অ্যাডাম-ইভের আদিম প্রেমের গল্প, কেমন হলো ‘রইদ’

‘রইদ’–এ মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি। ছবি: নির্মাতার সৌজন্যে

ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিয়ে করে নতুন বউকে বাড়িতে নিয়ে আসছে সাধু (মোস্তাফিজুর নূর ইমরান)। মুখে রুমাল চেপে লাজুক হাসছে, একটু বেশি বয়সে বিয়ে কিনা। বউয়ের বয়স অবশ্য বেশ কম। কিন্তু সে নাকি পাগল। গ্রামে আসার আগেই সেটা চাউর হয়ে গেছে। গাড়ির আশপাশে ঘুরে গ্রামের বাচ্চারা অনবরত ‘পাগল’ ‘পাগল’ বলে যাচ্ছে। সাধুর বউ বা ‘পাগলি’ও (নাজিফা তুষি) ছাড়বার পাত্র নয়; সেও ভেংচি কাটছে, এমনকি গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে ছেলে-ছোকড়াদের দাবড়ানিও দিয়ে আসছে। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় গাড়ির ঝাঁকুনির দৃশ্য চলতে থাকে। দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রা চলে যায় গাড়ির পাশ দিয়ে, উল্টো পথে। গাড়ি পার হওয়ার পর ম্যাচ কাট করে ক্যামেরার ফোকাস চলে যায় ঘোড়ার গাড়ি থেকে দুর্গার ওপর।

একনজরে
সিনেমা: ‘রইদ’
ধরন: ড্রামা
গল্প: মেজবাউর রহমান সুমন, সেলিনা বানু
চিত্রনাট্য: মেজবাউর রহমান সুমন, জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ, সুকর্ণ শাহেদ ধীমান, রফিকুল ইসলাম
পরিচালনা: মেজবাউর রহমান সুমন
অভিনয়: মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৭ মিনিট

শুরুর এই দৃশ্যই যেন পুরো ‘রইদ’ সিনেমার প্রতীকী সারকথা। শুরুতে দেখা গিয়েছিল ঘোড়ার মুখ, সিনেমা যত এগোতে থাকে, ততই বোঝা যায়, শুধু ঘোড়া নয়, আরও নানা প্রাণী ‘রইদ’-এর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আপাতদৃষ্টে অতি সহজ একটি গল্পের ভেতর সুপ্ত হয়ে থাকা বহু রূপক, ধর্মীয় ও লোকজ পুরাকথা আর দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’কে আর দশটা দেশি সিনেমার চেয়ে একেবারে আলাদা করে রেখেছে।

মিয়া ভাইয়ের (গাজী রাকায়েত) হয়ে কাজ করে সাধু। লোকে বলে, মাছের প্রজেক্ট করতে সুবিধা পেতেই পাগলির সঙ্গে সাধুর বিয়ে দিয়েছেন মিয়া ভাই। বিয়ে করে সুখ পায় না সাধু। বউ পাগলি। রাঁধতে তো পারেই না, রাতেও নিবিড় সঙ্গ মেলে না। দিনে দিনে বিরক্তি চরমে ওঠে। একদিন মেলা দেখার নাম করে অনেক দূরের এক নির্জন প্রান্তরে বউকে ফেলে আসে সাধু।

কিন্তু পাগলি ফিরে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে আশ্চর্য রান্নার হাত। তালের পিঠা বানিয়ে খাওয়ায় সাধুকে। এমন পিঠা সাধু বাপের জন্মে খায়নি। এবার সাধু অনুরাগী হয়ে ওঠে বউয়ের। কিন্তু তার কপালে সুখ সয় না। গ্রামের ছেলেমেয়েরা আবারও বউকে ‘পাগলি’ বলে খেপায়। পাগলিও তো ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। পাগলির হাতে এক শিশু মাথা ফেটে আহত হয়।

মেজবাউর রহমান সুমন
ছবি: নির্মাতার সৌজন্যে

এবার শিকলবন্দী করা হয় পাগলিকে। সাধুর ঘরে আগুন লাগে। পাগলিকে আবার রেখে আসে সাধু। এবারও সে ফিরে আসে। তবে ফিরে আসে গর্ভে সন্তান নিয়ে। কার সন্তান এটা? সাধুর তো নয়। সাধু পাগলিকে চায়, কারণ সে-ই কেবল তাকে বাপের জন্মে না খাওয়া পিঠা বানিয়ে খাওয়াতে পারে। কিন্তু এই অজানা সন্তান তো সে চায় না। পাগলি সব বোঝে। আর এবারই সে স্বেচ্ছায় সাধুকে ছেড়ে যায়। পাগলিকে না পেয়ে সাধুও পাগলপ্রায়। সে কি আর তাকে খুঁজে পাবে? এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে রইদ এগিয়ে যায় আশ্চর্য এক সমাপ্তির দিকে।

আরও পড়ুন

ট্রেলারেই স্পষ্ট ছিল ‘রইদ’-এ অ্যাডাম-ইভের ছায়া থাকবে। সিনেমায় সাধু আর পাগলি যেন আদিম দুই নর–নারী। আর তাল গন্ধমের রূপক। সেটা খাওয়ার পরই সাধু পাগলির প্রেমে পড়ে। তবে রইদ অ্যাডাম-ইভের গল্পকেও ছাড়িয়ে যায়। স্পষ্ট-অস্পষ্ট রূপকে মাতা মেরি, মহাপ্রলয়ে নোয়ার নৌকাসহ নানা পুরাকথার প্রচ্ছায়া এ ছবিতে ফুটে ওঠে। নির্মাতা বহু অকথিত দৃশ্যকল্প এ ছবিতে দর্শকের স্বাধীন কল্পনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
প্রাণিকুল ‘রইদ’ ছবির আলাদা একটা জগৎ। গরু, মহিষ, ঘোড়া, বিড়াল, কবুতর, ভেড়া, ব্যাঙ—কী নেই এ ছবিতে! আর আছে কুলসুম, পাগলির প্রিয় ছাগল। কুলসুমের সঙ্গে পাগলির সম্পর্ক ছবিটির অবিচ্ছেদ্য উপাদান। পাগলি ছেড়ে চলে গেলে সাধুও কলসুমের অনুরাগী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে কুলসুমও পাগলি হয়ে ওঠে কি?

‘রইদ’-এর লোকেশনও অদ্ভুত। লোকেশন অনেক কিছু বলে। কাশবন, নদী, পাহাড়, রুক্ষ প্রান্তর, অসংখ্য প্রাণী মিলিয়ে এ যেন এক আদিম পৃথিবী। প্রতিটি দৃশ্য যেন এস এম সুলতানের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। প্রথমবার সাধু যখন পাগলিকে মেলা দেখাতে নিয়ে যায়, চাঁদনি রাতে নৌকায় করে রাতের দীর্ঘ যাত্রা। সাধু জানে, পাগলিকে রেখে আসতে যাচ্ছে। আর পাগলির মনে হচ্ছে, পথ শেষ হচ্ছে না কেন! প্রায় কিছু না বলেই চাপা উত্তেজনার দৃশ্যটি তৈরি করা হয়েছে। আরেক দৃশ্যে সাধু যখন রাতে বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছে, পেছনে পাহাড়। আকাশে ক্রমাগত বজ্রপাত। সাধুর মনেও তখন পাগলিকে নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

‘রইদ’ সিনেমার পোস্টার। ফেসবুক থেকে

‘দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল’ শব্দবন্ধটি আজকাল হরেদরে ব্যবহার করা হয়। রইদ ছবির ক্ষেত্রে এটিকে বিশেষভাবেই ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি দৃশ্য অসম্ভব যত্ন নিয়ে তৈরি করা। চিত্রগ্রাহক জোয়াহের মুসাভভির জ্যোতি অবিশ্বাস্য কাজ করেছেন। সিনেমার বেশির ভাগ অংশই লো লাইটে শুট করা। ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, ক্লোজ-আপ, রাতের দৃশ্য, মধ্যরাতের দৃশ্য, রাতে আগুন লাগার দৃশ্য, বৃষ্টি থেকে শিলাবৃষ্টি ধারণ করার জন্য সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব পেয়েছিলেন জোয়াহের। দারুণ দক্ষতায় উতরে গেছেন তিনি।
ধারালো সম্পাদনা আর দুর্দান্ত রংবিন্যাসের জন্য বাহ্বা পাবেন সজল অলক ও আল মামুন। আর আলাদা করে বলতে হয় রাশিদ শরীফ শোয়েবের আবহ সংগীতের কথা। পুরো সিনেমাতেই তিনি দারুণ। কিন্তু শেষ দশ মিনিটে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সিনেমাটিকে।

আরও পড়ুন

এবার আসা যাক অভিনয়ে। গত ঈদুল ফিতরে রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’-এ ‘রেশমা’ চরিত্রে নাজিফা তুষি যে অভিনয় করেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে ছিল তাঁর ক্যারিয়ার–সেরা। তবে রইদ তাঁকে আলাদা একটি স্থান করে দিয়েছে। পাগলির রহস্যময়তাকে আশ্চর্য বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ দিয়েছেন তিনি। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধনের পর চলতি শতকে সম্ভবত এটি দেশি সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী একটি নারী চরিত্র।

‘সাধু’ চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরানও দুর্দান্ত। সাধু প্রথমে বউকে সমাজের কাছ থেকে আড়াল করে, পরে বিরক্ত হয় আর শেষে বউপাগল হয়ে ওঠে। তিন পর্যায়েই তিনি ছিলেন দারুণ। আর শেষের ১৫ মিনিট তো ছিল সাধুর একক পারফরম্যান্স। এই শেষ অঙ্কে এসেই সিনেমাটি বাস্তবতাকে ছাপিয়ে চলে যায়। মানুষের আদিম সব রিপু-লোভ, কামনা, নিষ্ঠুরতা আর বাসনার মিশেলে সিনেমার শেষ ভাগে অভিনেতা হিসেবে নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন মোস্তাফিজুর।

‘রইদ’ সিনেমার দৃশ্যে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি
ছবি : প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

‘রইদ’–এর বেশ কয়েকটি গান আছে, সব কটিই কমবেশি শোতৃপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছে কেবল প্রয়াত কানাই দাস বাউলের ‘মন ছাড়া কী’; ছবির মেজাজের সঙ্গে যা ভালোভাবেই মানিয়ে গেছে।

সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধে এসে কয়েকটি দৃশ্যে কিছুটা পুনরাবৃত্তি মনে হয়, মিয়া ভাইদের হুট করে হারিয়ে যাওয়াটাও কেমন যেন লাগে। এ রকম ছোটখাটো কিছু খামতি বাদ দিলে রইদ দেশের শৈল্পিক সিনেমার একটি দারুণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বুক অব জেনেসিস অনুযায়ী ঈশ্বর জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছিলেন ছয় দিনে। প্রথম দিন আলো, তবে সেদিন রোদ ওঠে না। তার জন্য চতুর্থ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, সূর্য সৃষ্টি করা পর্যন্ত। সিনেমায় সেই রোদ বা ‘রইদ’ কতটা উঠল, সেটা নাহয় হলে গিয়ে নিজে দেখেই বুঝে নিন।