজহায় মুক্তি পেয়েছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটির পরিচালক সৈকত নাসির। মুক্তির পর সিনেমাটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা বা ‘গুড রিভিউ’ চোখে পড়েনি।

থ্রিলারধর্মী আবহ, নাটকীয়তা আর সেনা অভিযানের দৃশ্যের শুরুতেই পর্দায় চোখ আটকে যায়। একপর্যায়ে পর্দায় হাজির হন তরুণ সেনা কর্মকর্তা মাসুদ রানা (রাসেল রানা)। তিনিই এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র—নায়ক। একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভয়ংকর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। দেশের বড় ধরনের ক্ষতি করা লক্ষ্য। সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে মাসুদ রানাকে পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে।

একনজরে
সিনেমা: ‘মাসুদ রানা’
ধরন: স্পাই–থ্রিলার
উৎস: ধ্বংস পাহাড়, কাজী আনোয়ার হোসেন
চিত্রনাট্য: আবদুল আজিজ
পরিচালনা: সৈকত নাসির
অভিনয়: রাসেল রানা, পূজা চেরী, গাজী রাকায়েত, সৈয়দা তিথি অমনি, অমিত হাসান
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা

থাইল্যান্ডে গিয়ে গল্পে যোগ হয় আরেক নাটকীয়তা। সেখানে চলছে ইউরেনিয়ামের চোরাচালান। সেই চালান নিরাপদে দেশে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সোহানার (পূজা চেরী)। অর্থের বিনিময়ে তিনি চালান বুঝে নেন। চালান নিয়ে রওনার মুহূর্তে বাধার মুখে পড়েন তিনি। আর তখনই দেখা যায় গ্ল্যামারাস নায়িকা সোহানার আরেক রূপ। তুমুল মারপিটে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে অ্যাকশন নায়িকা রূপে দর্শকের সামনে হাজির হন তিনি।

ইউরেনিয়ামের চালান শেষ পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন মাসুদ রানা। তবে কাজটা করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে জখম হন তিনি। একে একে সামনে আসতে থাকে ভয়ংকর সব তথ্য। দেশে ইউরেনিয়ামের ডজনখানেক চালান এনে বোমা তৈরি করা হবে। লক্ষ্য—দেশের প্রধান তিনটি সমুদ্রবন্দরে ভয়াবহ হামলা চালানো। দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করা, বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়া।

‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রের প্রধান অভিনয়শিল্পী রাসেল রানা
ছবি : প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

এই সন্ত্রাসী পরিকল্পনা রুখে দেওয়ার কাজটি খুবই কঠিন। কারণ, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কটির কোনো অফিস বা নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। অদৃশ্য যোগাযোগব্যবস্থার আড়ালে পরিচালিত হয় সব কার্যক্রম। যাকেই ধরা হয়, মনে হয় সে-ই যেন এই চক্রের শেষ প্রান্তের একজন সদস্য। খোঁজ করতে করতে মাসুদ রানা জানতে পারেন, এই নেটওয়ার্কের অন্যতম হোতা সোহানারই ভাই। ব্যবসায়ী পরিচয়ের আড়ালে তিনি মিয়ানমার–সংশ্লিষ্ট চক্রের হয়ে কাজ করছেন। বিষয়টি সোহানাও জানতেন না। বরং তাঁকে ব্ল্যাকমেল করে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছিলেন তাঁর ভাই।

আরও পড়ুন

এরপর শুরু হয় তিন সমুদ্রবন্দর রক্ষার অভিযান। সোহানাও এই মিশনে যোগ দেন। দেশের স্বার্থে তিনি ভাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অন্যদিকে বিস্ফোরণের সময় নির্ধারণ করে স্পিডবোটে করে পালিয়ে যান চক্রটির আরেক হোতা। বোমার রিমোট কন্ট্রোল তাঁর কাছেই থাকে। তাঁকে ধরতে মরিয়া হয়ে ছুটতে থাকেন মাসুদ রানা।
বিস্ফোরণের সময় ঘনিয়ে আসতেই উল্লাসে নাচতে শুরু করেন এই সিনেমার আরেক ভিলেন (গাজী রাকায়েত)। তাঁর নাচের দৃশ্যে ফুটে ওঠে একধরনের পৈশাচিক উল্লাস।

টানটান উত্তেজনার মূহূর্তে তাঁর এমন নাচের দৃশ্যে দর্শক হিসেবে আমাদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিলেও এ কথাও বলতে হয়, এমন কুশলী, ব্যতিক্রমধর্মী নাচ আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি যে এক ‘বিধ্বংসী’ মানুষ, নাচেই তার ছাপ স্পষ্ট। অবশ্য তাঁর এই উল্লাস শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কি না, মাসুদ রানারা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রবন্দরগুলো রক্ষা করতে পারেন কি না, তার উত্তর জানতে হলে সিনেমাটি দেখতে হবে।

‘মাসুদ রানা’ ছবিতে অভিনয় করেছেন রাসেল রানা ও পূজা চেরী
ছবি : প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

কোথাও কোথাও অবাস্তব ঘটনা-দৃশ্য চোখে পড়ে। কিছু দৃশ্য অতিরঞ্জিত, কখনো কখনো হাস্যরসও তৈরি করে। গল্পে অসংগতি, দুর্বলতা আছে। তবে সিনেমাটির বড় শক্তি এর গতি। দ্রুত দৃশ্যান্তর, ঘন ঘন অ্যাকশনের কারণে গল্প খুব বেশি ঝুলে যায়নি। আর দর্শককে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। অ্যাকশন সিনেমা যাঁদের প্রিয়, এই মুভির ভরপুর মারপিট তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করবে। পাশাপাশি সিনেমাটিতে আছে জমকালো নাচ–গান। আছে আইটেম সং। এসব গানের কথা, সুর, চিত্রায়ণ, কোরিওগ্রাফি দর্শকদের ভালো লাগবে বলেই মনে হয়। তবে কাজী আনোয়ার হোসেনের উপন্যাসের সঙ্গে এর হুবহু মিল খুঁজতে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আর বিখ্যাত জনপ্রিয় জেমস বন্ড সিরিজের সঙ্গে তুলনা করাটা মোটেই যৌক্তিক হবে না।
রাসেল রানাকে ‘মাসুদ রানা’ চরিত্রে ভালোই মানিয়েছে। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে তাঁর আত্মবিশ্বাস চোখে পড়েছে। তাঁর শরীরী ভাষা, দৌড়ঝাঁপ, মারপিট কিংবা ছোট ছোট সংলাপ বলার ধরনে বোঝা যায় চরিত্রটির জন্য পরিশ্রম করেছেন তিনি।

পূজা চেরীর কথা আলাদাভাবে না বললেই নয়। গ্ল্যামারের পাশাপাশি অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁকে বেশ আত্মবিশ্বাসী লেগেছে। মারপিটের দৃশ্যগুলোতে তাঁর প্রস্তুতির ছাপ স্পষ্ট। নিজের চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তিনি চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি আবেগ ও নাটকীয়তার একটা অংশও তিনি ধরে রেখেছেন।

আরও পড়ুন

ভিলেন চরিত্রে গাজী রাকায়েতের অভিনয়ে কিছুটা বাড়াবাড়ি নাটকীয়তা দেখা যায়। তবে এটিকে বিনোদনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াই যায়।

সমালোচকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করতে বসলে সিনেমার গল্প, নির্মাণশৈলী কিংবা চরিত্রগুলোর অভিনয়ে নানা সীমাবদ্ধতা ধরা পড়বে। ‘স্পাই-থ্রিলার’ হিসেবে ঠিক কতটা শক্তিশালী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু আমরা সেদিকে যাইনি। আমরা শুধু বিনোদন খুঁজেছি। সেদিক থেকে সিনেমার থ্রিলারধর্মী আবহ, মারপিট, নাচ–গান, এমনকি অবাস্তব দৃশ্যগুলোও উপভোগ্য লেগেছে। দেশি কোনো সিনেমায় স্পাই–থ্রিলারের হালকা ভাইব পাওয়াটাও ‘কম কথা’ না।

দর্শকভেদে অনুভূতি ভিন্ন হয়। ছুটিতে আমরা গিয়েছিলাম শুধুই বিনোদন পাওয়ার মুড নিয়ে। যা কিছু দেখেছি, তা থেকেই আনন্দ পেয়েছি। আনন্দ নিয়েই বাসা ফিরেছি। এটার একটা সুবিধা আছে—লাভ–ক্ষতির হিসাব মেলাতে হয় না।